মসজিদের কমিটি নিয়ে বিরোধ
মাদারীপুরে শতাধিক বাড়িতে হামলা-লুটপাট
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
মাদারীপুর সদর উপজেলার ঘটমাঝি ইউনিয়নের বাহেরান্দী গ্রামে মসজিদের কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধের জেরে শতাধিক বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলা এ ঘটনায় অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের মাদারীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, হামলার সময় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। আতঙ্কে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর ফিরে এসে অনেকেই নিজেদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও মালামাল লুটের শিকার দেখতে পান।
ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় বাচ্চু মোড়লের অনুসারীরা এ হামলায় জড়িত। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বাচ্চু মোড়ল দাবি করেছেন, তিনি বা তাঁর সমর্থকেরা এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত নন। ঘটনার সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীদের কয়েকজন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় তিন মাস আগে বাহেরান্দী জামে মসজিদের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে মোশারফ ফকিরকে সভাপতি করা হলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা বাচ্চু মোড়ল আপত্তি জানান। এরপর থেকে কমিটির নেতৃত্ব নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে এর আগেও কয়েক দফা কথা-কাটাকাটি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, বুধবার সকালে শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এমদাদ মাতুব্বরের সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা চালান। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে ভাঙচুর ও লুটপাট। এ সময় কয়েকটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগও ওঠে।
খবর পেয়ে মাদারীপুর সদর থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা শিল্পী আক্তার বলেন, অন্যের বাড়িতে কাজ করে তিনি সংসার চালান। তাঁর স্বামী ঢাকায় কাজ করেন। অনেক কষ্টে তৈরি করা ঘরটি ভাঙচুর করা হয়েছে এবং ঘরের জিনিসপত্র লুট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শিল্পী আক্তার বলেন, ‘আমি মানুষের বাড়িতে কাজ করি। আমার স্বামী ঢাকায় কাজ করেন। অনেক কষ্ট করে ঘরটা করেছি। এখন ঘরে কিছুই নেই। জিনিসপত্র নিয়ে গেছে, ঘর ভেঙেচুরে দিয়েছে। আমি বাচ্চু মোড়লদের বিচার চাই।’
আলামিন মাতুব্বর, রুবিনা ও মারুফ হোসেনসহ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, বিস্ফোরণের শব্দে প্রাণভয়ে তাঁরা বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। পরে ফিরে এসে ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও মালামাল লুটের ঘটনা দেখতে পান।
তাঁদের অভিযোগ, পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও হামলাকারীদের বাধা দেওয়া হয়নি।
জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা তামিম মাতুব্বর অভিযোগ করেন, পুলিশ পক্ষপাতমূলক আচরণ করে তাঁদের বাড়িঘর থেকে সরিয়ে দেয়। পরে প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁদের বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে বলে দাবি করেন তিনি।
তামিম মাতুব্বর বলেন, ‘আমি একজন জুলাই যোদ্ধা এবং ছাত্রদলের কর্মী। আমার ঘরও তারা ছাড় দেয়নি। বাচ্চু মোড়ল আওয়ামী লীগের নেতা। আমি জুলাই যোদ্ধা হওয়ার কারণে আমাদের ঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে।’
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মসজিদের কমিটি নিয়ে বিরোধই হামলার একমাত্র কারণ কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। তাঁরা হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বাচ্চু মোড়ল বলেন, তিনি বা তাঁর সমর্থকেরা কারও বাড়িঘরে লুটপাট, ভাঙচুর কিংবা অগ্নিসংযোগ করেননি। তাঁর দাবি, ক্ষতিগ্রস্তরা নিজেরাই এসব কাজ করেছেন।
অন্যদিকে, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক। দুই পক্ষকে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে বলা হয়েছে এবং পুলিশ আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছে।
মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
