কেন বাড়ছে পরকীয়া? বিশেষজ্ঞ মতামত
মাহিদুল হোসেন সানি
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
দাম্পত্য জীবনের প্রধান ভিত্তি হলো পারস্পরিক আস্থা, সম্মান, বোঝাপড়া ও নিয়মিত যোগাযোগ। এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন দূরত্ব তৈরি হলে অনেক সময় স্বামী বা স্ত্রীর জীবনে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে পরকীয়ার প্রকৃত বিস্তার নিয়ে নির্ভরযোগ্য জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যান সীমিত হলেও, বিভিন্ন গবেষণা ও বিবাহবিচ্ছেদের তথ্য বিশ্লেষণে বিষয়টি বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২২’–এর তথ্য অনুযায়ী, বিবাহবিচ্ছেদের কারণ হিসেবে জরিপে অংশ নেওয়া ২৩ শতাংশ ব্যক্তি পরকীয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। একই জরিপে ২২ শতাংশ দাম্পত্য জীবন টিকিয়ে রাখতে না পারাকে বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে জানিয়েছেন।
আরো পড়ুন: কোথায় গিয়ে থামবে জেন-জিদের আন্দোলন
দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্বের প্রভাব
পরকীয়ার পেছনে সাধারণত একটি কারণ কাজ করে না। দাম্পত্য জীবনে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, একে অপরকে সময় না দেওয়া, মানসিক দূরত্ব, অবহেলা, পারিবারিক জটিলতা এবং অর্থনৈতিক চাপ—এসব বিষয় পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশের বিবাহিত প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর করা একটি গবেষণাতেও দাম্পত্য জীবনের একঘেয়েমি, মানসিক সমর্থনের অভাব ও সম্পর্ক নিয়ে অসন্তোষকে পরকীয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে গবেষকেরা মনে করেন, বাংলাদেশে এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত ও নির্ভরযোগ্য গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কতটা দায়ী?
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের যোগাযোগকে অনেক সহজ করেছে। বহু বছর পর পুরোনো বন্ধু বা পরিচিতের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা এখন কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার। কর্মক্ষেত্র, বন্ধুত্ব কিংবা অনলাইন পরিচয়ের মাধ্যমেও নতুন মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেই পরকীয়ার প্রধান বা একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং আগে থেকেই কোনো সম্পর্কে দূরত্ব বা অসন্তোষ থাকলে অনলাইন যোগাযোগ কখনো কখনো সেই দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতেও দেখা গেছে, ডিজিটাল যোগাযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের সম্পর্ক, বিয়ে এবং পারস্পরিক যোগাযোগের ধরন বদলে দিচ্ছে। ফলে প্রযুক্তি এখানে সরাসরি কারণের চেয়ে একটি নতুন যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।
কথা কমে গেলে বাড়ে দূরত্ব
একই ছাদের নিচে থেকেও অনেক দম্পতির মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ধীরে ধীরে কমে যায়। দিনের ব্যস্ততা, কর্মজীবনের চাপ, দীর্ঘ সময় আলাদা থাকা কিংবা পারিবারিক নানা সমস্যার কারণে একে অপরের অনুভূতি ও সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলার সুযোগ কমতে থাকে। এর ফলে তৈরি হতে পারে মানসিক দূরত্ব। একজন যখন নিজের কথা বলার বা বোঝাপড়ার জায়গা খুঁজে পান না, তখন অন্য কোথাও মানসিক সমর্থন খোঁজার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় পরকীয়ার পাশাপাশি পারিবারিক বিরোধ, নির্যাতন, আসক্তি, বেকারত্ব, শ্বশুরবাড়ির হস্তক্ষেপ ও দাম্পত্য অসন্তোষের মতো কারণও উঠে এসেছে। ফলে পুরো বিষয়টিকে শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার সংকট হিসেবে দেখলে এর পেছনে থাকা অন্যান্য কারণগুলো অনালোচিত থেকে যায়।
আরো পড়ুন: নতুন পে স্কেল প্রজ্ঞাপন, সোমবার মন্ত্রিসভায় অনুমোদন উপস্থাপন
মনোবিজ্ঞান ও পরিবারবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, দাম্পত্য সম্পর্কে সমস্যা তৈরি হলে সেটিকে দীর্ঘদিন গোপন বা উপেক্ষা না করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা প্রয়োজন। একে অপরের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ তৈরি করা এবং ব্যক্তিগত সীমারেখার প্রতি সম্মান দেখানো সম্পর্ককে সুস্থ রাখতে সহায়ক হতে পারে।
গবেষণাগুলোতেও দেখা যায়, বৈবাহিক অবিশ্বস্ততার পেছনে ব্যক্তির মানসিকতা, দাম্পত্য সম্পর্কের মান, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ এবং প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ—বিভিন্ন বিষয় একসঙ্গে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই সমস্যা তৈরি হলে শুধু সামাজিকভাবে দোষারোপ না করে সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। প্রয়োজন হলে পরিবারে বিশ্বস্ত ব্যক্তির সহায়তা নেওয়া কিংবা পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সুস্পষ্ট সীমারেখা থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
