হারাচ্ছে শিশুদের নিরাপদ বিনোদনের পরিবেশ
সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের পথে চর কুকরি-মুকরির ইকোপার্ক
এআর সোয়েব চৌধুরী, চরফ্যাশন (ভোলা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৪৫ পিএম
ছবি: ভোরের কাগজ
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা চরফ্যাশন উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ চর কুকরি-মুকরিতে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ইকোপার্কটি এখন অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের সংকটে। শিশুদের বিনোদনসামগ্রী ভেঙে পড়ছে, হাঁটার পথ ঢেকে যাচ্ছে ঝোপঝাড়ে, আর পরিচর্যার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে পার্কটির সৌন্দর্য। পর্যটন বিকাশের সম্ভাবনা নিয়ে গড়ে ওঠা এই স্থাপনা যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে কার্যকারিতা হারাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০১৮ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক পরিবেশের উন্নয়ন এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে ইকোপার্কটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পার্কটির অবকাঠামো ও বিনোদনসামগ্রীর অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, সংস্কার ও তদারকির ঘাটতি কাটিয়ে পার্কটিকে সচল করার দাবি জানিয়েছেন দর্শনার্থীরা।
পার্কে শিশুদের জন্য স্থাপন করা দোলনা, স্লাইডসহ বিভিন্ন বিনোদনসামগ্রী দীর্ঘদিন ধরে অযত্নে পড়ে রয়েছে। রোদ-বৃষ্টির প্রভাবে অনেক সরঞ্জামে মরিচা ধরেছে, কিছু ভেঙে পড়েছে, আবার কিছু ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। অন্যদিকে, নিয়মিত পরিষ্কার না করায় হাঁটার পথ ও পার্কের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েছে লতাপাতা, ঝোপঝাড় ও আগাছা।

এতে দর্শনার্থীদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিশুদের নিরাপদ বিনোদনের পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম পরীক্ষা করে মেরামত অথবা ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা অপসারণের প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন ব্যক্তিরা।
পার্কের বর্তমান অবস্থা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ও পর্যটক ইয়াহইয়া ইসলাম। তিনি বলেন, পরিবার নিয়ে একসময় এখানে আনন্দঘন সময় কাটাতে আসতাম। কিন্তু বর্তমানে পার্কের অবস্থা দেখে খুবই খারাপ লাগে। রাইডগুলো দ্রুত মেরামত করা হলে এবং পরিবেশ পরিষ্কার করা হলে জায়গাটি আবারও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকা থেকে আসা আরেক পর্যটক জিনিয়া ইসলাম বলেন, শিশুদের খেলার জন্য নির্মিত রাইডগুলো এখন ভাঙা অবস্থায় মাটিতে পড়ে রয়েছে। লোহার সরঞ্জামগুলো ভেঙে যাওয়ায় শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সরকার এত টাকা ব্যয় করে এগুলো নির্মাণ করেছে, অথচ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সবকিছু নষ্ট হচ্ছে।
পার্কটির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে স্থানীয় উপকূলীয় বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা আশিষ কুমার দে বলেন, চর কুকরি-মুকরি ইকোপার্কের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা অবগত। পার্কের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করা এবং রাইডগুলো মেরামতের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত মেরামতকাজ সম্পন্ন করে পার্কটিকে দর্শনার্থীদের উপযোগী করে তোলা হবে।

স্থানীয়রা বলেন, চর কুকরি-মুকরি ভোলার অন্যতম সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক পর্যটন এলাকা। দ্বীপটির ম্যানগ্রোভ বন, উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য প্রকৃতিপ্রেমীদের আকৃষ্ট করার সুযোগ তৈরি করেছে। পরিকল্পিতভাবে পর্যটনসুবিধা সম্প্রসারণ করা গেলে স্থানীয় ব্যবসা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ অবস্থায় ইকোপার্কটির ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় সংস্কার, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে সংস্কারের পর আবারও অবহেলায় স্থাপনাগুলো নষ্ট না হয়।
প্রায় পাঁচ কোটি টাকার এই স্থাপনাকে অব্যবস্থাপনার কারণে হারিয়ে যেতে না দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনার আওতায় ফিরিয়ে আনার দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিলে ইকোপার্কটি পুনরায় দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এতে সরকারি বিনিয়োগের সুফল নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি চর কুকরি-মুকরির পর্যটন সম্ভাবনা বিকাশের পথও সুগম হবে।
