×

সাময়িকী

রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ : নারীর দৃঢ় পদচারণা

Icon

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২২, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ : নারীর দৃঢ় পদচারণা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) বহুবিচিত্র লেখায় প্রায় পৌনে দুশো বছর ধরে বুদ আছে প্রাচ্যের মানুষ। প্রাচীত্যেও তাকে নিয়ে গবেষণা খুব কম হয়েছে, হচ্ছে তেমনটা নয়। তারপরও তার লেখার বিষয়, আঙ্গিক, দর্শন নিয়ে চলছে নিরন্তর গবেষণা। সাহিত্যিক ও শিল্পী রবীন্দ্রনাথের লেখায় এবং কাজে তাকে এত এত অভিধায় অভিহিত করার পরও কেন যেন আশ মেটে না, পূর্ণতা আসে না। কোনো উপাধি তাকে পুরোপুরি ধারণ করতে সক্ষম নয়। সাহিত্য ও সৃষ্টিশীলতার বহুবিচিত্র শাখায় সদর্প বিচরণ বাদ দিলেও তার হাতে-কলমে বস্তুবাদী কাজের কথা যদি বলি তাহলে তিনি শিক্ষক, শিক্ষাপ্রবর্তক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষার সম্প্রসারক, বক্তা শিল্পোদ্যোক্তা, সংগঠক, সমাজ সংস্কারক, চিকিৎসক, কৃষি উন্নয়নের পরিকল্পনাবিদ। আরো কত কী! আসলে তল খুঁজে পাওয়া বড় ভার। তাই অসীমে ডুবে হাবুডুবু খাওয়ার মতো অপরিণামদর্শী হওয়ার মতো বোকামি এবং ঔদ্ধত্য কোনোটির দিকে না হেঁটে একটি খুব নির্দিষ্ট জায়গায় বিচরণের প্রয়াশ, আমার আজকের লেখাটি। মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩) বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিদ্রোহী স্রষ্টা। যেমন আঙ্গিকে তেমনি বিষয় ভাবনায়। সাহিত্যের অনেক শাখা তার হাতেই সৃষ্টি এবং সফল। আঙ্গিকের ভিন্নতার সঙ্গে সঙ্গে বিষয় ভাবনায়, চরিত্র সৃজনে একেবারে নতুন পথের অভিযাত্রী। দ্বিধাহীন চিত্তে তার কীর্তিকে স্বীকার করে নিয়েছি আমরা। না নিয়ে তো কোনো উপায় নেই। তার প্রমীলা, কৈকেয়ী সূর্পনখা সহ ‘বীরাঙ্গনা’ কাব্যের অন্যান্য বীরাঙ্গনাদের প্রতিবাদ, তাদের ন্যায্য দাবির যে পরিচয় আমরা পাই তাই বাংলা সাহিত্যে নারীর প্রথম দৃঢ়তার স্মারক হিসেবে আজো জ্বলজ্বলে। কথাটি খুব ঠিক। তারপরও দু-একটি কথা আগেও অনেকে বলেছেন। আমিও পুনরাবৃত্তি করছি। তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো পুরাণের ইতিহাসের কল্প জগতের বিরাট চরিত্র। তারা আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। আমরা তাদের দেখিনি, চিনি না। সেই জায়গা থেকে যিনি এক ঝটকায় আমাদের টেনে নামালেন তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর আমাদের চেনা প্রতিবেশি যারা নিত্যদিন আমাদের সঙ্গে কথা বলে সেই মানুষগুলোকে তুলে আনলেন ‘গল্পগুচ্ছে’র ছোট ছোট নিটোল গল্পে। অবশ্য পূর্ববঙ্গে আসার পূর্বে এই চেনা-জানা মানুষগুলো তার নিজের কাছেই অপরিচিত