ঢাকা সফরে যে বার্তা দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গর
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৯ পিএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে শনিবার ঢাকায় তেজগাঁওয়ে তাঁর কার্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর সাক্ষাৎ করেন। ছবি: সংগৃহীত
তিন দিনের ঢাকা সফর শেষে বাংলাদেশ ছেড়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর। শেষ দিন শনিবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে বৈঠকও করেছেন তিনি।
বৈঠক শেষে সার্জিও গর সাংবাদিকদের বলেছেন, "শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিনিয়োগকারী বাংলাদেশ সফরে আসবেন। সফরের সময় তারা সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাত পর্যালোচনা করবেন এবং কোথায় বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে সে বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করবেন"।
ওই বৈঠক শেষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেছেন, "বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধান এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদারে আগামী সপ্তাহের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির প্রায় ৪৫ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফরে আসবেন। তারা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবেন"।
তিন দিনের এই সফরে মার্কিন এই কূটনীতিক কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর করেন শুক্রবার। তারের রহমানের সাথে শনিবারের বৈঠকে যে কারণে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার তিনদিনের সফরে ঢাকায় আসেন মার্কিন এই কূটনীতিক। সফরের প্রথম দিনই তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের সাথেও বৈঠক করেন।
কূটনীতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক ছাড়াও তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কেমন হবে সেদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই সফরটি।
আরো পড়ুন: সব বন্দর ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
সাবেক রাষ্ট্রদূত সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন সরকার গঠনের পর অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রকাল ট্যারিফ বা এআরটি'র উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এই অ্যাগ্রিমেন্ট নিয়ে বাংলাদেশ সরকার কি ভাবছে বা কি করছে সেটির মূল্যায়নও হয়তো তিনি করেছেন"।
আলোচনায় অর্থনীতি ও বাণিজ্য
তিন দিনের সফরের শেষ দিন শনিবার তেজগাঁওয়ের প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে তারেক রহমানের সাথে বৈঠক করেন সার্জিও গোর।
ওই বৈঠকে শেষে সেখান থেকে বের হয়ে গণমাধ্যমের সাথে খুব অল্প সময়ের জন্য কথা বলেন তিনি।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে এই বৈঠক শেষে এ নিয়ে নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে একটি পোস্টও দেন সার্জিও গর। সেখানে তিনি বলেন, "অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং দুই দেশের অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উভয় দেশের সামনে থাকা বিস্তৃত সুযোগ-সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাস্তব ও ইতিবাচক ফল অর্জন সম্ভব"।
বিকেলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে পাঠানো একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন বা এফডিএ-এর সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়। সার্জিও গোর আশ্বাস প্রদান করেন যে বাংলাদেশে এফডিএ-র পরীক্ষাকার্য পুনরায় শুরু করার বিষয়ে তিনি সহায়তা করবেন'।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার সফরের প্রথম দিনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বিশেষ দূত যখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেন, তারপর বাংলাদেশের জন্য জারি করা ভ্রমণ সতর্কতা বা ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি হালনাগাদেরও ঘোষণা দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, 'যুক্তরাষ্ট্র মনে করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে। ইঙ্গিত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য বিদ্যমান ট্রাভেল অ্যাডভাইসারির ইতিবাচক সংশোধন করেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে যে বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত'।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, এই ভ্রমণ সতর্কতা কমানোও একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। তিনি বলছিলেন, "হয়তো যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বর্তমান পরিবেশ সম্পর্কে আস্থা পেয়েছে সে কারণে ভ্রমণ সতর্কতা কমিয়েছে। তবে এটি ধরে রাখতে হলে আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামো আরো স্থিতিশীল হতে হবে"।
যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ কী শুধুই বিনিয়োগ?
বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয় সেখানে বলা হয় এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন কর্পোরেশন বা ডিএফসি-এর মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় হয়। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তারেক রহমান ওয়্যারহাউজিং, সয়াবিন, তুলা, গম এবং অন্যান্য কৃষি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের আহ্বান জানান বলেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন।
শাহাদাৎ স্বাধীন জানান, একই সাথে তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি খাতের বিনিয়োগ নিয়েও বাংলাদেশের বিশেষ আগ্রহের কথাও উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আরো পড়ুন: গণতন্ত্র শক্তিশালী না হলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিশ্চিত হবে না: নাহিদ ইসলাম
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, এই খাতে বাংলাদেশে আগ্রহের জবাবে বিশেষ দূত সার্জিও গর বলেছেন, এই খাতে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও মন্তব্য করেন, বাংলাদেশ ভবিষ্যতে প্যাক্স সিলিকা উদ্যোগের অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। এ বিষয়ে তিনি উদ্যোগ নেবেন বলেও জানানো হয় বিবৃতিতে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলছিলেন, "বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে যথেষ্ট বিনিয়োগ পায় তাহলে যে শঙ্কার জায়গাটি রয়েছে সেটি আর থাকবে না"।
এক্ষেত্রে টেকনোলজি বা আইটি সেক্টর, ব্লু ইকনোমির মতো খাতগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিনিয়োগ আসতে পারে বলেও মনে করেন হুমায়ুন কবির।
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূতের এই সফরে শুধু শুধু বিনিয়োগই মূল জায়গায় নয় বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির।
তিনি বলছিলেন, "হয়তো এখানে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকার গঠনের পর অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রকাল ট্যারিফ বা এআরটি একটা উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এই এআরটি নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার কী ভাবছে সেই মূল্যায়নও হয়তো তিনি করেছেন"।
"সেক্ষেত্রে তার দেশের যদি কোন পরামর্শ বা সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় থাকে তাহলে সেটাও তিনি নিশ্চয়ই শেয়ার করেছেন", যোগ করেন তিনি।
রোহিঙ্গা ইস্যু
তিন দিনের ঢাকা সফরের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যান। সে সময় তিনি বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র এই শিবিরকে সহায়তা দিয়ে আসছে এবং বিশ্বজুড়ে আমাদের অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, তারা যেন তাদের সহায়তার পরিমাণ বৃদ্ধি করেন"।
পরদিন শনিবার যখন তারেক রহমানের সাথে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে সেখানেও আলোচনায় এসেছে এই বিষয়টি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রেস উইং থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, 'শনিবারের বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়। বিশেষ দূত কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাঁর আগের দিনের সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদান এবং মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ধন্যবাদ জানান"।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, "প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে (সার্জিও গরকে) বলেছেন রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার অর্ধেকের বেশী অংশ যুক্তরাষ্ট্রের অবদান থেকে আসে। এ জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন"।
বিবৃতিতে বলা হয়, 'এর জবাবে বিশেষ দূত সার্জিও গর বাংলাদেশকে জানিয়েছে, রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত, টেকসই ও রাজনৈতিক সমাধানে আসিয়ান ও প্রতিবেশী দেশসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেবেন তিনি'।
শনিবার বিকেলে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকায় অবস্থানকালে বিশেষ দূত সার্জিও গর বাংলাদেশর প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ককে প্রভাবিত করা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। একই সাথে তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরও পরিদর্শন করেন।
