ইউক্রেনে শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে সংশয়, আলোচনার আড়ালে বাড়ছে সংঘাতের শঙ্কা
সৈয়দ মুহাম্মদ আজম
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০২ পিএম
ছবি : সৈয়দ মুহাম্মদ আজম। ভোরের কাগজ
চলতি সপ্তাহে রাশিয়া সফর শেষ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। তার সফরে কয়েকটি অগ্রগতি হয়েছে। রাশিয়ার কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন মার্কিন নাগরিক স্টিফেন হাবার্ড। ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা আবার শুরু করতেও সম্মত হয়েছে মস্কো। এ ছাড়া ডিজের জ্বালানি বহনকারী একটি রুশ জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছে।
তবে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের জন্য শান্তি তো দূরের কথা, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাও এখনও ক্ষীণ। মার্কিন সংবাদমাধ্যমটির এই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে পরিস্থিতির বাস্তবতা, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান এবং কূটনৈতিক তৎপরতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাই বিষয়টি গভীরভাবে পরখ ও বিশ্লেষণ করে দেখা জরুরি।
সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে নিজের সংশয় গোপন করেননি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। গত ২২ অক্টোবর তিনি অভিযোগ করেন, উইটকফের সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠকের পরও মস্কো অবস্থান পরিবর্তন করেনি। বরং ইউক্রেনের ওপর একের পর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
কিয়েভ ও মস্কো যখন যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটনের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে, তখন জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ইউক্রেন বর্তমান ফ্রন্টলাইন বরাবর সংঘাত স্থগিত করতে প্রস্তুত।
এক বছরেরও বেশি আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে রাশিয়া তা প্রত্যাখান করে। মস্কোর দাবি, পূর্ব ইউক্রেনের পুরো দোনেৎস্ক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ কিয়েভকে ছেড়ে দিতে হবে। এর মধ্যে এমন কিছু সুরক্ষিত অবস্থানও রয়েছে, যেগুলো এখনও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
উইটকফের সেন্ট পিটার্সবার্গ সফরের পর ক্রেমলিনের সহকারী ইউরি উশাকভ জানান, মার্কিন দূতের যুক্তি মস্কোর অবস্থান পুনর্বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইউক্রেনের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের বিরোধিতা থেকে সরে এসে রাশিয়া এখন প্রযুক্তিগত আলোচনা শুরুর জন্য নভেম্বরের মাঝামাঝি আবুধাবিতে প্রতিনিধি পাঠাতে প্রস্তুত। ফেব্রুয়ারির পর এ ধরনের এটিই হবে প্রথম আলোচনা।
যুদ্ধ শেষ হতে আর কতটা সময় লাগবে, তা তিনি জানেন না বলে উল্লেখ করেন উশাকভ। তবে তার বিশ্বাস, পরিস্থিতি যুদ্ধের অবসানের দিকেই এগোচ্ছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকেরা, বিশেষ করে ইউক্রেনের বিশ্লেষকেরা, ততটা আশাবাদী নন।
ইউক্রেনের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ভলোদিমির ফেসেঙ্কো বলেন, ‘অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, আলোচনা চলছে মানেই অদূর ভবিষ্যতে শান্তিচুক্তি হবে, এমন নয়। বরং এর পাশাপাশি সংঘাত আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ইউক্রেনের ওপর বিমান হামলা জোরদার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আলোচনায় চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার হামলা ব্যবহার করা হবে। এটি এমন একটি কৌশল, যা পুতিন পছন্দ করেন। এ কারণেই আমি মনে করি, আলোচনা ও সংঘাতের বিস্তার একই সঙ্গে চলবে।’
ইউক্রেনের সংসদ সদস্য ওলেক্সান্ডার মেরেঝকোও আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তার মতে, বর্তমান আলোচনা নিষ্ফল এবং অদূর ভবিষ্যতে এর মাধ্যমে কোনো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম।
রাশিয়ার কৌশলগত হিসাব
আন্তর্জাতিক শান্তি বিষয়ক কার্নেগি এনডাউমেনন্টের বিশিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্নেগি সেন্টার ফর রাশিয়ার ইউরেশিয়া অ্যান্ড ইউরোপের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তাতিয়ানা স্তানোভায়ার মতে, সম্প্রতি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং রাশিয়ার প্রতি ট্রাম্পের অবস্থানের পরিবর্তন পুতিনকে আলোচনায় ফিরতে উৎসাহিত করেছে।
তিনি বলেন, ‘পুতিনের আলোচনায় ফিরতে রাজি হওয়ার জন্য এসব পদক্ষেপ যথেষ্ট ভিত্তি তৈরি করেছে। বিশেষ করে, এতে মস্কোর কার্যত কোনো মূল্য দিতে হচ্ছে না।’
স্তানোভায়ার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কৌশলগত সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যেই আলোচনায় বসতে প্রস্তুত রাশিয়া। মস্কোর হিসাব হলো, ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে নিজেদের অনুকূলে কৌশলগত ভারসাম্য পরিবর্তন করা সম্ভব।
রুশ কর্মকর্তাদের দাবি, ট্রাম্পের দূতের সঙ্গে সর্বশেষ বৈঠকে স্পষ্ট হয়েছে যে কিয়েভ ও ইউক্রেনকে সমর্থনকারী ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রস্তাবে যথেষ্ট সারবত্তা বা তাৎপর্য নেই। তাদের দাবি, ওয়াশিংটনও এ মূল্যায়নের সঙ্গে একমত।
যুদ্ধ শেষ করতে ট্রাম্পের সমর্থনে এমন একটি সমঝোত চুক্তি আদায়ের চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরেই চালিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া। এর মাধ্যমে পূর্ব ইউক্রেনের পুরো দোনবাস অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ মস্কোর হাতে আসবে। এমন চুক্তি পুতিনকে বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ করে দিতে পারে।
রুশ সংসদ সদস্য লিওনিড স্লুতস্কি বলেন, ‘এই আলোচনাগুলো নিঃসন্দেহে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সাফল্যের সূচনা। বস্তুত, সর্বশেষ বৈঠক ইউক্রেনের সংঘাত নিরসনের বিষয়টিকে আবার আলোচনার পথে ফিরিয়ে এনেছে।’
পুতিন হয়তো এটাও বিবেচনায় রাখছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্প আবার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেন। ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের বর্তমান উষ্ণতা কাজে লাগিয়ে ইউক্রেনে নিজেদের সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও উন্নত করতে পারে মস্কো।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, পুতিন তার লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। কোনো ছাড় না দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে তার সামনে। তবে রুশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ভ্লাদিমির পাস্তুখভ মনে করেন, ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য পুতিন প্রশাসন এখনকার চেয়ে ভালো সুযোগ আর পাবে না।
অর্থাৎ এটি সংঘাতের আরেকটি সাধারণ মুহূর্ত নয়। বরং শান্তির শর্ত কে নির্ধারণ করবে, তা নিয়ে তীব্র কূটনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা চলছে। আলোচনার অগ্রগতি যুদ্ধের অবসানের আশা জাগালেও রাশিয়ার সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকা এবং দুই পক্ষের শর্তের ব্যবধান সেই সম্ভাবনাকে এখনও অনিশ্চিত করে রেখেছে।
লেখক: সৈয়দ মুহাম্মদ আজম, সাংবাদিক। ইমেইল: [email protected]
