ইলিশের দেশেই কেন ভারত থেকে আসছে ইলিশ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৪ এএম
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশকে ইলিশের দেশ বলা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ ইলিশ আমদানি হচ্ছে। গত দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে প্রায় সাত কোটি টাকা মূল্যের ৩ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৪ কেজি ইলিশ আমদানি করেছে ১৯টি প্রতিষ্ঠান। আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারত থেকে আরও ইলিশ বাংলাদেশে আসার পথে রয়েছে।
আমদানি করা ইলিশের বেশিরভাগই ভারতের গুজরাট থেকে আসছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের পেট্রাপোল সীমান্ত হয়ে এসব মাছ বেনাপোল দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। এমনকি দেশের বিভিন্ন বাজারে ভারত থেকে আমদানি করা ইলিশকে বাংলাদেশের মাছ হিসেবে বিক্রি করার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
পশ্চিমবঙ্গ চিল্ড ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ জানিয়েছেন, গত প্রায় দুই মাসে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ বাংলাদেশে রপ্তানি হয়েছে। তার দাবি, রপ্তানি হওয়া মাছের প্রায় পুরোটাই গুজরাট থেকে এসেছে।
কেন ভারত থেকে ইলিশ আমদানি
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত বাংলাদেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ায় আমদানির প্রতি ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বেড়েছে। পাশাপাশি ভারত থেকে আমদানি করা ইলিশের দাম দেশের বাজারের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় এতে ব্যবসায়ীদের লাভের সুযোগও রয়েছে।
যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মনিরুল মামুন বলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়েই কিছু প্রতিষ্ঠান ইলিশ আমদানি করছে। তবে কেন এবার এত বেশি ইলিশ আমদানি করা হচ্ছে, সে বিষয়ে তাদের নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।
তিনি বলেন, ‘এর সঠিক কারণ জানা নেই। হয়তো ভারতে এবার বেশি ইলিশ ধরা পড়েছে। ব্যবসায়ীরা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আমদানি করছেন, ফলে আমরাও অনুমতি দিচ্ছি।’
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বলেন, ব্যবসায়ীদের আবেদনের ভিত্তিতে সীমিত পরিসরে ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, এ বছর বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম দেখা যাচ্ছে। ইলিশ সমুদ্র থেকে প্রজননের জন্য নদীতে আসে। ভারতীয় জলসীমায় বেশি মাছ ধরা পড়া এবং বাংলাদেশের মজুত কমে যাওয়ার মতো কারণেও সীমিত পরিসরে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
দেশে কমছে ইলিশের উৎপাদন
বাংলাদেশে প্রায় দুই দশক ধরে ইলিশের উৎপাদন বাড়লেও গত কয়েক বছর ধরে তা কমছে। একই সঙ্গে মাছটির গড় ওজনও কমে আসছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন গবেষকরা।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদিত হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে হয় ৫ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টন। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন ৫ লাখ টনের নিচে নেমে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা।
ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান বলেন, নদীদূষণ, কারেন্ট জাল দিয়ে জাটকা নিধন, বালু উত্তোলন, ক্ষতিকর পদ্ধতিতে মাছ ধরা এবং ইলিশের বিচরণপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে দেশে ইলিশের উৎপাদন কমতে পারে।
তার মতে, সাগর থেকে নদীতে ইলিশের আসার পথ বা মাইগ্রেটরি রুট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াও উৎপাদন কমার অন্যতম কারণ হতে পারে। পাশাপাশি নদী ও জলাশয়ে কীটনাশকসহ বিভিন্ন দূষণ ইলিশের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে।
আমদানিতে ব্যবসায়ীদের লাভ
ইলিশ আমদানিকারকদের হয়ে কাজ করা একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মো. কামরুজ্জামান বলেন, চাহিদার তুলনায় বাজারে সরবরাহ কম থাকায় ব্যবসায়ীরা ইলিশ আমদানি করছেন।
