নতুন আইজিপির আলোচনায় একাধিক নাম
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সমালোচনার পাশাপাশি সরকারের ভেতরেও এ বক্তব্য নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার কথা জানা যাচ্ছে। এর মধ্যে আইজিপি পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা এবং নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ নিয়ে পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে।
গত সোমবার ঢাকার একটি অনুষ্ঠানে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’ করা হবে। তাঁর এই বক্তব্যের পর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়। মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা বক্তব্যটিকে সংবিধান ও প্রচলিত আইনের পরিপন্থি হিসেবে সমালোচনা করেন।
পরে পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়, আইনের কঠোরতা বোঝাতেই এমন মন্তব্য করা হয়েছিল। বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনও আইজিপির বক্তব্যের পক্ষে অবস্থান নেয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আইজিপির উদ্দেশ্য ছিল আইনের কঠোরতা বোঝানো। তবে এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করা তাঁর ঠিক হয়নি।
গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, জাপান সফর শেষে ২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফিরবেন। এরপর আইজিপিকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি এবং এ পদে পরিবর্তনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আইজিপি পদে পরিবর্তন বা নতুন নিয়োগের বিষয়টি সরকারপ্রধানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
জাহেদ উর রহমান আরও বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও আইনের শাসন প্রশ্নের মুখে পড়ে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ ধরনের কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার বা পুলিশ—কেউই ক্রসফায়ার করতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা কোনো বেআইনি কাজ করতে বাধ্য নন।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আইজিপির মন্তব্যে বাহিনীর ভেতরেও অনেকে বিব্রত। এ ধরনের বক্তব্য পুলিশের পেশাদারিত্ব ও ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি করে।
আইজিপি পদে আলোচনায় চার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা
বিতর্কের পর পুলিশপ্রধান পদে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পুলিশের ১৫তম বিসিএসের চার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নাম এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
তাঁরা হলেন—
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ।
অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবিব পলাশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই চার কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্য-সংবলিত নথিও তলব করেছে। তবে আইজিপি পদে পরিবর্তন বা নতুন নিয়োগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশের বক্তব্য ঘিরে আইনের শাসনের প্রশ্ন
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সিনিয়র সমন্বয়কারী ও মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবিরের মতে, পুলিশের পেশাগত দায়িত্ব পালনের অধিকার রয়েছে। তবে সেই অধিকারের দোহাই দিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা তৈরি করে—এমন বক্তব্যকে বৈধতা দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাম্প্রতিক বিবৃতিও এ বিতর্ক সামনে এনেছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ব্যাখ্যায়, বিবৃতিতে সরাসরি ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমর্থনের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বরং প্রচলিত আইন অনুসরণ, পেশাগত দায়িত্ব পালন, মানবাধিকার রক্ষা ও জবাবদিহির কথা বলা হয়েছে।
তবে বিবৃতির বক্তব্য ও যুক্তির ধরন বিবেচনায় এটি আইজিপির মন্তব্যের বিপজ্জনক দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, নাকি বক্তব্যটিকে আইনের যথাযথ প্রয়োগের আহ্বান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে—সে প্রশ্নও উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক গণমাধ্যমকে বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ ধরনের বক্তব্য ও চিন্তা গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ক্রসফায়ারকে সন্ত্রাস দমন ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে তুলে ধরা হলেও তাঁর মতে, এটি মূলত রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যূনতম শর্ত পূরণ না করে হত্যা করাই ক্রসফায়ারের বাস্তবতা। এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরির অন্যতম প্রেক্ষাপট ছিল।
ওমর ফারুকের মতে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও পুলিশপ্রধানের বক্তব্যে একই ধরনের চিন্তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সরকার অনুমতি দিলে বা প্রয়োজন হলে ক্রসফায়ার করা হবে—আইজিপির এমন বক্তব্য থেকে তাঁর চিন্তায় এই পদ্ধতির উপস্থিতি বোঝা যায় বলে মনে করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশের এ ধরনের ভাষা স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর মতে, ন্যূনতম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও এমন বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার করা উচিত বলেও মত দেন তিনি।
অতীতেও ক্রসফায়ার নিয়ে বিতর্ক
বাংলাদেশে ক্রসফায়ার ও কথিত বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। ২০০৪ সালে পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠন করা হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ক্রসফায়ার বা কথিত বন্দুকযুদ্ধে ২ হাজার ৯৫৭ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে পুলিশের অভিযানে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৩৭১ জন, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৪৬ শতাংশ।
একই সময়ে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) হাতে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ২০০ জন। এ ছাড়া পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে আরও ৬৯ জন নিহত হয়েছেন। বর্তমানে র্যাবের পরিবর্তে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্রসফায়ার নিয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০১৪ সালের নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা। ২০১৮ সালে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হলে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যুর ঘটনা ব্যাপক আলোচনায় আসে। ওই সময় টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হক র্যাবের গুলিতে নিহত হন। পরে ২০২০ সালের ৩১ জুলাই কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে পুলিশের গুলিতে প্রাণহানি, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের অভিযোগও পুলিশের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মহল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংস্কার বা বিলুপ্তির সুপারিশ করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৬ সেপ্টেম্বর র্যাব বিলুপ্ত করে এর পরিবর্তে পুলিশের অধীনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের আইন কার্যকর হয়।
আইজিপির ক্রসফায়ারসংক্রান্ত মন্তব্যের পর এখন তাঁর পদে পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে নতুন আইজিপি নিয়োগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত সম্ভাব্য কর্মকর্তাদের নাম আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
