একাত্তরের ২৫ মে
চূড়ান্ত সম্প্রচারে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র
অনামিকা রায়
প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ০৭:১৮ পিএম
একাত্তরের ২৫ মে : চূড়ান্ত সম্প্রচারে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় নাম ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। ১৯৭১ সালের দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধ শুধু রণক্ষেত্রের সশস্ত্র লড়াই ছিল না, এটি ছিল একইসঙ্গে এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও তথ্যযুদ্ধ। স্বাধিকার আদায়ের এই যুদ্ধে জনমত গঠন ও মুক্তির চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই বেতার কেন্দ্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকা বেতার কেন্দ্র দখল করে নিলে বাঙালি জাতির কণ্ঠস্বর সাময়িকভাবে স্তব্ধ হয়ে যায়। কিন্তু খুব দ্রুতই সেই নীরবতা ভেঙে নতুন শক্তিতে আবির্ভূত হয় ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। এটি হয়ে ওঠে বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, প্রতিরোধ ও সংগ্রামের প্রধান প্রচারমাধ্যম। ভারতের কলকাতা থেকে পুনর্গঠিত ও সংগঠিতভাবে সম্প্রচার শুরু করে এই বেতার কেন্দ্র। ১৯৭১ সালের ২৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত পর্যায়ের সম্প্রচার শুরু করে বেতার কেন্দ্রটি আরো সুসংগঠিত, পরিকল্পিত এবং কার্যকরভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে।
মুজিবনগর সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রচারমাধ্যম হিসেবে কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ৫৭/৮ নম্বর বাড়ি থেকে এর কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে। এখান থেকেই প্রচারিত হতো সংবাদ, দেশাত্মবোধক গান, উদ্বুদ্ধকরণ বক্তব্য এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জোগানো নানা অনুষ্ঠান। এসব অনুষ্ঠান অবরুদ্ধ বাঙালিকে শুধু তথ্যই দেয়নি বরং তাদের মনে জাগিয়ে তুলেছিল স্বাধীনতার প্রতি অদম্য প্রেরণা ও দৃঢ় বিশ্বাস। এটি হয়ে উঠেছিল একটি মানসিক শক্তির উৎস, যা সমগ্র বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে বিজয়ের পথে অগ্রসর হতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর নামে বাঙালির ওপর ইতিহাসের এক নৃশংস গণহত্যা চালায়। সেই কালরাতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বেতার কেন্দ্র দখল করে নিয়ে বাঙালির কণ্ঠরোধের চেষ্টা করা হয়। সংবাদ ও যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বাধীনতার আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী।
কিন্তু বাঙালি জাতি তখন আর থেমে থাকার জাতি নয়। সেই ভয়াবহ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির মধ্যেই বেলাল মোহাম্মদের নেতৃত্বে একদল সাহসী বেতারকর্মী, প্রযুক্তিবিদ ও মুক্তিকামী মানুষ নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে নেন। তাঁদের এই অসীম সাহস ও দেশপ্রেমের ফলেই জন্ম নেয় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শক্তিশালী প্রচারমাধ্যম। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ নামে প্রথম অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়। ঘোষক আবুল কাশেম সন্দ্বীপের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় সেই ঐতিহাসিক বাক্য—“স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি।”
এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই কার্যত বিশ্ববাসীর সামনে বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামের কণ্ঠস্বর পৌঁছে যায়। একইদিনে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা এম. এ. মান্নান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। পরবর্তীতে মেজর জিয়াউর রহমানও বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেন, যা মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক সাহস ও অনুপ্রেরণা জাগিয়ে তোলে।
কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের সম্প্রচার ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিককার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক শক্তিগুলোর একটি। এই কেন্দ্র থেকে প্রচারিত সংবাদ, ঘোষণা ও দেশাত্মবোধক বার্তা দেশের মানুষকে প্রতিরোধযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে এবং বিশ্ববাসীকেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। তবে পাকিস্তানি বাহিনী খুব দ্রুতই এই কেন্দ্রটির গুরুত্ব বুঝতে পারে। ফলে ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ পাকিস্তানি বিমান বাহিনী কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের ওপর প্রচণ্ড বোমাবর্ষণ চালায়। এতে কেন্দ্রটির কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রথম পর্যায়ের সম্প্রচার সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