ছিল। কলকাতার জোড়াসাঁকোর সুউচ্চ প্রাচীর আর পারিবারিক বিধিনিষেধ অমান্য করে সহজ সাধারণ জীবন দেখার সুযোগ তার ছিল না। তাই তো প্রথম দিকের গল্পগুলোতে কেমন যেন অচেনা জগতের চরিত্র-পাত্রের আনাগোনা। তারা অনেকটাই কল্পলোকের বাসিন্দা। কিন্তু পূর্ববঙ্গের জমিদারি ভার গ্রহণ করেই রবীন্দ্রনাথ প্রথম দেখলেন সত্যিকারের দেশ-সমাজ-মানুষ। বিস্মিত হলেন। নিজের জানার সীমাবদ্ধতাও যেন স্পষ্ট হলো তার কাছে। বাস্তবের ধুলো-মাটি মাখা মানুষ, তাদের জীবন-জীবিকা-সংগ্রাম তাকে নতুন করে মানুষ চেনালো। দেখলেন জীবনের প্রকৃত রূপ। মোড় ঘুরে গেল ভাবনা চিন্তার। আর এই গর্বের অংশীদার আমরা তথা তৎকালের পূর্ববঙ্গের মানুষ। পূর্ববঙ্গে এসে মানুষের বহুবিচিত্র জীবন দেখলেন তিনি। দেখলেন সমাজ বাস্তবতা। সমাজের সংস্কার-কুসংস্কার-ক্লেদ-অন্ধকার। পুরুষের সঙ্গে সঙ্গে নারীর জীবন সংগ্রামও চোখ এড়ালো না জমকালো জমিদার বাড়ির কনিষ্ঠপুত্রের। বেদনার্ত হলেন। খুঁজতে শুরু করলেন মুক্তি-শুক্তি ও যুক্তির পথ। বলা হয়, ‘স্ত্রীরপত্রে’র মৃণাল বাংলা সাহিত্যের প্রথম সরব প্রতিবাদী নারী। কিন্তু আমার মূল্যায়ন রবীন্দ্রনাথের প্রথম সার্থক ছোটগল্প ‘দেনাপাওনা’র (১২৯৮) নায়িকা নিরুপমাই ‘গল্পগুচ্ছে’র প্রথম প্রতিবাদী নারী। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজো বিষ ছড়াচ্ছে যে যৌতুকপ্রথা, তার বলী নিরুপমা। নিরুপমা বাবার অত্যন্ত কাক্সিক্ষত কন্যা। অনেক চাওয়ায় কন্যাকে পেয়েছিলাম পিতা। তাই তো নাম রেখেছেন নিরুপমা। আদরের একমাত্র কন্যাকে সমাজ কাক্সিক্ষত পাত্রের হাতে তুলে দিতে চাইবেন, সেটাই স্বাভাবিক। তার জন্য সব ত্যাগ স্বীকার করতেও প্রস্তুত। তাই তো পাত্রপক্ষের সকল দাবি মেনে নিয়েছেন। দাবি মেটাতে মেটাতে একদিন তলানিতে পৌঁছেছে রামসুন্দর। তখনো অতি আদরের নিরুর ভালো থাকার জন্য ছেলেদের বঞ্চিত করে সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়েছে। এই সত্য যখন নিরুপমার কাছে পৌঁছাল, তখন নির্বিবাদি নিরু চরম দৃঢ়তায় প্রতিবাদ করে উঠল। বিনাবাক্যে মৃত্যুকে রবণ করতে প্রস্তুত নিরুপমা বলে ওঠে, ‘টাকা যদি দাও তবেই অপমান। তোমার মেয়ের কি কোনো মর্যাদা নেই। আমি কি কেবল একটা টাকার থলি, যতক্ষণ টাকা আছে ততক্ষণ আমার দাম।’ আবার বলেছে, ‘বাবা এ টাকা দিয়ে তুমি আমাকে অপমান করো না।’ একটি মেয়ে একটি মানুষ। বাবার টাকার থলির ওজনের ওপর একটি মেয়ের ওজন পরিমাপ করা যায় না। দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে প্রতিবাদ জানায় নিরুপমা। ‘পোস্টমাস্টারে’র (১২৯৮) রতন সদ্য কিশোরী। অনাথ অসহায় কিন্তু দুর্বল নয়। স্নেহ-মায়া-ভালোবাসা যে বিক্রিযোগ্য নয়, তা যে হাত বদল করা যায় না; সে কথা বলতে রতন একমুহূর্ত সময় ব্যয় করেনি। প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রয়োজনের প্রয়োজন তার কাছে বড়। অর্থ নয়, বিকল্প মানুষ নয়- দরকার শুধু ভালোবাসা আর ভালোবাসার মানুষটি। তাই তো শহুরে শিক্ষিত দাদাবাবু যখন তার বদলি পোস্টমাস্টারকে রতনের দেখাশোনার অনুরোধ করবে বলে জানায় তখন মুখের পর বলে দেয়, ‘না না, তোমার কাউকে কিছু বলতে হবে না, আমি থাকতে চাই নে।’ স্নেহের বিনিময়ে স্নেহ কাম্য, অর্থ নয়। এই সত্য ছোট অনাথ গ্রামীণ বালিকা বুঝলেও দাদাবাবু বোঝেনি। তাই তো তার জন্য অর্থ-কড়ি দিতে গেলেও সে চরম যন্ত্রণায় অপমানে বলে ওঠে, ‘দাদাবাবু, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, আমাকে কিছু দিতে হবে না; তোমার দুটি পায়ে পড়ি, আমার জন্য কাউকে কিছু ভাবতে হবে।’ যে দাদাবাবু তাকে বুঝতেই পারিনি, সেই দাদাবাবুর অকারণ ভাবনাকে তার কাছে করুণার দান মনে হয়েছে। মনে হয়েছে ভিক্ষার অন্ন। তাই তো চরম অনুযোগে তার দৃঢ়তার কথা ওইভাবে জানিয়েছে। ‘মহামায়া’র (১২৯৯) মহামায়াও একইভাবে দৃঢ়চেতা। সেই ক্লান্ত দুপুরে শ্মশান ঘাটে যখন রাজীবের সঙ্গে সে দেখা করেছিল তখন সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি রাজীবকে সে জীবনে গ্রহণ করবে। কিন্তু তার দাদার মনোভাব বুঝতে তার দেরি হয়নি। তাই তো বিনা দোষে দোষী যেহেতু তাকে হতেই হবে তাই সে জানিয়েছে- ‘রাজীব তোমার ঘরেই আমি যাইব। তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করো।’ তার কথা ও কাজের মধ্যে কোনো ফারাক হয় না। তাই তো হঠাৎ ফিরে পাওয়া জীবনটা নিয়ে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে রাজীবের ঘরে সে গেছে। রাজীবের কাছে গেলেও সে আর আত্মসম্মান হারাতে রাজি নয়। সে কারণে আশ্রয়ের আগেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। সে জানে ভালোবাসার ক্ষেত্রে রূপজমোহ একটি বড় উপকরণ। আর সেই রূপ যেহেতু ক্ষতিগ্রস্ত ভালোবাসাও সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর করুণাই তখন সম্বল। কিন্তু ভালোবাসার মানুষের কাছে করুণার পাত্রী হয়ে বেঁচে থাকার থেকে মরণ শ্রেয়। তাই তো প্রতিজ্ঞা ভেঙে রাজীব যখন তার ঘরে এসে তার পোড়া মুখ দেখে তখন নিজের অজান্তেই তার আর্তস্বর বেরিয়ে এলো, তখনই ঘুম ভাঙল প্রবল ব্যক্তিত্বময়ী মহামায়ার। নিশ্চিত আশ্রয় ছেড়ে নিরুদ্দেশ যাত্রা করল রাতের অন্ধকারে, ‘মহামায়া একটি মাত্র উত্তর না করিয়া, মুহূর্তের জন্য পশ্চাতে না ফিরিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।’ করুণা নিয়ে প্রিয়জনের সঙ্গে থাকা যায় না, এ কথাই যেন শিখিয়ে গেল মহামায়া। ‘জীবিত ও মৃত’ (১২৯৯) এর বিধবা ছোট বউ কাদম্বিনী। শত চেষ্টাতে বোঝাতে পারিনি সে জীবিত। কাজে কর্মে সেবায় সে জীবিত মানুষের সব আচরণ পালন করেও চিৎকার করে বলেছে, ‘এই দেখো, আমি বাঁচিয়া আছি।’ হাজার চেষ্টা করে বারবার চিৎকার করে বলেছে, ‘ওগো আমি মরি নাই গো, মরি নাই গো, মরি নাই।’ এরপরও যখন কেউ সেটা বিশ্বাস করেনি তখন এই অস্তিত্বহীনতার সংকট নিয়ে সে বাঁচতে চায়নি। সে মরে প্রমাণ করেছে, সে জীবিত, ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই।’ সমাজে প্রতিক্ষণে যেন মেয়েদের মরে প্রমাণ করতে হয় সে জীবিত ছিল। ‘শাস্তি’ (১৩০০) গল্পের চন্দরা তো সবার থেকে এগিয়ে। গ্রামের সামান্য চঞ্চল গৃহবধূ। তন্বী বালিকা, উড়ে চলা তার স্বভাব। শুধুই কি স্বভাব! না, বরং স্বামীর মনে ঈর্ষা জাগাতে সে ছল করে। ভালোবাসে স্বামীকে। বিশ্বাস ছিল স্বামীও বাসে। কিন্তু এক লহমায় তার কল্পিত স্বর্গ ভেঙে পড়ে। স্বামীর কাছে স্ত্রীর বিকল্প আছে, ভাইয়ের কোনো বিকল্প নেই। এই একটি বাক্যে সংসারে-স্বামীর কাছে তার অবস্থান যেন স্বরূপে হাজির হয়। তাই তো শত চেষ্টাও তাকে তার সিদ্ধান্ত থেকে নড়ানো গেল না। বরং মৃত্যু তার কাছে অনেক বেশি আপন। এ যেন ‘মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান।’ স্বামীর প্রতি তীব্র বিরাগ, ঘৃণা থেকে সিভিল সার্জনের প্রশ্নের জবাবে বলেছে, ‘মরণ’। স্বামীর সঙ্গে দেখা করার চেয়ে মৃত্যু ঢের শ্রেয়। এই একটি শব্দে স্বামী ও সংসারের প্রতি সমস্ত ঘৃণা উগরে দিয়ে চন্দরা ফাঁসির দড়িকে আপন করে নিয়েছে। ‘দিদি’ (১৩০১) গল্পের শশীকলা স্বামী অন্তপ্রাণ। স্বামীর বদনাম শোনাও তার কাছে পাপ। অথচ স্বামীর অন্যায় ঠেকানোর হাজার চেষ্টা করে যখন ব্যর্থ হয় তখন ছোট ভাই নীলমণিকে বাঁচানোর জন্য ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের তাঁবুতে হাজির হয়। সাহেবের অনুরোধ অগ্রাহ্য করে স্বামী জয়গোপালসহ উপস্থিত সবার সামনে তার স্বামীর অন্যায় অত্যাচার তুলে ধরে। নীলমণিকে বাঁচাতে গেলে নিজের স্বামীর বাড়িতে রাখা যে নিরাপদ নয় সে কথা বলতেও সামান্য সংকোচ কাজ করেনি তার, ‘সাহেব যত দিন নিজের বাড়ি না ফিরিয়া পায় ততদিন আমার ভাইকে বাড়ি লইয়া যাইতে সাহস করি না। এখন নীলমণিকে তুমি নিজের কাছে না রাখলে ইহাকে কেহ রক্ষা করিতে পারিবে না।’ একদিকে জয়গোপালের লোভ অন্যদিকে জনসম্মুখে স্ত্রীকৃত অপমান যে জয়গোপালকে খুনিতে পরিণত করবেই এই কথা স্বামী ও সমাজের সামনে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল শশীকলা। ‘মানভঞ্জনে’র (১৩০২) গিরিবালা স্বামীকে নিজের কাছে টানার সব প্রয়াস করেও ব্যর্থ হলো। লবঙ্গ যার রূপে গুণের মোহে তার স্বামী তাকে ত্যাগ করেছে সে যে তার (লবঙ্গের) থেকে কোনো অংশে কম নয়, এই বোধ জেগে ওঠেছে গিরিবালার মনে। সংসারের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে যাত্রামঞ্চ আলোকিত করেছে। আলোকোজ্জ্বল মঞ্চে গিরিকে দেখে উন্মত্ত