×

মতামত

নাগরিকের ভুলে জরিমানা, কর্মকর্তার ভুলে কী?

ভুল করলেন কর্মকর্তা, বিল পেলেন নাগরিক—এ কেমন প্রশাসনিক ন্যায়বিচার?

Icon

মো. আনোয়ারুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৯ পিএম

নাগরিকের ভুলে জরিমানা, কর্মকর্তার ভুলে কী?

ছবি : সংগৃহীত

নাগরিক এক দিন দেরি করলে জরিমানা। ব্যাংকের কিস্তি দেরি হলে সুদ। বন্দরে পণ্য আটকে থাকলে ডেমারেজ। নির্ধারিত সময়ে কাগজ জমা না দিলে আবেদন বাতিল। রাষ্ট্রের হিসাবে নাগরিকের প্রতিটি দিনের মূল্য আছে। কিন্তু রাষ্ট্রের একটি ভুল সিদ্ধান্তে নাগরিকের ছয় মাস নষ্ট হলে সেই ছয় মাসের মূল্য কোথায় লেখা হয়?

ধরুন, একজন উদ্যোক্তা আইন মেনে একটি অনুমোদনের আবেদন করলেন। কর্মকর্তা তা প্রত্যাখ্যান করলেন। উদ্যোক্তা আপিল করলেন। ছয় মাস পর উচ্চতর কর্তৃপক্ষ জানাল—আগের সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। অনুমোদনও দেওয়া হলো। ফাইলের হিসাবে সমস্যার সমাধান।

কিন্তু ব্যবসার হিসাবে?

ছয় মাসের ব্যাংক সুদ কে দেবে? ডেমারেজ কে দেবে? বন্ধ কারখানার ক্ষতি, যন্ত্রপাতির অবচয়, হারানো অর্ডার কিংবা বাজার হারানোর মূল্য কে দেবে? কাগজে নাগরিক জিতলেন, অর্থনীতির হিসাবে তিনি ইতোমধ্যে হেরে গেছেন। এখানেই প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের বড় প্রশ্ন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ নাগরিককে আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার দিয়েছে। ১০২ অনুচ্ছেদ বেআইনি সরকারি কার্যক্রমের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে প্রতিকারের পথ রেখেছে।

অর্থাৎ সরকারি চেয়ার ক্ষমতা দেয়, আইনের ঊর্ধ্বে ওঠার অধিকার দেয় না।

বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের এন্টারপ্রাইজ সার্ভে-ভিত্তিক বাংলাদেশ বিশ্লেষণে অপারেটিং লাইসেন্স পেতে গড়ে ২৮ দিন এবং কনস্ট্রাকশন পারমিট ও ইমপোর্ট লাইসেন্স পেতে গড়ে ৪৯ দিন লাগার তথ্য উঠে এসেছে। নিয়ন্ত্রক সেবায় সময়ের তারতম্য ও ব্যক্তিনির্ভরতার সমস্যাও তাদের বিশ্লেষণে এসেছে। এই সময়ের একটি অর্থনীতি আছে।

১০০ কোটি টাকার একটি শিল্পপ্রকল্প একটি ভুল সিদ্ধান্তে ছয় মাস আটকে গেলে কর্মকর্তার টেবিলে সেটি একটি ফাইল।

  • উদ্যোক্তার কাছে সেটি ঋণ ও সুদ।
  • শ্রমিকের কাছে সেটি কর্মসংস্থান।
  • ব্যাংকের কাছে সেটি ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ।
  • রাষ্ট্রের কাছে সেটি হারানো উৎপাদন, কর-ভ্যাট ও বৈদেশিক মুদ্রা।

একটি ভুল স্বাক্ষরের অর্থনৈতিক মূল্য তাই কখনো একটি স্বাক্ষরে সীমাবদ্ধ থাকে না।

তবে প্রতিটি ভুল সিদ্ধান্তকে অপরাধ বলা যেমন অন্যায়, তেমনি প্রতিটি ভুলকে ‘অনিচ্ছাকৃত’ বলে দায়মুক্তি দেওয়াও বিপজ্জনক। জটিল আইনের যুক্তিসংগত ব্যাখ্যায় সৎ বিশ্বাসে নেওয়া সিদ্ধান্ত পরে ভুল প্রমাণিত হতে পারে। সেটি এক বিষয়।