তিনি বলেন, সরকারের অনুমতি নিয়েই এসব মাছ আমদানি করা হচ্ছে। ব্যবসায় লাভ না থাকলে কেউ ইলিশ আমদানি করতেন না।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে আমদানি করা ইলিশের ক্রয়মূল্য সর্বোচ্চ প্রায় দুই ডলার বা ২৪৬ টাকা এবং অনেক ক্ষেত্রে এর চেয়েও কম। কাস্টমস শুল্ক ও অন্যান্য খরচ যোগ করার পরও একই ওজনের দেশি ইলিশের তুলনায় আমদানি করা মাছের দাম কম পড়ে।
একজন কর্মকর্তা জানান, গত দুই মাসে বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় আমদানি করা মাছ যশোর অঞ্চলে ব্যাপকভাবে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে ইলিশের দামও চড়া
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার বিভিন্ন বাজারে ইলিশের দামও বেশ চড়া। ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৫০০ গ্রামের বেশি ওজনের ইলিশের দাম চাওয়া হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা। ৭০০ গ্রামের মাছের দাম প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের ইলিশ ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং ১ কেজির বেশি ওজনের ইলিশের দাম প্রায় ২ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে।
মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। বিশ্বে উৎপাদিত ইলিশের বড় একটি অংশ বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়।
রপ্তানিকারক থেকে আমদানিকারক বাংলাদেশ
একসময় বাংলাদেশ ছিল ইলিশ রপ্তানিকারক দেশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্রও বদলে গেছে। গত অর্থবছরে ইলিশ রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ২০০ টন। বিপরীতে ১১০ টনেরও কম ইলিশ রপ্তানি হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ২০২০ সালে ছয় বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বলেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পটি কতটা কার্যকর হয়েছে এবং কোথাও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণও বের করতে হবে
গুজরাটে বেড়েছে ইলিশের জোগান
পশ্চিমবঙ্গের মাছ রপ্তানিকারক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদের দাবি, এ বছর গুজরাটে ইলিশের জোগান বেড়েছে। ফলে সেখানে মাছের উদ্বৃত্ত তৈরি হওয়ায় দামও তুলনামূলক কমেছে।
তার মতে, বাংলাদেশে ইলিশের পাশাপাশি ইলিশের ডিমেরও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। গুজরাটের ইলিশ আকারে বড় এবং ডিমে ভরা হওয়ায় বাংলাদেশের ক্রেতাদের কাছে এর চাহিদা বেশি।
বর্তমানে গুজরাটের ভারুচ থেকে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার পাইকারি বাজার হয়ে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ইলিশ আসছে বলে জানান তিনি।
ভারুচের ভাদভূত এলাকার মাছ ব্যবসায়ী সংগঠনের সভাপতি চিমন ট্যান্ডেল বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে সেখানে ইলিশের উৎপাদন ভালো হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি বাংলাদেশেও এসব মাছ পাঠানো হচ্ছে।
তার তথ্য অনুযায়ী, ভাদভূত থেকে রেফ্রিজারেটেড ট্রাকে সরাসরি বাংলাদেশেও মাছ পাঠানো হয়। পরিমাণ বেশি হলে সাধারণত ট্রাকেই পাঠানো হয়, আর কম হলে ট্রেনের কনটেইনার ব্যবহার করা হয়।
দূষণ ও শিল্পভিত্তিক মাছ ধরার প্রভাব
গুজরাটে নর্মদা নদী সাগরে মেশার স্থান ভাদভূতের কাছে সবচেয়ে বেশি ইলিশ পাওয়া যায়। এছাড়া জম্বুসার ও হানসোট এলাকাতেও ইলিশ ধরা পড়ে।
পশ্চিমবঙ্গের মৎস্যজীবী সংগঠনের নেতা জয়কৃষ্ণ হালদার ইলিশের জোগানের পরিবর্তনের জন্য জলদূষণ ও শিল্পভিত্তিক মাছ ধরাকে দায়ী করেছেন।
তার মতে, নদী ও জলাশয়ে শিল্পবর্জ্য ও অন্যান্য দূষণ বন্ধের পাশাপাশি বড় মোটরচালিত নৌযানের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে শিল্পভিত্তিক মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। এসব কারণে সাধারণ মৎস্যজীবীদের মাছের জোগানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সব মিলিয়ে, ইলিশ উৎপাদনে দীর্ঘদিনের সাফল্যের পর বাংলাদেশে এখন একই মাছ আমদানি করার বিষয়টি নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে সংশ্লিষ্টদের। দেশের জলসীমায় ইলিশের উৎপাদন ও প্রজনন পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র : বিবিসি বাংলা
