×

রাজশাহী

সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের কারাগারে শত বাংলাদেশি

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০৭:২৯ পিএম

সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের কারাগারে শত বাংলাদেশি

ছবি : সংগৃহীত

উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী জেলায় মানবপাচার চক্রের তৎপরতা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। চাকরি, উচ্চ বেতন কিংবা বিদেশে উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের সীমান্ত পার করানো হচ্ছে। কিন্তু সেই স্বপ্নের যাত্রা অনেকের জন্য শেষ হচ্ছে ভারতের কারাগার বা ডিটেনশন ক্যাম্পে।

সম্প্রতি ১৭ মাস কারাভোগ শেষে দেশে ফেরা ৩৬ বাংলাদেশির ঘটনা আবারও সামনে এনেছে মানবপাচার চক্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, তাদের কৌশল এবং সীমান্ত এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতা।

উত্তরাঞ্চলজুড়ে সক্রিয় পাচার চক্র

সংশ্লিষ্ট সূত্র, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন মামলার তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া, নওগাঁ, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা ও নাটোরসহ উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলা মানবপাচারকারীদের অন্যতম টার্গেট এলাকায় পরিণত হয়েছে।

মানবপাচারকারীরা সাধারণত স্থানীয় পরিচিত ব্যক্তি বা দালালের মাধ্যমে বেকার যুবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। প্রথমে বিদেশে চাকরি, বেশি বেতন কিংবা উন্নত ভবিষ্যতের প্রলোভন দেখানো হয়। এরপর ধাপে ধাপে তাদের সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।

রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পার করানোর পর ভারতীয় সহযোগীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে বাস কিংবা ট্রেনে করে তাদের চেন্নাই, কেরালা, কর্ণাটক, দিল্লি ও হরিয়ানাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়।

ভুটানের চাকরির প্রলোভন, শেষ ঠিকানা চেন্নাই

বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার আতিকুল ইসলাম জানান, তাকে ভুটানে চাকরির আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। এজন্য প্রায় ২৪ হাজার টাকা দালালদের হাতে তুলে দেন তিনি।

তার ভাষ্য, সীমান্ত পার হওয়ার পর কয়েকদিন বিভিন্ন স্থানে ঘোরানোর পর তাকে চেন্নাইয়ে নেওয়া হয়। তখনই তিনি বুঝতে পারেন যে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

আতিকুল বলেন, কারাগারে মামলার বিচার শেষ হতে কয়েক মাস সময় লাগে। সাজা শেষ হওয়ার পরও তাকে দীর্ঘদিন ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকতে হয়েছে।

১৭ মাসের দুঃসহ অভিজ্ঞতা

নন্দীগ্রামের আরেক যুবক আব্দুল মোমিন ভাগ্য বদলের আশায় ১০ হাজার টাকা দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে গিয়েছিলেন। কয়েক বছর কাজ করার পর এক অভিযানে ভারতীয় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন।

তিনি বলেন, যদি আগে জানতাম এমন পরিস্থিতি হবে, তাহলে কখনোই অবৈধভাবে সীমান্ত পার হতাম না।

দেশে ফিরে এখন তিনি অন্যদের সতর্ক করছেন। তার মতে, বিদেশে যেতে হলে অবশ্যই বৈধ পথ অনুসরণ করা উচিত।

কারাগারে শত শত বাংলাদেশি

ভারত থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের বর্ণনায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য।

ভুক্তভোগী রানা আহমেদ জানান, চেন্নাইয়ের কারাগার ও ডিটেনশন ক্যাম্পে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি আটক রয়েছেন। কেউ দুই বছর, কেউ আবার পাঁচ বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে সেখানে অবস্থান করছেন।

তার দাবি, ভাষাগত সমস্যার কারণে অনেকেই নিজেদের পক্ষে আইনি সহায়তা গ্রহণ বা সমস্যার কথা সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারেন না।

ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হওয়ায় বিভিন্ন রাজ্যে আটক বাংলাদেশিদের পরিচয় যাচাই ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চলছে।

কেন টার্গেট হচ্ছে গ্রামীণ জনপদ

বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার কহুলী, কাথম, ভাটগ্রাম, টেকরি, সিংড়াপাড়া ও দোহারসহ কয়েকটি এলাকায় অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে সেখান থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যুবক অবৈধভাবে ভারতে গেছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কিছু দালাল বিদেশে কাজের ব্যবস্থা করার কথা বলে যুবকদের সংগ্রহ করছে। তাদের অনেকেই এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস না করে বিভিন্ন সময় গোপনে আসা-যাওয়া করে।