এরপরও স্বাধীনতার সংগ্রামে নিয়োজিত বেতারকর্মীরা হার মানেননি। জীবনবাজি রেখে তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত ট্রান্সমিটারটি উদ্ধার করে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বাগাফা এলাকায় নিয়ে যান। এই সাহসী পদক্ষেপই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছিল। ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল বাগাফা থেকে একটি শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে পুনরায় সম্প্রচার শুরু হয়। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, অনিশ্চিত পরিবেশ এবং যুদ্ধকালীন নানা ঝুঁকির মধ্যেও বেতারকর্মীরা নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যান। এই পর্যায়ে প্রকৌশলী সৈয়দ আবদুস শাকের ক্ষতিগ্রস্ত ট্রান্সমিটারটি মেরামত করে পুনরায় সচল করেন। তাঁর দক্ষতা ও প্রচেষ্টার ফলে মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠস্বর আবারও ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হয়।
বাগাফা পর্যায়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান সম্প্রচার ছিল সীমিত সময়ের। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত আধা ঘণ্টার একটি অনুষ্ঠান এবং বিকাল ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টার অনুষ্ঠান প্রচার করা হতো। যদিও সম্প্রচারের সময় ছিল অল্প, তবু এই অনুষ্ঠানগুলো মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের কাছে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের সংবাদ, স্বাধীনতার আহ্বান, দেশাত্মবোধক গান ও অনুপ্রেরণামূলক বার্তা মানুষের মনে সাহস ও আশার সঞ্চার করত। তবে যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বেতার কেন্দ্রটিকে বারবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর নজর এড়াতে ত্রিপুরার অভ্যন্তরেই কখনো শালবাগান, কখনো বাগাফা-বিলোনিয়া ফরেস্ট হিলস রোড এলাকায় কেন্দ্রটির কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয়। প্রতিটি স্থানান্তরের মধ্যেই ছিল অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি এবং সীমাহীন কষ্ট; কিন্তু স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও দায়বদ্ধতার কাছে সেসব বাধা তুচ্ছ হয়ে যায়।
মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে হাজারও প্রতিকূলতার মধ্যেও কিন্তু বেতারের কণ্ঠ থেমে থাকেনি। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নতুন রূপে আবারও সংগঠিত হয়। বিভিন্ন প্রতিকূলতা, স্থান পরিবর্তন এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অবশেষে ১৯৭১ সালের ২৫ মে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নতুনভাবে পূর্ণাঙ্গ রূপে যাত্রা শুরু করে ভারতের কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের একটি দোতলা বাড়ি থেকে। দিনটি ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী। তাই কবির বিদ্রোহী চেতনা ও মুক্তির আহ্বানকে ধারণ করেই শুরু হয় নতুন পর্যায়ের সম্প্রচার। সেদিন বেতারের উদ্বোধনী সংগীত হিসেবে প্রচারিত হয় কালজয়ী গান—“জয় বাংলা, বাংলার জয়”। এই গান শুধু একটি সংগীত ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা, সাহস ও বিজয়ের প্রতীক। বালিগঞ্জের সেই ছোট্ট বাড়ি থেকে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ যেন যুদ্ধরত বাঙালি জাতির হৃদয়ে নতুন শক্তি সঞ্চার করত।
মুজিবনগর সরকারের তথ্য, প্রচার ও বেতার মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ধীরে ধীরে অত্যন্ত সুসংগঠিত রূপ লাভ করে। সেই সময়ে এটি কেবল একটি বেতার কেন্দ্রই ছিল না, বরং ছিল মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ফ্রন্টের প্রধান ঘাঁটি। এখান থেকেই প্রচারিত হতো যুদ্ধের সংবাদ, অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য, দেশাত্মবোধক গান, নাটক, কথিকা ও ব্যঙ্গধর্মী অনুষ্ঠান। বালিগঞ্জের সেই ছোট্ট দোতলা বাড়িটিই হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের শব্দসৈনিকদের প্রাণকেন্দ্র। সেখানে একত্রিত হয়েছিলেন দেশের খ্যাতিমান শিল্পী, সাহিত্যিক, ঘোষক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা। হাসান ইমাম, আশফাকুর রহমান খান, টি এইচ শিকদার, বেলাল মোহাম্মদ, কামাল লোহানী এবং মুস্তাফা মনোয়ারের মতো বরেণ্য ব্যক্তিত্বরা দিনরাত নিরলস পরিশ্রম করে অনুষ্ঠান প্রযোজনা ও প্রচারের কাজ চালিয়ে যেতেন।
