বেনজীরের মুক্তির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই: দুদক
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী বলেছেন, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের সংযুক্ত আরব আমিরাতে মুক্তি পাওয়ার বিষয়ে কমিশনের কাছে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পৌঁছেনি। একই সঙ্গে এ বিষয়ে দুদকের কোনো গাফিলতি ছিল না বলেও দাবি করেছেন তিনি।
রোববার (২ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, বেনজীরের মুক্তির খবর দুদকও গণমাধ্যমের মাধ্যমেই জেনেছে। আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, আন্তঃদেশীয় আইনি সহায়তার ক্ষেত্রে দুদক সরাসরি বিদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে না। কমিশন প্রয়োজনীয় নথিপত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়, সেখান থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশে তা পাঠানো হয়। এ ধরনের প্রক্রিয়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।
দুদকের কোনো অবহেলা ছিল কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে মীর জয়নুল আবেদীন শিবলী বলেন, কমিশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং যা যা পাঠানো দরকার ছিল, তা যথাসময়ে পাঠানো হয়েছে।
বেনজীরকে কী কারণে মুক্তি দেওয়া হয়েছে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য না থাকায় মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, পারস্পরিক আইনি সহায়তার (এমএলএ) অনুরোধ দুদক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া হয়।
এদিকে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি আদালত বেনজীর আহমেদের জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে ৩০ জুলাই তিনি কারামুক্ত হন।
এর আগে গত ১৬ জুন বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ইংরেজি ও আরবি ভাষায় প্রস্তুত দুটি প্রত্যর্পণ প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায় দুদক। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশে কোনো আসামি গ্রেপ্তার হলে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, এজাহার, অভিযোগপত্র এবং অপরাধসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য সংযুক্ত করে প্রত্যর্পণ প্রস্তাব তৈরি করা হয়। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোতে (এনসিবি) পাঠানো হয়।
দুদকের তথ্যমতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিস্থ ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো গত ১২ জুন বাংলাদেশকে জানায়, দুর্নীতির মামলার আসামি বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই চিঠিতে ইউএইর ফেডারেল আইন নং ৩৯/২০০৬-এর ১১ নম্বর ধারার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, গ্রেপ্তারের ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাতে হবে।
এর আগে ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল ইন্টারপোল বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে। দুর্নীতির দুটি মামলার তদন্ত চলাকালে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির আবেদন করেছিল দুদক।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ১২ কোটি টাকার বেশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে মামলা করা হয়। ওই মামলায় পরে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
অনুসন্ধানের সময় দুদকের নির্দেশে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট আইনজীবীর মাধ্যমে বেনজীর সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন। সেখানে তিনি ৫ কোটি ৬৭ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৫ টাকার স্থাবর এবং ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য দেন। তবে তদন্তে দুদক দাবি করে, তিনি ২ কোটি ৬২ লাখ ৮৯ হাজার ৬০ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন এবং ৯ কোটি ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার ৭৫১ টাকার সম্পদের বৈধ উৎস দেখাতে পারেননি। এ অভিযোগে ২০০৪ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর পরিচয় গোপন করে পাসপোর্ট নবায়ন ও জালিয়াতির অভিযোগে বেনজীর আহমেদসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা হয়। ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ফজলুল হক, মুন্সী মুয়ীদ ইকরাম, টেকনিক্যাল ম্যানেজার সাহেনা হক এবং বিভাগীয় পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় বেনজীর আহমেদ বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র ছাড়াই অফিসিয়াল মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) ও পরে ই-পাসপোর্ট গ্রহণ করেন। আবেদনপত্রে সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও পেশার স্থানে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখ করা হয়। একই ধরনের তথ্য দিয়ে একাধিকবার পাসপোর্ট নেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে। পাশাপাশি পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়া পাসপোর্ট অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে প্রায় ৭৪ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চারটি মামলা, পাসপোর্ট জালিয়াতি এবং মানিলন্ডারিংসহ মোট ছয়টি মামলার তদন্ত চলছে। দুদকের অনুসন্ধানে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও বান্দরবানসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩৪৫ বিঘা জমিসহ বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
