বাঙালির প্রিয় শুঁটকিতেও মিলল ৯ ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১১:১৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে শুঁটকি মাছের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। মাছ সংরক্ষণের জনপ্রিয় পদ্ধতি হিসেবে দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলে শুঁটকি উৎপাদন ও বাজারজাত করা হয়। তবে এই পরিচিত খাবারেই মিলেছে উদ্বেগজনক দূষণের চিত্র। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) একদল গবেষকের গবেষণায় শুঁটকি মাছে নয় ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। উপকূলীয় চারটি এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ছয় প্রজাতির মাছের ২৪টি নমুনার সব কটিতেই এসব প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এতে খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আজম খানের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী কাজী নুসরাত জাহান ঐশী, হাবিবুর রহমান পিয়াস, নাদিয়া ইসলাম রিয়া ও সানজিদা জুঁথি।
গবেষণার অংশ হিসেবে দেশের শুঁটকি উৎপাদনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা—কক্সবাজার, টেকনাফ, সুন্দরবনের দুবলার চর ও কুয়াকাটা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষার জন্য বেছে নেওয়া হয় লইট্টা, ছুরি, পোয়া, ফাইস্যা, হরিনা চিংড়ি ও বাগদা চিংড়ি প্রজাতির শুঁটকি। চারটি এলাকা থেকে সংগ্রহ করা মোট ২৪টি নমুনা পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করে প্রতিটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পান গবেষকেরা।
কুয়াকাটার শুঁটকিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঝুঁকি বেশি
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি রয়েছে কুয়াকাটার শুঁটকিতে। এরপরই রয়েছে কক্সবাজারের অবস্থান।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পলিমার হ্যাজার্ড ইনডেক্স অনুযায়ী, কুয়াকাটার শুঁটকিতে সূচকের মান ২ হাজার ৬৪২ দশমিক ৭। অন্যদিকে, কক্সবাজারের শুঁটকিতে এ মান ১ হাজার ৪৬১ দশমিক ১।
গবেষণায় শনাক্ত হওয়া নয় ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি) ও পলিস্টাইরিন (পিএস)। এসব প্লাস্টিকের উপস্থিতি শুঁটকি মাছের দূষণ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
যেভাবে শুঁটকিতে প্রবেশ করছে প্লাস্টিক কণা
গবেষক অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আজম খানের মতে, উপকূলীয় এলাকায় বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হওয়ার কারণে পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ বাড়ছে। দৈনন্দিন ব্যবহারের প্লাস্টিক বর্জ্যের পাশাপাশি পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও শিল্পকারখানার বর্জ্যও উপকূলীয় পরিবেশ দূষিত করছে।
তিনি জানান, প্লাস্টিক সহজে পচে বা সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয় না। দীর্ঘ সময় পরিবেশে পড়ে থেকে এগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। পরে জলজ পরিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এসব কণা মাছের শরীরে প্রবেশ করে।
শুধু সমুদ্রের পানিই নয়, মাছ শুকানোর প্রক্রিয়াতেও শুঁটকিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বাড়তে পারে বলে মনে করেন এই গবেষক। তাঁর ভাষ্য, মাছ শুকানোর কাজে ব্যবহৃত রশি, ডিপিংয়ের সময় ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ এবং মাছ ধরার জালে থাকা প্লাস্টিক থেকেও দূষণ ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া মাছ ধরার সময় ছিঁড়ে যাওয়া জাল উপকূলীয় এলাকায় পড়ে থাকলেও তা পরিবেশদূষণের কারণ হতে পারে। পাশাপাশি শুঁটকি সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে প্লাস্টিকের ব্যবহারও এ দূষণ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
দূষণ কমাতে সচেতনতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জোর
মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ থেকে পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আজম খান। তাঁর মতে, প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে উপকূলীয় পানি ও জলাশয়ে যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা জরুরি।
এ জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গবেষণায় শুঁটকির নমুনাগুলোতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিশ্চিত হলেও মানুষের স্বাস্থ্যে এর নির্দিষ্ট প্রভাব কী, তা এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
তবে গবেষণার এই ফলাফল খাদ্যশৃঙ্খলে প্লাস্টিক দূষণের বিস্তার নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষা, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ উৎপাদনপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা না গেলে দেশের পরিচিত খাদ্যপণ্য শুঁটকিও দূষণের ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকবে না।
