অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ হলে থাকবে যেসব সুবিধা-অসুবিধা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৫৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে অর্থবছরের প্রচলিত সময়কাল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন নিয়মে অর্থবছর শুরু হবে ১ এপ্রিল এবং শেষ হবে পরের বছরের ৩১ মার্চ। এতদিন ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়কে অর্থবছর হিসেবে গণনা করা হতো।
সরকারের মতে, নতুন সময়সূচির ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসবে এবং বর্ষাকেন্দ্রিক নানা জটিলতা কমবে। তবে অর্থবছরের সময়কাল বদলের কারণে সরকারি-বেসরকারি হিসাবব্যবস্থা, কর ব্যবস্থাপনা ও সফটওয়্যারে পরিবর্তন আনতে হবে। এতে সাময়িকভাবে বাড়তি খরচ ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থবছর কী?
অর্থবছর হলো সরকারের আর্থিক হিসাবের জন্য নির্ধারিত এক বছর। এই সময়কে ভিত্তি করে সরকার আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা, বাজেট প্রণয়ন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থ বরাদ্দ করে।
জিডিপি, মূল্যস্ফীতি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), শুল্ক-কর, বিনিয়োগ, সরকারি ঋণ ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাবও অর্থবছরকে কেন্দ্র করে করা হয়।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৭-২৮ অর্থবছর হবে রূপান্তরমূলক বছর, যার মেয়াদ হবে নয় মাস। এরপর ২০২৮ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৯ সালের মার্চ পর্যন্ত নতুন নিয়মে পূর্ণাঙ্গ অর্থবছর চলবে।
কেন বদলানো হচ্ছে অর্থবছর?
বর্তমানে অর্থবছর শুরু হয় জুলাই মাসে। এ সময় বাংলাদেশে বর্ষাকাল শুরু হওয়ায় সড়ক, সেতু, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে নানা সমস্যা তৈরি হয়।
বর্ষার কারণে অনেক প্রকল্পের কাজ ধীরগতির হয়ে পড়ে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়তে পারে। আবার অর্থবছরের শেষদিকে, বিশেষ করে জুন মাসে, বরাদ্দের অর্থ দ্রুত খরচ করার প্রবণতা দেখা যায়।
সরকার মনে করছে, এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর চালু হলে অর্থবছরের শুরুতেই তুলনামূলক শুষ্ক আবহাওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ও মান বাড়তে পারে।
কী কী সুবিধা হতে পারে?
নতুন অর্থবছরের সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে সময়ের সঠিক ব্যবহার।
এপ্রিল থেকে অর্থবছর শুরু হওয়ায় গ্রীষ্ম ও পরবর্তী শুষ্ক মৌসুমকে কাজে লাগিয়ে সড়ক, সেতু, ভবনসহ বিভিন্ন নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া যাবে। ফলে বর্ষাকালে কাজ বন্ধ বা ধীর হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে।
এ ছাড়া অর্থবছরের শেষদিকে তড়িঘড়ি করে প্রকল্পের কাজ শেষ দেখিয়ে অর্থ ব্যয়ের প্রবণতাও কমতে পারে। এতে সরকারি অর্থ ব্যবহারে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা বাড়ার সুযোগ রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপিতে ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জুন মাসেই প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে, যা মোট ব্যয়ের ২৮ শতাংশের বেশি।
কী ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে?
অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তনের ফলে শুরুতে বড় ধরনের প্রশাসনিক ও হিসাবসংক্রান্ত পরিবর্তন আনতে হবে।
সরকারি হিসাবব্যবস্থা, বাজেট প্রণয়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা ও বিভিন্ন সফটওয়্যার নতুন সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে।
একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণ, নিরীক্ষা, আর্থিক প্রতিবেদন ও কর ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনতে হবে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব
অর্থবছরের পরিবর্তনের সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের হিসাব-নিকাশের সময়সূচি সমন্বয় করতে হবে।
বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত সফটওয়্যারের মাধ্যমে হিসাবরক্ষণ, বাজেট ও আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে। নতুন অর্থবছরের সঙ্গে এসব ব্যবস্থাকে সামঞ্জস্য করতে গিয়ে তাদের অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে।
তবে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত লাভ-লোকসানের পরিমাণে সরাসরি বড় পরিবর্তন হবে না। মূলত হিসাব করার সময়কাল পরিবর্তিত হবে।
সাধারণ মানুষের কী পরিবর্তন হবে?
সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অর্থবছরের পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব খুব বেশি পড়ার কথা নয়। তবে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের আয়কর হিসাব ও রিটার্ন দাখিলের সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
বর্তমানে জুলাই থেকে জুন সময়ের আয়কে ভিত্তি করে হিসাব করা হলেও নতুন ব্যবস্থায় এপ্রিল থেকে মার্চ সময়কে ভিত্তি করে আয়কর ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
এ ছাড়া বিনিয়োগের মাধ্যমে কর রেয়াতসহ বিভিন্ন কর-সুবিধার সময়কালও নতুন অর্থবছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা হতে পারে।
ইতিহাসে এপ্রিলেই ছিল অর্থবছরের শুরু
অর্থবছরের সময়কাল নিয়ে বাংলাদেশে এটি একেবারে নতুন ধারণা নয়। মোগল আমলে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এপ্রিল থেকে অর্থবর্ষ গণনার প্রচলন ছিল।
পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ আমলেও এপ্রিল-মার্চ সময়কাল অনুসরণ করা হয়। ভারত এখনো এপ্রিল থেকে মার্চ পর্যন্ত অর্থবছর গণনা করে।
অন্যদিকে পাকিস্তান পঞ্চাশের দশকে জুলাই-জুন সময়কাল গ্রহণ করে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশও একই সময়সূচি অনুসরণ করে আসছে।
অন্যান্য দেশে অর্থবছর কখন?
বিশ্বের অনেক দেশ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থবছর হিসাব করে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রাজিল, রাশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে এ পদ্ধতি চালু রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, নেপাল ও পাকিস্তানের মতো কয়েকটি দেশে জুলাই-জুন অর্থবছর প্রচলিত। ভারত ও যুক্তরাজ্যে এপ্রিল-মার্চ সময়কাল অনুসরণ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মত
অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বর্ষাকালের সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচির অসামঞ্জস্য কমলে কাজের গতি ও মান বাড়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে শুধু অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তন করলেই উন্নয়ন প্রকল্পের দীর্ঘদিনের জটিলতা দূর হবে না। বাজেট প্রণয়ন, অর্থছাড়, রাজস্ব আদায়, সরকারি হিসাব ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করাও জরুরি।
সব মিলিয়ে, এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় একটি বড় পরিবর্তন। সঠিক প্রস্তুতি, প্রযুক্তিগত সমন্বয়, জবাবদিহি ও দক্ষ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এ পরিবর্তন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
