এনসিপির জামায়াত জোট ছাড়ার বিষয়ে যা জানা গেল
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:১২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দূরত্ব বাড়ছে—এমন আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো হচ্ছে। জোটের সর্বশেষ বড় কর্মসূচি লংমার্চে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এর আগে ও পরের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহেও দুই দলের সম্পর্কে টানাপোড়েনের ইঙ্গিত মিলেছে। ফলে জোট ছাড়ার গুঞ্জনও বাড়ছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ অক্টোবর এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেনের উপস্থিতিতে ওই বৈঠকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে জোটের কর্মসূচি কমিয়ে আনার বিষয়েও আলোচনা হয়। মূলত নির্বাচনে নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা যাচাই করতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
ইতোমধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি। ঢাকা দক্ষিণে দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং ঢাকা উত্তরে সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
এদিকে ১১ দলীয় ঐক্যের সাত দফা দাবিতে ঢাকা থেকে খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখে লংমার্চ শুরু হয় শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ৭টায়। সকাল ৮টা ২০ মিনিটে বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেট থেকে গাড়িবহর যাত্রা শুরু করে। উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
জামায়াত আমিরের বক্তব্যের পর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের জন্য একটি চেয়ার খালি রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি উপস্থিত হননি। তাঁর পরিবর্তে কর্মসূচিতে অংশ নেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ এবং সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব সার্জিস আলম। তবে তাঁদের কেউ উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তব্য দেননি। জামায়াতের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও এনসিপির নেতাদের বক্তব্য দেওয়ার কোনো ছবি প্রকাশ করা হয়নি। দলীয় সূত্রের দাবি, কর্মসূচি ঘিরে এনসিপির নেতাকর্মীদের মধ্যেও তেমন স্বতঃস্ফূর্ততা দেখা যায়নি।
ঢাকা, খুলনা, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ায় আয়োজিত এ লংমার্চে এনসিপির শীর্ষ নেতারা অংশ নেননি। অথচ এর আগের দুটি লংমার্চে নাহিদ ইসলামসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। তবে ঢাকা থেকে শীর্ষ নেতারা যোগ না দিলেও লংমার্চের মাঝপথে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, আব্দুল হান্নান মাসউদ এবং যুগ্ম সদস্য সচিব এস এম সাইফ মুস্তাফিজ অংশ নেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির এক শীর্ষ নেতা যুগান্তরকে জানান, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর পক্ষে প্রচার-প্রচারণা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন নাহিদ ইসলাম। তাঁদের পক্ষে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন তিনি। এ কারণেই লংমার্চে অংশ নিতে পারেননি।
তবে এনসিপির আরেক শীর্ষ নেতার দাবি, বিষয়টি শুধু ব্যস্ততার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর মতে, সিটি নির্বাচনে আসন সমঝোতা নিয়ে কয়েক দিন ধরে জামায়াতের সঙ্গে মতবিরোধ চলছে। এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে পরাজয়ের পর অনিয়মের অভিযোগে জামায়াত জোরালো অবস্থান না নেওয়ায় দলটির প্রতি ক্ষুব্ধ এনসিপি। এই অসন্তোষ থেকেই নাহিদ ইসলাম লংমার্চে যোগ দেননি বলে মনে করেন ওই নেতা।
এনসিপি ও জামায়াতের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দুই দলের দূরত্বের শুরু গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে আসন সমঝোতার আলোচনায় এনসিপি অন্তত তিনটি সিটিতে ছাড় চেয়েছিল। ঢাকার দুই সিটির অন্তত একটিতে প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে অনড় ছিল দলটি।
তবে জামায়াত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ঢাকার কোনো সিটিতেই শরিকদের ছাড় দিতে তারা রাজি নয়। এর পরিবর্তে কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে এনসিপিকে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দেয় দলটি। এনসিপি সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। একপর্যায়ে বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে যান দলটির নেতারা। সংশ্লিষ্ট নেতাদের ভাষ্য, এরপর থেকেই দুই দলের সম্পর্কে শিথিলতা তৈরি হয়। গত এক মাসে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেননি নাহিদ ইসলাম।
গত ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন ঘিরে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয় বলে জানিয়েছেন দল দুটির নেতারা। ওই নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থীর পরাজয়ের পর অনিয়মের অভিযোগে দলটির জোরালো প্রতিবাদ না করাকে ভালোভাবে নেয়নি এনসিপি। এ ছাড়া বিএনপির বিজয়ী প্রার্থীর কাছ থেকে পরাজিত জামায়াত প্রার্থীর হাসিমুখে মিষ্টি খাওয়ার ঘটনাও এনসিপি নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। এ নিয়ে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) শাহবাগে এনসিপির গণবিক্ষোভ কর্মসূচিতে তীব্র প্রতিবাদ জানান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
তবে দুই দলের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে—এমন দাবি মানতে নারাজ এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন। সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘সম্পর্ক খারাপ যাচ্ছে, এটা কে বলল? না, সম্পর্ক খারাপ এমন কিছু না। বিষয়টি হলো—একটা দলের সঙ্গে আরেকটা দলের সম্পর্ক, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভালো বা খারাপ হওয়ার মতো নয়। আমাদের প্রত্যেকটা দলের কিছু কিছু এজেন্ডা আছে, যেখানে এক ধরনের ঐক্য তৈরি হয়। সেটার কারণেই মূলত একটা জোট হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির কোনো আদর্শিক জোট নেই। নির্বাচনী ঐক্যের ভিত্তিতে ১১ দলীয় জোট গঠিত হয়েছে। ফলে জোটের কর্মসূচির পাশাপাশি এনসিপি নিজেদের কর্মসূচিও পালন করছে।’