স্বামী মাতলামি শুরু করলে, পুলিশ গোপীনাথকে ধরে নিয়ে গেলেও নিরাসক্ত দৃঢ়চেতা গিরিবালা গিরিকন্যার মতো অটল অনড় থেকেছে। নিজেকে মূল্যবান করে সে দেখিয়েছে, সে কোনো অংশে কারো চেয়ে কম নয়। ‘হৈমন্তী’ (১৩২১) গল্পের হৈম তথা শিশির সত্য উচ্চারণে স্থির। সংসারের লক্ষ্মী বউ হওয়ার কৌশল সে জানে না, শেখালেও শেখে না। কারণ সেও যেন সত্যজাত সন্তান ‘একলব্য’। ঋষিতুল্য পুত্র পিতার কাছে তার সত্যের পাঠ। নিজের বয়স নিয়ে যেমন সত্য উচ্চারণ করেছে তেমনি পিতার সম্পর্কে একটি মিথ্যা কথাকে সে প্রশ্রয় দেয়নি। শ্বশুর বাড়ির লোকের সামনে প্রতিবাদ করে বলেছে, ‘আমার বাবা কখনোই মিথ্যা বলেন না। ‘শাশুড়ির আদেশ ইশারা, হুমকি কোনটি তাকে সত্য উচ্চারণ থেকে দূরে সরাতে পারেনি। আবার বাবার অপমান সে সহ্য করতে না পেরে বাবাকে অপমানের হাত থেকে বাঁচাতে মাথায় দিব্যি দিয়েছে, ‘বাবা, আর যদি কখনো তুমি আমাকে দেখিবার জন্য এমন ছোটাছুটি করিয়া এ বাড়িতে আসো তবে আমি ঘরে কপাট দিব।’ বাবাকে সম্মানের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রাণাধিক বাবাকে দূরে রাখতেও সে দ্বিধাহীন। ‘স্ত্রীর পত্রে’র (১৩২১) মৃণাল অনেক আগেই মূল্যায়িত। তার সাহস, মানবিকতা ব্যক্তিত্বে সে সত্যি কমলকে ধারণ করতে পারে। অথচ পুরুষ সমাজ বোঝেইনি মৃণাল আছে বলে কমল থাকে, মৃণাল তাকে ধারণ করে। স্বদেশি মৃণাল ঘরে থেকেও স্বদেশ সেবা করে। ঘরে বসেই গৃহবন্দি বিন্দুকে মুক্ত করতে তার সাহসিকতা সত্যি অনন্য। তার কাছে রক্তের সম্পর্ক নয়, অর্থ নয়, ছোট-বড় নয় মানুষই বড়। আর মানুষকে মানুষের অধিকার পাইয়ে দিতে নিজের পায়ের নিচের মাটির ভাবনা সে ভাবে না। তাই তো স্বামী সংসারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিন্দুর মুক্তির পথ খোঁজে। যা বিন্দুর সহদরা দিদি করতে পারেনি নিজের স্বার্থের কথা ভেবে। আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কেবল মাথার উপরের ছাদ আর সমাজের কাছে একটা সাইনবোর্ডের জন্য আত্ম অবমাননা করেনি মৃণাল। বেরিয়ে পড়েছে সম্মানহীন জীবনের বাইরে। খুঁজে নিয়েছে নিজেকে, মুক্ত আকাশের নিচে। ঘর নেই ক্ষতি কি, মান তো আছে। সে ঘর ছেড়ে নিজেকে, তার আত্মাকে বাঁচিয়েছে, ‘আমিও বাঁচব। আমি বাঁচলুম।’ এ যেন ‘এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়।’ ‘অপরিচিতা’র (১৩২১) কল্যাণী তো চমকে দিয়েছে চিরকালের বাঙালি সমাজকে। সম্পূর্ণ অভূতপূর্ব মেয়ে সে। শিরদাঁড়াহীন মানুষকে বিয়ে না করে নিজেকে বাঁচিয়ে নিয়েছে। লগ্নভ্রষ্টা হওয়ার জুজুর ভয়কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে দেশ সেবায় নিয়োজিত করেছে নিজেকে। ক্ষমতার কাছে অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়ানো তার কাছে লজ্জা। সে সত্য সুন্দরও কল্যাণের এক সমন্বিত আধার। তাই তো একদিকে যেমন অনুপমকে গাড়ি থেকে নামতে দেয়নি তেমনি আবার স্টেশন মাস্টারকে ডেকে ইংরেজিতে বলেছে, ‘এ গাড়ি আগে থেকে রিজার্ভ করা, এ কথা মিথ্যা কথা।’ সমাজের ভুল চিন্তাকে তোয়াক্কা না করে সেই সমাজের, দেশের কল্যাণে নিয়োজিত করেছে নিজেকে। বুঝেছে-বিয়ে নয়, শিক্ষাই নারী মুক্তির প্রধান উপায়। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত রেখে একটি দেশের কল্যাণ সাধন অসম্ভব। তাই শুরু করেছে কন্যাশিশুর শিক্ষার ভার। দৃঢ়চিত্ত আর কল্যাণব্রতে নিয়োজিত কল্যাণী তৎকালীন সমাজে সত্যিই যেন অপরিচিতা। শেষ পর্যন্তও সে তার সিদ্ধান্তে অটল। তাই তো একদিন যে অনুপম (সত্যিই তুলনা রহিত) কে আর মেরুদণ্ডহীনতার জন্য বিবাহের আসর থেকে ফিরে আসতে হয়েছিল, তার হাজারো প্রচেষ্টায় তাকে আর জীবনে গ্রহণ করেনি। তার কাছে বিয়ে একটি কাজ বা প্রথা বা সংস্কার। আর সেটা হলে যোগ্যতমের সঙ্গে হবে না হলে নয়। আর বিয়েই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। তা না হলে অনুপমের চেয়ে যোগ্যপাত্রকে পাওয়া সত্ত্বেও বিয়ে না করে থাকা কেন? ব্যক্তির থেকে সমষ্টি, সমষ্টি থেকে দেশ তার কাছে আরো অনেক বড়, অনেক গুরুত্ববহ সঙ্গে বড় আত্মসম্মান বোধ। ‘পয়লা নম্বর’ (১৩২৪) এর নায়িকা অনিলা। যিনি স্বামীকে ঘিরে জীবন কাটাচ্ছিলেন। যদিও স্বামী তার খবর কখনো রাখেননি। তার একমাত্র ভাই সরোজের খবরও নয়-ছয় মাস অন্তর নেন না। পরীক্ষায় খারাপ ফল হওয়াতে সরোজ গলায় চাদর বেঁধে আত্মহত্যা করে। এই বেদনা জানার পরও স্বামীর নিরাসক্ততায় সে নির্লিপ্ত থেকেছে। কিন্তু বাইরের একজন মানুষ যখন তার মনে তার সৌন্দর্যকে ভেতরের আলোকে দাম দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে তখন সে এই অবহেলার জীবন থেকে নিজেকে মুক্ত করেছে। দ্বিতীয় মানুষটি যখন জানালো তারও একটি অস্তিত্ব আছে, মূল্য আছে অনেকখানি তখন সংসার ছেড়ে অন্যের হাত না ধরেই হারিয়ে গেছে। অপমানের জীবন সে কিছুতেই মেনে নেয়নি। জীবনে বাঁচতে হলে কারো হাত ধরা যে নেহাত দরকার, এই ভাবনা হাওয়ায় উড়িয়ে বেরিয়ে পড়েছে একা। সে সীতাংশুকে একটিমাত্র চিঠি লিখেছে। জানিয়েছে, ‘আমি চললুম, আমাকে খুঁজতে চেষ্টা করো না। করলেও খোঁজ পাবে না। ‘যদিও পুরুষের নিজস্ব অহংবোধ সে কথা ভাবতেই পারে না। একজন নারী যে একা পথ চলতে পারে এই ভাবনা ভাবার ক্ষমতাই তার নেই। তাই তো তার স্বামী একান্ত মনে ধরে নিয়েছে সীতাংশুর হাত ধরে ঘর ছেড়েছে অনিলা। কিন্তু তার অনুমান মিথ্যা। এখানেই অনিলা অনন্য। ‘রবিবার’র (১৩৪৬) বিভাবতী আলো হাতে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা এক লাবণ্যময়ী আলোকবর্তিকা। স্নিগ্ধ কোমল কিন্তু দৃঢ়। দীনহীন মানুষের প্রতি তার মমত্ববোধ সীমাহীন। প্রেমময়ীও বটে। দেশ মাতৃকার জন্য তার বিয়ের জন্য রেখে যাওয়া গহনা বিক্রি করে নির্দ্বিধায়। আবার অভীককেও ভালোবাসে মনে-মননে। কিন্তু স্থিরপ্রজ্ঞ লাবণ্য যেখানে মতের মিল হয়নি সেখানে যত ভালোবাসা থাকুক না কেন বিয়ের মতো সিদ্ধান্ত কিছুতে সে নেয়নি। ভালোবেসেছে সর্বান্তকরণে কিন্তু কাঙালপনা করতে সে কিছুতে রাজি নয়। ভালোবাসলেই নিজের মতামতগুলো ঝেড়ে ফেলে প্রিয়জনের অসঙ্গতিকে অস্বীকার করার কোনো মানে হয় না- সেটা সুস্পষ্ট করে জানাতে সে একটুও পিছপা হয়নি। হৃদয় রক্তাক্ত হলেও ব্যক্তি স্বতন্ত্র জলাঞ্জলি দেয়নি বিভা। ‘ল্যাবরেটরি’র (১৩৪৭) সোহিনী সমাজকে ঠিক চিনেছে। পোড় খেয়ে খাঁটি সোনা হওয়া সোহিনী বুঝেছে ল্যাবরেটরিকে ঘিরে যারা আছে তারা মূলত তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। তার সৌন্দর্য তাদের আকর্ষিত করে। সে জন্য ল্যাবরেটরি ঘরি তাদের আনাগোনা। তাই তো ল্যাবরেটরির স্বার্থে তাদের ক্ষুধার্ত মুখে এক মুঠো ভাত ছুড়ে দিয়ে কার্য উদ্ধার করে নিয়েছে। আবার সেই কল্যাণ ব্রতে বাধ সাধতে আসা আত্মজাকেও সম্পত্তির অধিকার বঞ্চিত করেছে নিমিষে। রেবতীকে এনেছিল ল্যাবরেটরির উন্নয়নে। কিন্তু তার সাধনা থেকে সরে গেছে বলে তাকে ছুড়ে ফেলেছে আঁস্তাকুড়ে। ‘গল্পগুচ্ছ’র গল্পগুলো ধরে যদি ক্রমে বিচার করা যায় তবে এমন দৃঢ়চেতা নারীর সন্ধান পেতে সচেতন পাঠকের কোনো অভাব হবে না। সময় যত সামনে এগিয়েছে চরিত্রগুলো যেন ক্রমে আরো পরিণত ও ঋজু হয়েছে। ‘মেঘ ও রৌদ্রে’র পরিণত গিরিবালা, ‘অনাধিকার প্রবেশ’র, জয়কালী, ‘রাসমণির ছেলে’র রাসমণি, ‘মুসলমানী’র গল্পের নায়িকা ছাড়াও গল্পের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে রয়েছে এমন সব সচেতন উন্নতচিত্তের এক একজন নারী; যারা হঠাৎ আলোর ঝলকানি হয়ে চোখ ধাঁধিয়ে হারিয়ে যায়নি। স্থির বিশ্বাসে, সদর্পে তাদের নিজস্বতা ঘোষণা করেছে। আমাদের দেখিয়েছে সামনে এগোনোর পথ।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র বিমান মহড়া শুরু

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র বিমান মহড়া শুরু

বাঙালির প্রিয় শুঁটকিতেও মিলল ৯ ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক

বাঙালির প্রিয় শুঁটকিতেও মিলল ৯ ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক

অটোরিকশা চলাচলে নতুন বিধিমালা

অটোরিকশা চলাচলে নতুন বিধিমালা

পোশাক শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা ও উৎপাদন-রপ্তানি সচল রাখার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

পোশাক শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা ও উৎপাদন-রপ্তানি সচল রাখার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App