‘সরকারের কাছে চাইলাম সার, খাওয়াইলো জেলের ভাত’
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২১ এএম
ছবি : সংগৃহীত
‘আমি শুধু আমার জমির জন্য সার চাইতে গিয়েছিলাম। হট্টগোলও করিনি, কাউকে মারিনি। কিন্তু আমার নামে মামলা হলো। পুলিশ ধরল। জীবনে থানা-পুলিশ, জেলখানা দেখিনি। সেই জেলও খাটলাম আট দিন। সরকারের কাছে চাইলাম সার, আর সরকার খাওয়াল জেলের ভাত। এই ছিল কি কৃষকের কপালে?’
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার গনাইরকুটি গ্রামের কৃষক আল-আমিন মোল্লা (৪৭) এভাবেই নিজের ক্ষোভের কথা জানান। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় তিনি আট দিন কারাগারে ছিলেন।
সম্প্রতি কুড়িগ্রামে সার সংকটের পাশাপাশি সার মজুত ও বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। সার না পেয়ে কৃষকরা বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। এসব ঘটনায় প্রশাসনের সঙ্গে কৃষকদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। পরে সারের দাবিতে আন্দোলন ও সংঘর্ষের ঘটনায় কৃষকদের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভূরুঙ্গামারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা।
আল-আমিন মোল্লার অভিযোগ, কৃষকদের হয়রানি করতেই তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
তার স্ত্রী রওশান আরা বেগম জানান, স্বামীকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে তাকে প্রায় ২০ হাজার টাকা ঋণ করতে হয়েছে। বর্তমানে তাদের দেড় বিঘা জমিতে আমন ধান রয়েছে। এর মধ্যে মামলার হাজিরা ও আদালতের খরচ নিয়ে পরিবারটি আর্থিক সংকটে পড়েছে।
একই মামলায় আট দিন কারাভোগ করেছেন কৃষক সুরুজ মিয়া (৪০)। তিনি বলেন, ‘আমি সার নিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু মারামারি বা গণ্ডগোলের সময় সেখানে ছিলাম না। সারও পাইনি। উল্টো পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে গেছে। আট দিন জেল খেটে বের হয়েছি। আমি গরিব মানুষ। জামিন নিতে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এখন মামলার হাজিরা দিতে যাওয়ার টাকা কোথায় পাব? আমরা এই হয়রানি থেকে রেহাই চাই।’
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, গত ৭ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টার দিকে ভূরুঙ্গামারীর বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়নের শহীদ মোড় এলাকায় বিএডিসি সার ডিলার আমজাদ হোসেনের মেসার্স আফি সার ঘরে সার বিতরণের সময় হট্টগোল হয়।
এ সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল জব্বারকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে। ওই রাতেই তিনি বাদী হয়ে ভূরুঙ্গামারী থানায় মামলা করেন। মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়।
মামলার পর ওই রাতেই গনাইরকুটি গ্রামের সুলতান মিয়া, সুরুজ মিয়া ও আল-আমিনকে আটক করে পুলিশ। পরে সুলতান মিয়াকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সুরুজ মিয়া ও আল-আমিনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ৮ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রাম আদালতে পাঠানো হয়। আদালত তাদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠান।
কৃষকদের অভিযোগ, তারা সার চাইতে গিয়ে মামলার আসামি হয়েছেন।
তবে কৃষি কর্মকর্তা আবদুল জব্বারের দাবি, তাকে অবরুদ্ধ করে মারধরের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের কয়েকজন অবশ্য মামলাটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
আতঙ্কে কৃষক পরিবার
মামলার পর গনাইরকুটি গ্রামের অনেক কৃষক আতঙ্কে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কৃষক বলেন, মামলা হওয়ার পর অনেকে বাড়িতে থাকছেন না। অজ্ঞাতপরিচয় আসামি থাকায় রাতে পুরো গ্রাম প্রায় পুরুষশূন্য হয়ে পড়ছে।
বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়নের গনাইরকুটি মধ্যপাড়া গ্রামের শিউলি বেগম (৩৪) জানান, মামলায় তার স্বামী সুলতান মোল্লার নাম আসার পর থেকে তিনি বাড়িতে থাকছেন না। তাদের দেড় বিঘা জমিতে আমন ধান এবং এক বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করা হয়েছে। কিন্তু স্বামী বাড়িতে না থাকায় এবং মামলার আতঙ্কে তিনি ঠিকমতো কৃষিকাজ করতে পারছেন না।
শিউলি বেগম বলেন, ‘আদালতের খরচ চালানোর মতো টাকা নেই। তাই আমরা আগাম জামিনের ব্যবস্থাও করতে পারছি না।’
৬২ বছর বয়সী কৃষক কলিম উদ্দিন জানান, এই মামলায় তার ছোট ভাই আবদুস সালামকেও আসামি করা হয়েছে। ভয়ে তিনি এখন বাড়ির বাইরে থাকছেন।
কলিম উদ্দিন বলেন, ‘দিনে ক্ষেতে কাজ করলেও রাতে আত্মীয়ের বাড়িতে থাকি। পুলিশ প্রতি রাতেই অভিযান চালাচ্ছে।’
বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জহুরুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পর থেকে গ্রামের কৃষকরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অজ্ঞাতপরিচয় আসামি থাকায় অনেকেই রাতে বাড়িতে থাকছেন না।
একই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শাহজাহান আলী মোল্লার ভাষ্য, ‘কৃষকদের বিরুদ্ধে এই মামলা হয়রানিমূলক। আমরা দ্রুত মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানাই।’
কৃষি কর্মকর্তা বদলি, তদন্ত চলছে
এদিকে মামলা হওয়ার পর মামলার বাদী ভূরুঙ্গামারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল জব্বারকে বদলি করেছে কৃষি বিভাগ।
এর আগে তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, সার বিতরণের সময় বিক্ষোভের একপর্যায়ে তাকে ও অন্য কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে মারধর করা হয়। এ ঘটনায়ই তিনি মামলা করেছেন।
ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিম উদ্দিন বলেন, মামলার পর ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের কাজ চলছে। নিরপরাধ কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে না।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমৃত দেবনাথ বলেন, মামলাটি তদন্তাধীন। উপজেলা প্রশাসন সুষ্ঠুভাবে সার বিতরণের জন্য কাজ করছে। যারা দোষী নন, তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।