মানবাধিকারকর্মী আবেদ হোসেন বলেন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং দ্রুত আয় করার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা সহজেই তরুণদের প্রভাবিত করছে।

সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত রুট

মানবপাচারের জন্য দিনাজপুরের হিলি, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, যশোরের বেনাপোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

হিলি সীমান্তে কুশ বর্মন, মিজানুর রহমান ও গৌতম মণ্ডলের নাম বিভিন্ন অভিযোগে উঠে এসেছে। একইভাবে হালুয়াঘাট সীমান্তকেন্দ্রিক চক্রের সঙ্গেও কয়েকজনের নাম যুক্ত রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

অন্যদিকে বেনাপোল সীমান্তের পুটখালী, গাতিপাড়া ও দৌলতপুর এলাকায় একাধিক দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে মানবাধিকার সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য থেকে জানা যায়।

স্থানীয় সংস্থা জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার এবং রাইটস যশোরের তথ্য অনুযায়ী, বেনাপোল সীমান্ত এলাকায় অন্তত এক ডজন ছোট-বড় দালাল চক্র কাজ করছে।

প্রশাসনের নজরদারি

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা হলেও পাচারকারীরা রুট পরিবর্তন করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

জয়পুরহাটের পুলিশ সুপার শাহনাজ বেগম বলেন, মানবপাচার সংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়া গেলে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ না করায় প্রকৃত তথ্য উদঘাটন কঠিন হয়ে পড়ে।

দিনাজপুরের পুলিশ সুপার জিদান আল মুসা জানান, জেলার কিছু সীমান্ত এলাকা এখনো কাঁটাতারবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ। এসব এলাকা পাচারকারীরা ব্যবহার করার চেষ্টা করে। তবে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে।

বিজিবির সতর্কতা

বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, হিলি, পাঁচবিবি, সাপাহার, পোরশা, পত্নীতলা ও ধামইরহাট সীমান্তের কিছু অংশ মানবপাচারকারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত।

জয়পুরহাট ২০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ লতিফুল বারী জানান, তাদের দায়িত্বাধীন প্রায় ৪১ কিলোমিটার সীমান্তের একটি বড় অংশ এখনো কাঁটাতারবিহীন। এসব এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

পাঁচ বছরে শত শত মামলা

পুলিশের মানবপাচার তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে ৬০৫টি মানবপাচার মামলা নিবন্ধিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮৬টির তদন্ত বা নিষ্পত্তিমূলক অগ্রগতি হয়েছে।

তার মতে, পাচারকারীরা এখন সরাসরি বিদেশে পাঠানোর কথা না বলে ভারত, নেপাল বা ভুটানে কাজের সুযোগের কথা বলে মানুষকে প্রলুব্ধ করছে।

সচেতনতার ওপর জোর

অভিবাসন ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর মতে, শুধু সীমান্ত পাহারা দিয়ে মানবপাচার বন্ধ করা সম্ভব নয়।

তাদের মতে, গ্রাম পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, বৈধ অভিবাসন সম্পর্কে তথ্য প্রদান, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং দালাল চক্রের আর্থিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে এ সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব।

দেশে ফিরে আসা ভুক্তভোগীদের একটাই বার্তা- অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার প্রলোভনে পা না দিয়ে বৈধ উপায়ে অভিবাসনের পথ বেছে নেওয়া।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

জুলাইয়ের মধ্যে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সুখবর আসতে পারে

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী জুলাইয়ের মধ্যে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সুখবর আসতে পারে

পেনশন ভোগান্তি কমাতে ডিজিটাল সেবা চালু হচ্ছে

পেনশন ভোগান্তি কমাতে ডিজিটাল সেবা চালু হচ্ছে

হাসিনার পতনের পর প্রথমবার ভারত থেকে আসছে ট্রেনের কোচ

হাসিনার পতনের পর প্রথমবার ভারত থেকে আসছে ট্রেনের কোচ

বাঞ্ছারামপুরে সড়ক, গ্রন্থাগার ও ফটো ফ্রেম উদ্বোধন

বাঞ্ছারামপুরে সড়ক, গ্রন্থাগার ও ফটো ফ্রেম উদ্বোধন

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App