‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে আইজিপির বক্তব্যে নিন্দা-উদ্বেগ, অপসারণের দাবি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম
পুরান ঢাকায় ‘কমিউনিটি ইসলামিক ব্যাংক সিস্টেম’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইজিপি বক্তব্য দেন। ছবি: সংগৃহীত
সরকারের অনুমতি পেলে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করতে পিছপা হবে না— পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের এমন মন্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংস্থা। তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার, নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দায়িত্ব থেকে অপসারণের দাবিও উঠেছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) পুরান ঢাকায় ‘কমিউনিটি ইসলামিক ব্যাংক সিস্টেম’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইজিপি বলেন, “আমাদের দায়িত্ব, আইন-সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, সেইটাই আমরা করব। যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাও করে, আমরা সেইটা করব।”
আইজিপির এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন ও নাগরিক সমাজে সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপির সর্বশেষ নির্বাচনী ইশতেহারে ক্রসফায়ারকে ‘বিচারবহির্ভূত নির্মম হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে অতীতের ঘটনাগুলোর বিচার করার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের নয় মাসের মাথায় পুলিশপ্রধানের এ বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও মানবাধিকারকর্মীরা।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে ক্রসফায়ারসহ বিভিন্ন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও গুপ্তহত্যার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশ-বিদেশে সমালোচিত হয়। সে সময় র্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
এনসিপির কঠোর সমালোচনা
সোমবার বিকেলে এক গণসংযোগ কর্মসূচিতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ আইজিপির বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, “আইজিপি ফকির, এই গুণ্ডা ফকির, আজ বলছে, সরকার যদি অনুমতি দেয় তারা নাকি মানুষকে গুলি করবে। এই যে গুণ্ডা আইজিপি, যে ক্রসফায়ার করে গুলি দিয়ে মানুষ মেরে ফেলতে চাচ্ছে, তারা হচ্ছে ডিবি হারুনের বংশধর। এই আইজিপি ফকির হচ্ছে বেনজিরের বংশধর, তারা হচ্ছে বিপ্লবের বংশধর। তাদের পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে পুলিশকে আবার কলঙ্কিত করা হচ্ছে।”
এবি পার্টির ব্যাখ্যা দাবি
আইজিপির বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, সরকারের অনুমোদন থাকলেই কোনো নাগরিককে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার বৈধতা তৈরি হয় না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ অবশ্যই সংবিধান, আইন ও মানবাধিকারের সীমার মধ্যে থাকতে হবে।
বিবৃতিতে আইজিপির বক্তব্যের বিষয়ে সরকারের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেন দলটির দুই শীর্ষ নেতা।
ইসলামী আন্দোলনের উদ্বেগ
পৃথক বিবৃতিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের ক্রসফায়ার-সংক্রান্ত বক্তব্য উদ্বেগজনক এবং তা পতিত ফ্যাসিস্ট আমলের পুলিশের কথা মনে করিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, “আমরা বিশ্বাস করতে চাই, আলী হোসেন ফকির হালকা মেজাজে এই মন্তব্য করেছেন। যদিও এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে হালকা মেজাজে মন্তব্য করা যায় না।”
টিআইবির বক্তব্য প্রত্যাহার ও অপসারণের দাবি
আইজিপির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, পুলিশপ্রধানের এ মন্তব্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মোকাবিলার পরিবর্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিপজ্জনক বার্তা দেয়।
সংস্থাটি বক্তব্যটিকে সংবিধান ও আইনের শাসনের প্রতি চরম অবজ্ঞার প্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করেছে। একই সঙ্গে বক্তব্য প্রত্যাহার, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা এবং এ বিষয়ে আইজিপির জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দায়িত্ব থেকে অপসারণেরও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিজেদের ব্যর্থতার ঢাল হিসেবে পুলিশপ্রধান ঘৃণিত ক্রসফায়ারকে ব্যবহার করতে চাইছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকারের অনুমতির শর্ত জুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, পুলিশের দায়িত্ব পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্ত করা এবং গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি করা। এর বিকল্প হিসেবে ক্রসফায়ারকে সামনে আনা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমাধান নয়; বরং তা পেশাগত দেউলিয়াত্বের দৃষ্টান্ত।
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, আইজিপি একই বক্তব্যে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন, আবার সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার করার কথাও বলেছেন। তাঁর মতে, এই দুই অবস্থান পরস্পরবিরোধী। কোনো সরকারের অনুমতি বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দিতে পারে না।
সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার যে অধিকার সুরক্ষিত রয়েছে, নির্বাহী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তা বাতিল করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিচারপ্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে কাউকে হত্যার এখতিয়ার পুলিশের নেই।
পুলিশপ্রধানের এ বক্তব্য মাঠপর্যায়ে বেআইনি বলপ্রয়োগের প্রচ্ছন্ন ছাড়পত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
সাংবাদিকদের নিয়ে মন্তব্যেরও প্রতিবাদ
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অর্থ না পেয়ে পুলিশের সমালোচনা করার যে অভিযোগ আইজিপি তুলেছেন, সে বিষয়েও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে টিআইবি।
সংস্থাটি বলেছে, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। ঢালাও অভিযোগ মুক্ত গণমাধ্যমের নজরদারি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতাকে নিরুৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে এইচআরএসএস
আইজিপির বক্তব্যে গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি সরকারের কাছে এ বিষয়ে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ব্যাখ্যা দাবি করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, “সরকার কি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে অনুমোদনযোগ্য মনে করে, নাকি এটি আইজিপির ব্যক্তিগত বক্তব্য তা অবিলম্বে পরিষ্কার করতে হবে।”
একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে বিরত রাখার বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার প্রত্যাশা করেছে সংস্থাটি।