তাঁদের কণ্ঠ, শব্দ ও সৃষ্টিশীলতাই মুক্তিযুদ্ধের সময় লাখো বাঙালির মনে সাহস জুগিয়েছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে লড়েছেন, তেমনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই শিল্পী ও বেতারকর্মীরা শব্দকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে স্বাধীনতার সংগ্রামকে আরো বেগবান করেছিলেন। ২৫ মে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের অনুরোধে ভারত সরকার মুক্তিযুদ্ধের সহায়তায় একটি ৫০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মিডিয়াম ওয়েভ ট্রান্সমিটার প্রদান করে। এই শক্তিশালী ট্রান্সমিটার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সম্প্রচারকে নতুন মাত্রা দিয়ে এর আওতা বহুগুণ বৃদ্ধি করে।
ট্রান্সমিটারটি পাওয়ার পর কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ৫৭/৮ নম্বরের একটি দ্বিতল ভবনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্টুডিও স্থাপন করা হয়। বাইরে থেকে ভবনটি ছিল সাধারণ একটি বাড়ি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সেটিই হয়ে ওঠে শব্দযোদ্ধাদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। এখান থেকেই প্রতিদিন যুদ্ধের সংবাদ, স্বাধীনতার আহ্বান, দেশাত্মবোধক গান ও অনুপ্রেরণামূলক অনুষ্ঠান প্রচারিত হতে থাকে। তবে যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এজন্য শক্তিশালী ট্রান্সমিটারটি কলকাতায় না রেখে সীমান্তবর্তী কোনো এক গোপন স্থানে স্থাপন করা হয়েছিল। পুরো ব্যবস্থাটি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো। নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রান্সমিটারের সঠিক অবস্থান এমনকি অনেক বেতারকর্মীর কাছেও গোপন রাখা হয়েছিল, যাতে পাকিস্তানি বাহিনী কোনোভাবেই সেটির সন্ধান না পায়।
এই নতুন ও শক্তিশালী ট্রান্সমিটার হাতে পাওয়ার পর ১৯৭১ সালের ২৫ মে সন্ধ্যার অধিবেশন থেকেই কলকাতা থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের তৃতীয় পর্যায়ের সম্প্রচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রচারযুদ্ধের এক নতুন অধ্যায়। আগের তুলনায় সম্প্রচার আরো স্পষ্ট, শক্তিশালী ও বিস্তৃতভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছাতে শুরু করে। পরদিন, অর্থাৎ ২৬ মে থেকে কেন্দ্রটির আনুষ্ঠানিক নাম রাখা হয় ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ (Swadhin Bangla Betar Kendra)। এই নামের মধ্য দিয়েই বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা, আত্মপরিচয় ও মুক্তির সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। পরবর্তী সময়ে এই বেতার কেন্দ্র মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে সমগ্র জাতিকে বিজয়ের পথে অনুপ্রাণিত করে।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুধু সংবাদ প্রচারের মাধ্যমই ছিল না, এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক সংগ্রামের এক শক্তিশালী দুর্গ। এখান থেকে প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলো ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়, সৃজনশীল এবং যুগান্তকারী, যা মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মনে স্বাধীনতার চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল। সে সময় আকাশবাণীর দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বজ্রকণ্ঠে প্রচারিত সংবাদ যেমন মানুষকে যুদ্ধের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিত, তেমনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নিজস্ব অনুষ্ঠানগুলোও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘চরমপত্র’, ‘জল্লাদের দরবার’ এবং ‘রণাঙ্গন ঘুরে এলাম’ এর মতো অনুষ্ঠান ছিল তুমুল জনপ্রিয়।
এর মধ্যে এম আর আখতার মুকুলের উপস্থাপনায় ব্যঙ্গাত্মক অনুষ্ঠান ‘চরমপত্র’ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। তাঁর চিরপরিচিত কণ্ঠ, তীক্ষ্ণ রসবোধ ও শাণিত ব্যঙ্গ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও সেনাবাহিনীকে বিদ্রূপ করত। একইসঙ্গে অবরুদ্ধ বাংলার মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের মনে সাহস, আত্মবিশ্বাস ও আশার সঞ্চার করত। প্রতিদিন ‘চরমপত্র’ শোনার জন্য মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত। যুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যেও এই অনুষ্ঠান বাঙালির মনে হাসির ঝলক এনে দিত, আবার শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্তিও জোগাত। একইভাবে ‘জল্লাদের দরবার’ অনুষ্ঠানটি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নির্মমতা ও স্বৈরাচারকে ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনার মাধ্যমে তুলে ধরত। অন্যদিকে ‘রণাঙ্গন ঘুরে এলাম’ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ফ্রন্টের বাস্তব চিত্র ও মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা তুলে ধরা হতো। এই অনুষ্ঠানগুলো মানুষের মনে যুদ্ধজয়ের প্রত্যয় আরো দৃঢ় করে তুলত।
সংগীতও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল। আব্দুল জব্বার, আপেল মাহমুদ এবং রথীন্দ্রনাথ রায়দের কণ্ঠে গাওয়া দেশাত্মবোধক গান মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণার উৎসে পরিণত হয়েছিল। “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি” কিংবা “তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর”-এর মতো গান শুধু সংগীত ছিল না; এগুলো ছিল মুক্তির সংগ্রামের শপথ, সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক। রণাঙ্গনে ক্লান্ত মুক্তিযোদ্ধারা এই গান শুনে নতুন উদ্যমে উজ্জীবিত হতেন, আর দেশের সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্নে হয়ে উঠতেন আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অগ্রগণ্য ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন- বেলাল মোহাম্মদ (প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্যোক্তা ও পরিকল্পনাকারী), আবুল কাশেম সন্দ্বীপ (প্রথম অনুষ্ঠান ঘোষক ও অন্যতম সংগঠক), আবদুল্লাহ আল-ফারুক, কাজী হাবিবুদ্দিন আহমেদ মনি, আমিনুর রহমান, রাশিদুল হুসাইন, এ. এম. শরফুজ্জামান, রেজাউল করিম চৌধুরী, এবং সৈয়দ আবদুস শাকের ও এম. আর. আখতার মুকুল (‘চরমপত্র’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অপরিসীম জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন)। এছাড়াও, কলকাতা পর্বে ঢাকা থেকে আসা অভিজ্ঞ বেতারকর্মী, শিল্পী ও কলাকুশলীরা কেন্দ্রটিকে পূর্ণতা দেন। এদের মধ্যে আব্দুল মান্নান এমএনএ, কল্যাণ মিত্র, রাজু আহমেদ, শহীদ আলতাফ মাহমুদ, আব্দুল আহাদ, সমর দাস, তিমির নন্দী, বুলবুল মহলানবীশ, রফিকুল আলমসহ অসংখ্য গুণী ব্যক্তি ছিলেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের এক অসাধারণ শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার ছিল ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। এটি শুধু একটি সম্প্রচার মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল বাঙালি জাতির আশা, সাহস, ঐক্য ও প্রতিরোধের প্রতীক। যুদ্ধের কঠিন বাস্তবতায় মানুষের মনে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন জাগিয়ে তুলেছিল এই বেতার কেন্দ্রটি। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সমগ্র বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধারা পেয়েছিল অসীম প্রেরণা ও মানসিক শক্তি। একই সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের মধ্যে এই বেতার কেন্দ্র আতঙ্ক ও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল, কারণ এখানে প্রচারিত প্রতিটি সংবাদ ও অনুষ্ঠান ছিল সত্য, সাহস এবং মুক্তির আহ্বানে ভরপুর।
মুজিবনগর সরকারের পক্ষে এই বেতার কেন্দ্র আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে বিশ্ববাসী বাংলাদেশের গণহত্যা, মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি এবং স্বাধীনতার ন্যায্য দাবির বাস্তব চিত্র সম্পর্কে অবহিত হতে পারতো। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন শুধু দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক সমর্থনও অর্জন করে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রতিদিন বিকেলে ও নির্দিষ্ট সময়ে লাখ লাখ মানুষ রেডিওর সামনে বসে অধীর আগ্রহে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুনতেন। এই শোনা শুধু তথ্য গ্রহণ ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল এক ধরনের মানসিক সংযোগ, যা গোটা জাতিকে এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী বন্ধনে আবদ্ধ করেছিল।
এই বেতার কেন্দ্র ছিল সত্যিকার অর্থেই মুক্তিযুদ্ধের এক আলোকবর্তিকা। এর আলোতেই অন্ধকার সময়ে মানুষ খুঁজে পেয়েছিল পথ, সাহস এবং বিজয়ের স্বপ্ন। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ বেতার’ রাখা হয়। এরপর ২২ ডিসেম্বর প্রবাসী সরকার বিজয়ী বেশে ঢাকায় ফিরে এলে, এই সম্প্রচার মাধ্যমটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রীয় বেতার হিসেবে ঢাকায় নতুন যাত্রা শুরু করে। এভাবেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গৌরবময় ইতিহাস, বিশেষ করে ২৫ মে থেকে শুরু হওয়া এর ঐতিহাসিক সম্প্রচার বাঙালি জাতির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরকাল উজ্জ্বল ও অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। একাত্তরের সেই দিনগুলোয় বালিগঞ্জের ৫৭/৮ নম্বর বাড়িটি থেকে নিঃসৃত প্রতিটি শব্দ ও সুর আমাদের স্বাধীনতার পথকে যেভাবে ত্বরান্বিত করেছিল, সেই ইতিহাস বাঙালি জাতির গৌরব, আত্মত্যাগ ও বিজয়ের প্রতীক হয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
লেখক: সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী
