আসছে ৬ শৈত্যপ্রবাহ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৪২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
এবারের শীত মৌসুমে দেশে ৪ থেকে ৬টি মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে ২ থেকে ৩টি শৈত্যপ্রবাহ তীব্র আকার ধারণ করার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। ফলে এবারের শীত কিছুটা উষ্ণ হতে পারে বলে ধারণা করছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
চলতি নভেম্বর থেকে আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসের দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। পূর্বাভাসে শৈত্যপ্রবাহের পাশাপাশি কুয়াশা, বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ ও ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে দেশে এক থেকে দুটি মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, রংপুর এবং খুলনা বিভাগের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে আসতে পারে।
অন্যদিকে, জানুয়ারিতে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় এক বা দুটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। তখন তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসতে পারে।
শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা সম্পর্কে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বাসসকে বলেন, সাধারণত ডিসেম্বর মাসে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। তবে জানুয়ারিতে মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি জানান, নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত শেষরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং নদ-নদীর অববাহিকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। অন্যান্য এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঘন কুয়াশার কারণে দিন ও রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান কমে আসতে পারে। এতে শীতের অনুভূতি বাড়বে। তবে সামগ্রিকভাবে এ তিন মাসে দিন ও রাতের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে।
এর ব্যাখ্যায় ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এল নিনো সক্রিয় থাকা এবং বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় গড় তাপমাত্রা কিছুটা বেশি থাকতে পারে। এ কারণে এবারের শীত মৌসুমে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মাঝেমধ্যে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিলেও অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহের দিনসংখ্যা, ব্যাপ্তি ও স্থায়িত্ব তুলনামূলক কম থাকতে পারে। এ কারণে সামগ্রিকভাবে এবারের শীত কিছুটা উষ্ণ হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে এল নিনোর প্রভাবে শৈত্যপ্রবাহের সংখ্যা ও স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাই এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
লঘুচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা
শীতের পূর্বাভাসের পাশাপাশি আগামী তিন মাসে বঙ্গোপসাগরে ২ থেকে ৪টি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এর মধ্যে এক থেকে দুটি লঘুচাপ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে।
এ বিষয়ে ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, অক্টোবর ও নভেম্বর মাস সাধারণত ঘূর্ণিঝড়প্রবণ। প্রতিবছর এ সময় বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেগুলো শক্তি সঞ্চয় করে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়।
তিনি বলেন, এ সময় সূর্যের দক্ষিণায়নের কারণে দিনের দৈর্ঘ্য কমে এবং রাতের দৈর্ঘ্য বাড়ে। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগর এলাকায় সূর্যের আলোর প্রাপ্যতা বেশি থাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে প্রতিবছর একইভাবে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয় না। এ কারণে এগুলোকে ক্ষণস্থায়ী বা ট্রানজিয়েন্ট সিস্টেম বলা হয়।
বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হতে পারে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে নভেম্বরে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে, ৩৫ থেকে ৪০ মিলিমিটার। বরিশাল বিভাগে ৩০ থেকে ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে।
এ ছাড়া ঢাকা, সিলেট ও খুলনা বিভাগে ১৫ থেকে ২৫ মিলিমিটার, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার এবং রংপুর বিভাগে ৪ থেকে ৮ মিলিমিটার বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আরও কমে আসতে পারে। ডিসেম্বরে ঢাকা বিভাগে ৮ থেকে ১০ মিলিমিটার এবং সিলেট বিভাগে ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে। জানুয়ারিতে খুলনা বিভাগে ১০ থেকে ১৪ মিলিমিটার এবং ঢাকা বিভাগসহ অন্যান্য এলাকায় ৬ থেকে ১০ মিলিমিটার বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বিভিন্ন আবহাওয়াগত উপাত্ত, ঊর্ধ্বাকাশের আবহাওয়ার বিন্যাস, জলবায়ু মডেল এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা অনুমোদিত আন্তর্জাতিক কেন্দ্রগুলোর পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে এই দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে এল নিনো ও লা নিনা পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে ড. মল্লিক বলেন, ১৯৪৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, এ সময় গড়ে এক থেকে তিনটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়। এর কোনো কোনোটি শক্তি সঞ্চয় করে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। দীর্ঘ সময়ের তথ্য ও গড় পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেই এ ধরনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়।
তবে দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে অনিশ্চয়তার মাত্রা বেশি থাকে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসের পাশাপাশি নিয়মিত দৈনন্দিন আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন এই আবহাওয়াবিদ।
শৈত্যপ্রবাহের মাত্রা যেভাবে নির্ধারণ হয়
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কোনো এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। তাপমাত্রা ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামলে তা মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এ ছাড়া তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ এবং ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়।