কিন্তু সুস্পষ্ট আইন উপেক্ষা, নথি না দেখা, দায়িত্বে অবহেলা, একই ভুল বারবার করা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার—সেটি অন্য বিষয়। প্রশাসনে এই দুই ভুলের পার্থক্য করার ব্যবস্থাই জবাবদিহি।

আমি তাই একটি ‘প্রশাসনিক ভুলের অডিট’—Administrative Error Audit-এর কথা বলছি।

কোনো সিদ্ধান্ত আপিলে বাতিল হলে শুধু নতুন আদেশ দিয়ে ফাইল বন্ধ নয়। নথিতে তিনটি প্রশ্নের উত্তর থাকা উচিত—

  • ১. সিদ্ধান্তটি ভুল হলো কেন?
  • ২. ভুলে নাগরিক বা রাষ্ট্রের কতটা ক্ষতি হলো?
  • ৩. একই ভুল আবার না হওয়ার ব্যবস্থা কী?

আমাদের দেশে টাকার অডিট হয়। প্রকল্পের অডিট হয়। কেনাকাটার অডিট হয়। কিন্তু কোটি টাকার ক্ষতি ঘটাতে সক্ষম একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অডিট হবে না কেন?

রাষ্ট্র নাগরিককে একটি কঠিন নীতি শেখায়—

আইন না জানা অজুহাত নয়।

তাহলে পাল্টা প্রশ্নও বৈধ—

আইন প্রয়োগের দায়িত্ব যাঁর, তাঁর ভুল আইন প্রয়োগের পুরো বিল নাগরিকের হাতে যাবে কেন?

আগের লেখায় প্রশ্ন করেছিলাম—ফাইল অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখার ‘সিদ্ধান্ত না নেওয়ার ক্ষমতা’ কোন আইনে?

আজ তার পরের প্রশ্ন—

নাগরিকের ভুলে জরিমানা, কর্মকর্তার দায়যোগ্য ভুলে কী?

ভুল আদেশ সংশোধন করা যায়। কিন্তু হারানো সময় সংশোধন করা যায় না।

হারানো অর্ডার একটি নতুন আদেশে ফিরে আসে না। বন্ধ কারখানার ছয় মাস একটি সংশোধিত নথিতে উৎপাদনের ছয় মাস হয়ে যায় না। হারানো বিনিয়োগকারীর আস্থাও সরকারি চিঠিতে ফেরত আসে না।

তাই শুধু ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধন করাই ন্যায়বিচার নয়; ভুলের কারণ ও পরিণতির জবাবদিহিও ন্যায়বিচারের অংশ।

নাগরিকের এক দিনের ভুলের যদি মূল্য থাকে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগে দায়যোগ্য ভুলেরও হিসাব থাকতে হবে।

নইলে প্রশ্নটি থেকেই যাবে—

ভুল করলেন কর্মকর্তা, বিল পেলেন নাগরিক—এ কেমন প্রশাসনিক ন্যায়বিচার?

লেখক: মো. আনোয়ারুল ইসলাম, বিশ্লেষক; সভাপতি, বাংলাদেশ রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনিং মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (ব্রামা)

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

মারিয়া মাহির মৃত্যুর রহস্য উন্মোচন, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে আত্মহত্যার তথ্য

মারিয়া মাহির মৃত্যুর রহস্য উন্মোচন, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে আত্মহত্যার তথ্য

 ১৭২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ, আনিসুল হকের বিরুদ্ধে চার্জশিট

১৭২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ, আনিসুল হকের বিরুদ্ধে চার্জশিট

প্রতি বছর ৫ হাজার তরুণকে ২০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হবে

মাহদী আমিন প্রতি বছর ৫ হাজার তরুণকে ২০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হবে

মক্কায় ড্রোন হামলার চেষ্টার তীব্র নিন্দা পাকিস্তানের

মক্কায় ড্রোন হামলার চেষ্টার তীব্র নিন্দা পাকিস্তানের

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App