মাদক-জুয়া সিন্ডিকেটের ‘নগ্ন থাবা’, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে শিক্ষক
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
মাদক, অনলাইন জুয়া ও বাল্যবিয়ের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে হামলার শিকার হয়েছেন লালমনিরহাটের আদিতমারীর শিক্ষক আরিফুল ইসলাম (৩৫)। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে তিনি গত ৯ দিন ধরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। এখনো তার জ্ঞান ফেরেনি। চিকিৎসকরাও তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে আশাবাদী হতে পারছেন না।
আরিফুল ইসলাম লালমনিরহাট সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক। তিনি আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী গন্ধমরুয়া এলাকার বাসিন্দা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা সামাজিক আন্দোলন ‘আলোকিত লালমনিরহাট’-এর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন আরিফুল। নিজের এলাকায় মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করতেন তিনি। একই সঙ্গে বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন জুয়া ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন যুবককে এসব কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসার জন্য সতর্ক করেছিলেন আরিফুল। তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি অন্যথায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছিলেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গাপুরের গন্ধমরুয়া গ্রামের মৃত আনোয়ার হোসেনের ছেলে রহিদুল ইসলাম ও তার সহযোগীদের সঙ্গে বিরোধের জেরেই আরিফুলের ওপর হামলা হয়। তাদের দাবি, সমাজের ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আরিফুলের অবস্থানই হামলার অন্যতম কারণ।
গত ১ আগস্ট কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে আগে থেকেই ওত পেতে থাকা একদল ব্যক্তি আরিফুলের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে স্থানীয়রা জানান, রহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মাথায় এলোপাতাড়ি কোপায়। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে লালমনিরহাটে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়।
দীর্ঘদিন ধরে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আরিফুলের অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। এরই মধ্যে পরিবারের ওপর নেমে এসেছে আরও এক আবেগঘন পরিস্থিতি।
গত বৃহস্পতিবার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আরিফুলের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। সন্তানের জন্মের আনন্দের মধ্যেও পরিবারে বিরাজ করছে গভীর উৎকণ্ঠা। একদিকে আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন বাবা, অন্যদিকে মায়ের কোলে নবজাতক। সন্তানটি এখনো বাবার মুখ দেখার সুযোগ পাবে কি না, তা নিয়েই শঙ্কায় পরিবার।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, রহিদুল ও তার সহযোগীদের পরিচালিত মাদক ও অনলাইন জুয়ার কর্মকাণ্ডে এলাকার অনেক তরুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কেউ সর্বস্ব হারিয়েছেন, আবার কেউ ঘরবাড়ি ছেড়েছেন। তাদের ভয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। আরিফুল প্রতিবাদ করায় তাকে হামলার শিকার হতে হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
এ ঘটনায় গত ২ আগস্ট আরিফুলের বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক বাদী হয়ে আদিতমারী থানায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। পরিবারের অভিযোগ, মামলার প্রধান আসামি রহিদুল ইসলাম এখনো পলাতক। অন্য আসামিরা আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য পরিবারকে হুমকি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। এতে নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
ছেলের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘আমার ছেলে সমাজকে ভালো করার চেষ্টা করেছিল, তার এই শাস্তি কেন? আমরা এখন আসামিদের ভয়ে তটস্থ। আমি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ও ন্যায়বিচার চাই।’
এ বিষয়ে আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব (সজীব) বলেন, মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রধান অভিযুক্ত রহিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আসামিদের হুমকির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং পরিবারকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি।
