স্বাস্থ্যসেবায় এআই প্রযুক্তি
অসুস্থ হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্তে সক্ষম লাইভফরওয়েল
সেবিকা দেবনাথ, হংকং থেকে
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:১৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বিশ্ব জুড়ে বাড়ছে ডায়বেটিস, হৃদরোগ, ক্যান্সার, উচ্চরক্তচাপ, কিডনিবিকলসহ অসংক্রামক রোগের বোঝা। গবেষণায় দেখা গেছে, হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগ বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর ৭৪ শতাংশের জন্য দায়ী। আর উদ্বেগের বিষয় হলো- অসংক্রামক রোগে ভুগলেও আক্রান্তদের অধিকাংশই জানতে পারেন না যে, তারা এসব রোগে ভুগছে। বিভিন্ন গবেষণা ও তথ্য উপাত্ত এমনটাই বলছে।
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন -এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৫ কোটি ২০ লাখ (২৫২ মিলিয়ন) মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছেন অথচ তারা নিজেরাও জানেন না যে তাদের শরীরে এই রোগটি রয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ বা ৪ জনে প্রায় ২জনই জানেন না তারা ডায়বেটিসে আক্রান্ত। আর অক্সফোর্ড পপুলেশন হেলথের এক গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত প্রায় ৫৯ শতাংশ মানুষই জানেন না যে তাদের এই রোগ রয়েছে। অথচ স্ট্রোক, হৃদরোগ এবং অকালমৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ উচ্চ রক্তচাপ।
এদিকে হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর এক বৈশ্বিক গবেষণার তথ্য বলছে, বিশ্বজুড়ে গড়ে প্রতি ৩ জন ক্যান্সার রোগীর মধ্যে ১ জন রোগটি শনাক্ত না হয়েই মারা যান। গবেষণায় বলা হয়, বর্তমান বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি ৬ লাখ মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। এই পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে ধারণা করা হয় যে, প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ মানুষ প্রতি বছর এমন আছেন যারা ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও তা জানতে পারছেন না বা মৃত্যুর আগে তাদের রোগটি ধরা পড়ছে না।
এদিকে পিছিয়ে নেই কিডনি বিকলের মত রোগও। বিশ্বজুড়ে ক্রমাগত বেড়ে চলছে কিডনি রোগ। উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশে কিডনি রোগের হার সবচেয়ে বেশি। তথ্য বলছে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ শুধু দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। এই সংখ্যা ডায়াবেটিস রোগীদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ এবং ক্যান্সার রোগীদের চেয়ে প্রায় ২০ গুণ। কিন্তু আক্রান্তদের অধিকাংশই আক্রান্ত হওয়ার পরও তা জানতে পারেন না। তবে সচেতন হলে এবং স্বাস্থ্য সম্মত জীবনযাপন করলে ৬০ থেকে ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে এই মরণঘাতী কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এ কারণেই এসব রোগকে বলা হয় ‘নিরব মহামারী’। অথচ এসব রোগের ঝুঁকি কাদের আছে তা আগে থেকে জানা গেলে, প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে সেসব রোগ হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। কথায় আছে ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম।’-একে মাথায় রেখেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে অসুস্থ হওয়ার আগেই মানুষের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। এক দশকের বেশি আগে থেকেই তা সম্ভব হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে কোন নমুনা নেয়ার প্রয়োজন হবে না।
এক গবেষণায় বলা হয়, মানুষের চিকিৎসার ইতিহাস ও স্বাস্থ্য তথ্যে থাকা ধরন বিশ্লেষণ করে এক হাজারের বেশি রোগের ঝুঁকি নিরূপণ করতে সক্ষম হয়েছে এই এআই প্রযুক্তি। গবেষকেরা বলছেন, এটি অনেকটা আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো। যেমন বলা হয়, বৃষ্টির সম্ভাবনা ৭০ শতাংশ, তেমনি স্বাস্থ্যঝুঁকিও আশঙ্কার ভিত্তিতে জানাতে পারবে এআই।
গবেষকেরা মনে করছেন, ঝুঁকিপূর্ণ রোগীকে আগেভাগে শনাক্ত করতে পারলে চিকিৎসকেরা দ্রুত প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিতে পারবেন। এতে জটিল রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোও বুঝে নিতে পারবে তাদের এলাকায় ভবিষ্যতে কী ধরনের চিকিৎসাসেবার চাহিদা তৈরি হতে পারে।
হংকংয়ে এই কাজটিই করছে লাইভফরওয়েল। লাইভফরওয়েল হলো হংকং-ভিত্তিক এআই চালিত ও ডেটা-নির্ভর প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং ফিটনেস প্ল্যাটফর্ম। ৮০টির বেশি রোগের ঝুঁকি নির্নয়ে সক্ষম এই উদ্ভাবনী স্বাস্থ্য প্রযুক্তি সংস্থা। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি তাদের উদ্ভাবিত অ্যাপসের উদ্বোধন করে। এখন পর্যন্ত ৪০টিরও বেশি দেশে তাদের এই অ্যাপসে নিবন্ধন করেছে প্রায় ৩ লাখ (২ লাখ ৯০ হাজার)। তাদের মধ্যে এই অ্যাপস ব্যবহার করে সেবা নিয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যা যেমন আছে তেমনি আছে নতুন নিবন্ধনকারীও।
নিজেদের কার্যক্রম সরেজমিন দেখার জন্য বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সদস্যদের আমন্ত্রণ জানায় উদ্ভাবনী স্বাস্থ্য প্রযুক্তি সংস্থা লাইভফরওয়েল। সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ফোরামের ৩৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গত ২৮ অক্টোবর হংকংয়ে প্রতিষ্ঠানটির ইন্টেলিজেন্ট হেলথ অ্যাসেসমেন্ট সেন্টার পরিদর্শন করে। এসময় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা প্রতিটি স্বাস্থ্য পরীক্ষার যন্ত্রের কার্যকারিতা, পরিচালনাপদ্ধতি এবং স্বাস্থ্য মূল্যায়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। ফোরামের সদস্যরা নিজেরাও এসব প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অংশ নেন। এছাড়া বিএইচআরএফ-এর প্রতিনিধি দলের সদস্যদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময়ের সময় প্রতিষ্ঠানটির উপস্থাপনায় উঠে আসে, তাদের উদ্ভাবিত পদ্ধতির মাধ্যেমে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং এই স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিতে হংকংয়ের অগ্রগতির বিস্তারিত তথ্য। পাশাপাশি বিভিন্ন বাজারে এসব সেবার প্রয়োগ এবং সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র।
