×

মতামত

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি: পরিসংখ্যানের আয়নায় ভয়াবহ এক হত্যাযজ্ঞ

Icon

ফেরদৌস আরেফীন

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০২ পিএম

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি: পরিসংখ্যানের আয়নায় ভয়াবহ এক হত্যাযজ্ঞ

ছবি: সংগৃহীত

সাভার, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি ব্যস্ত শিল্প এলাকা। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে, সাভার বাস স্ট্যান্ডের কাছে অবস্থিত নয়তলা বাণিজ্যিক ভবন রানা প্লাজা আচমকা ধসে পড়ে। এই নয়তলা ভবনটিতে পাঁচটি পোশাক কারখানা, একটি শপিং মল এবং একটি ব্যাংকের শাখা ছিল।

ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক। উদ্ধার অভিযানের দিনগুলিতে ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপ থেকে ১,১৩৬টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় এবং ২,৪৩৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়, যাদের মধ্যে প্রায় ২,০০০ মানুষ আহত বা প্রতিবন্ধী হন। বিভিন্ন সূত্রে নিহতের সংখ্যা ১,১২৯ থেকে ১,১৭৫ এর মধ্যে উল্লেখ করা হলেও, সাম্প্রতিক তথ্য ও সরকারি কাগজপত্র ১,১৩৫ থেকে ১,১৩৮ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করে। রানা প্লাজা ধস বিশ্বের ইতিহাসে তৃতীয় বৃহত্তম শিল্প দুর্ঘটনা এবং আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনাজনিত কাঠামোগত ব্যর্থতা হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।

এই ট্র্যাজেডি নিছক কোনো ‘দুর্ঘটনা’ ছিল না; বরং এটি ছিল কাঠামোগত ব্যর্থতা, নিয়মকানুনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ও মানবজীবনের প্রতি নীতিহীন উদাসীনতার এক শৃঙ্খলিত পরিণতি। ভবনটির মালিক সোহেল রানা অনুমতি নিয়েছিলেন পাঁচ থেকে ছয় তলা ভবন নির্মাণের, কিন্তু তিনি বেআইনিভাবে আরও কয়েক তলা যোগ করে সেগুলো পোশাক কারখানা হিসেবে ভাড়া দেন। তদন্তে দেখা যায়, ভবনটির নকশা ও নির্মাণে নিম্নমানের ইট, সিমেন্ট ও রড ব্যবহার করা হয়েছিল। অধিকন্তু, ভবনটি মূলত একটি জলাভূমি ও পুকুর ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছিল, যা বহুতল ভবনের ভিত্তির জন্য অনুপযুক্ত ছিল। এর ওপর, কারখানাগুলোতে ব্যবহৃত ভারী জেনারেটর ও মেশিনারির কম্পন ইতিমধ্যেই দুর্বল কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছিল।

ধসের এক দিন আগে, ২৩শে এপ্রিল ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেয়। একজন প্রকৌশলী ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করার পরও, মালিক ও কারখানার কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের পরদিন কাজে যোগ দিতে বাধ্য করে। 

২৪ এপ্রিল সকালে, জেনারেটর চালু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো ভবনটি তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ে।

মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দোষীদের ন্যায়বিচারের আওতায় আনার প্রক্রিয়া আজ পর্যন্ত অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। এ ঘটনায় মোট তিনটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো পরিকল্পিত হত্যা, যেখানে ভবন মালিক সোহেল রানা, পাঁচ কারখানার মালিক এবং তৎকালীন সাভার পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলরসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। আইনের চোখে ধীরগতির বিচার প্রক্রিয়া এই ট্র্যাজেডির বেদনাকে আরও দীর্ঘায়িত করেছে। এ পর্যন্ত ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ১৪৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। ভবন নির্মাণ আইন লঙ্ঘনের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণও এখনো সম্পূর্ণ হয়নি, এবং অধিকাংশ আসামি জামিনে বা পলাতক রয়েছেন। এক যুগের বেশি সময় পরেও নিহত ও আহতদের স্বজনরা বিচার ও পূর্ণ ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন।

বিচারের পাশাপাশি, ক্ষতিপূরণের ইস্যুটিও ছিল জটিল। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ‘রানা প্লাজা ডোনারস ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠন করে, যার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় প্রায় ৩ কোটি ডলার। প্রায় ২৯টি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের অংশগ্রহণে এই তহবিল থেকে প্রায় ৩,০০০ দাবির বিপরীতে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। তবে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর যথাযথ অবদানের অভাব এবং ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার জটিলতার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, রানা প্লাজার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত নারী, পুরুষ ও তাদের পরিবারের সদস্যরা যথাযথ ও পূর্ণ ক্ষতিপূরণের অভাবে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন।

এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি, আশ্চর্যজনকভাবে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য এক টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে। ধসের পর আন্তর্জাতিক চাপ ও ক্রেতা সম্মিলনের উদ্যোগে গঠিত হয় ‘অ্যাকর্ড অন ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি ইন বাংলাদেশ’ এবং ‘অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেফটি’। এই সংস্থাগুলো প্রায় ২,০০০ কারখানায় প্রাথমিক পরিদর্শন করে ত্রুটি চিহ্নিত করে। ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, চিহ্নিত প্রায় ৮১% ঝুঁকি কাটিয়ে ওঠার কাজ সম্পন্ন হয়েছে, এবং ২৫ লাখেরও বেশি শ্রমিককে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তবে অগ্রগতি সত্ত্বেও প্রায় এক হাজার কারখানায় এখনো উল্লেখযোগ্য নিরাপত্তা ত্রুটি রয়ে গেছে।

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ক্ষমতা ও লোভের কাছে মানবিক মূল্যবোধ কত সহজে বিসর্জন দেওয়া হতে পারে। ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে আসা অসংখ্য মৃতদেহের প্রতিটি সংখ্যা এক একটি অকালপ্রয়াত স্বপ্ন ও সম্ভাবনার প্রতিনিধিত্ব করে। নিহত ও আহতদের স্বজনদের এখনো অধরা হয়ে আছে পূর্ণ ন্যায়বিচার। কিন্তু এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, সুশৃঙ্খল ও শোষণমুক্ত একটি শিল্প পরিবেশ গড়ে তোলার যে প্রত্যয়, সেটি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। রানা প্লাজার স্মৃতি সমগ্র বিশ্বের সামনে পোশাক শিল্পের কঠিন বাস্তবতা ও কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। প্রতিবছর ২৪ এপ্রিল, আমরা কেবল সেই শ্রমিকদের স্মরণই করি না, বরং তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত সংস্কারগুলোকে আরও সুসংহত ও সম্প্রসারিত করার কঠিন দায়বদ্ধতার কথাও স্মরণ করি।

লেখক: সাংবাদিক

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কাজ করছেন বিদেশি প্রকৌশলীরা

এফএসআরইউতে কারিগরি ত্রুটি গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কাজ করছেন বিদেশি প্রকৌশলীরা

‘আর্টিকেল ৫১’ কি সাহাবুদ্দিনের রক্ষাকবচ?

‘আর্টিকেল ৫১’ কি সাহাবুদ্দিনের রক্ষাকবচ?

অর্থ আত্মসাতের সুযোগ নেই, প্রাপ্য সবার কাছে পৌঁছাবে

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অর্থ আত্মসাতের সুযোগ নেই, প্রাপ্য সবার কাছে পৌঁছাবে

পাকিস্তানে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ১২ সেনা সদস্যসহ নিহত ১৫

পাকিস্তানে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ১২ সেনা সদস্যসহ নিহত ১৫

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App