প্রতিষ্ঠানের উপস্থাপনায়, ৭টি এআইভিত্তিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার যন্ত্র এবং নিজস্বভাবে তৈরি স্বাস্থ্যসেবাবিষয়ক ভাষা মডেল, মেডিকেল এলএলএম ফর হেলথকেয়ার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এবং বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে কীভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করা সম্ভব, তা তুলে ধরা হয়।
স্বাস্থ্য মূল্যায়নের নির্ভুলতা, সেবার খরচ এবং সেবা দানের পদ্ধতিসহ প্রতিনিধি দলের সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন লাইভফরওয়েল-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা মিরান্ডা ওং এবং ই-সেন্স ইনোভেশন এন্ড টেকনোলজি লিঃ-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. রাসেল চ্যান।
রাসেল চ্যান ইলেকট্রিক্যাল ইমপিড্যান্স টমোগ্রাফি প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্য পরীক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত করেন। ড. রাসেল চ্যান ‘ইলেকট্রিক্যাল ইম্পিডেন্স টোমোগ্রাফি’ (ইআইটি) স্ক্যানিং প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও নানা ইতিবাচক দিক তুলে ধরেন। এ সময় তিনি তাদের চিকিৎসাকেন্দ্রে এআই প্রযুক্তির সাহায্যে ৫৫টি রোগ নির্ণয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে রক্ত, প্রস্রাব, মল, কফ, শরীরের কোষ, হাড়ের মজ্জা, বীর্য, লালা এবং সোয়াবসহ বিভিন্ন নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

মিরান্ডা ওং তার বক্তব্যে হংকংয়ের নাগরিকদের ফিটনেস সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা যেমন- সুস্পষ্ট নির্দেশনার অভাব এবং সম্পদের অপ্রতুলতা কথা তুলে ধরেন। মিরান্ডা ওং বলেন, লাইভফরওয়েল জনসাধারণকে ‘প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা’র ধারণাটি চর্চা করতে উৎসাহিত করে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। তিনি জানান, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের তথ্য একীভূত করে বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যক্তির স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন ও ব্যক্তিভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করাই এ প্রযুক্তির উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, শুধু একটি পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে একজন ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়।
এক প্রশ্নের উত্তরে মিরান্ডা ওং বলেন, নতুন কোনো দেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণের আগে সেখানকার মানুষের আয়, বাস্তব চাহিদা ও স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। এরপর সম্ভাব্য অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করে উপযুক্ত সেবা, মূল্য নির্ধারণ ও সহযোগিতার মডেল তৈরি করতে হয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, হেলথ রিপোর্টর্স ফোরামের প্রতিনিধি দলের সদস্যদের সঙ্গে এই মতবিনিময় বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বজায় রাখার একটি সূচনা হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের প্রয়োজন সম্পর্কে আরো ভালোভাবে জানার পাশাপাশি ভবিষ্যতে অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার চাহিদা ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে তারা কাজ করছে। পাশাপাশি মেডিএলএলএমের গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে এশীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যগত বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়- এমন একটি স্বাস্থ্য তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে তথ্যের সুশাসন, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধান অনুসরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রসঙ্গত; প্রতিষ্ঠানটির দাবি, লাইভফরওয়েল হলো হংকংভিত্তিক এশিয়ার প্রথম ডিজিটাল হেলথ ইকোসিস্টেম, যা প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, এআই এবং আচরণগত উৎসাহের সমন্বয়ে গঠিত। আন্তর্জাতিক মেডিকেল-গ্রেডের ডিভাইস এবং এআই মোশন ক্যাপচার প্রযুক্তির মাধ্যমে এটি শারীরিক অবস্থার মূল্যায়ন ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমাধান দিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির ফ্ল্যাগশিপ সেবা ‘ভিআইভি পাস’ ২৪/৭ স্বাস্থ্য মনিটরিং, এক্সারসাইজ প্রেসক্রিপশন ও ফুড সাপ্লিমেন্টের বিষয়েও পরামর্শ দেয়। এছাড়া ‘সুইট পয়েন্ট’ ও ‘ওয়েলসপ’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সুস্থ জীবনযাত্রার চর্চাকে পয়েন্ট ও পুরস্কারে রূপান্তর করে ‘মোভ টু আর্ন’ ধারণাকে বাস্তবায়নও করছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রযুক্তি কতটা সুফল বয়ে আনতে পারে এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যসেবায় এআইয়ের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে শুধু প্রযুক্তি নয়, চিকিৎসাব্যবস্থার কাঠামো ও অর্থায়ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। তারা বলছেন, এআইয়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করা গেলেও সেই তথ্যের ভিত্তিতে সময়মতো চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রযুক্তির সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
