স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের জমকালো উদ্বোধন, বাইরে সংঘর্ষ
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০২:৩২ পিএম
ছবি- সংগৃহীত
একদিকে স্টেডিয়ামজুড়ে আলোর ঝলকানি ও শাকিরার সুরের মূর্ছনা, অন্যদিকে মেক্সিকোর রাজপথে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও টিয়ার গ্যাস এমনই এক চরম উত্তেজনা ও সামাজিক অস্থিরতার আবহে পর্দা উঠল ২০২৬ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের। মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের প্রথম ভেন্যু হিসেবে রেকর্ড তৃতীয়বারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপের আসর বসল।
দিবাগত রাত ১টায় স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচটি শুরুর দেড় ঘণ্টা আগে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। তবে মাঠের চোখধাঁধানো ফুটবল রোমাঞ্চের সমান্তরালে দেশটিতে চলমান বড় ধরনের সামাজিক অসন্তোষ ও সরকারবিরোধী বিক্ষোভের কারণে ৮২ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এই স্টেডিয়াম ও মেক্সিকো সিটিজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছে মেক্সিকান প্রশাসনকে।
ম্যাচটি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় দুপুর ১টায় শুরু হওয়ার কথা থাকায় সমর্থকদের আগেভাগেই মাঠে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। মেক্সিকো সিটির নাগরিক নিরাপত্তা সচিবালয় জানিয়েছে, ম্যাচ শুরুর আগে স্টেডিয়ামের বাইরে প্রায় ২০০ জন মুখোশধারী উগ্র আন্দোলনকারীর একটি দল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চড়াও হলে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ বেঁধে যায়।
পরে পুলিশ কঠোর অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ২৮ বছর বয়সী এক নারীকে আটক করা হলেও পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই বিক্ষোভ ও সহিংসতার কারণে মেক্সিকো সিটি মেট্রো কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার স্বার্থে কয়েকটি স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। এ ছাড়া শহরের একটি প্রধান ফ্যান জোনেও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটে, যা পরে পুলিশ নিয়ন্ত্রণে আনে। অবশ্য স্টেডিয়ামের বাইরে এমন উত্তেজনা চললেও সাধারণ সমর্থকেরা বড় ধরনের কোনো বিলম্ব ছাড়াই তল্লাশি পেরিয়ে গ্যালারিতে প্রবেশ করতে পেরেছেন।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের এই অস্থিরতার নেপথ্যে রয়েছে দেশটির সরকার ও জাতীয় শিক্ষক ইউনিয়নের (সিএনটিই) একটি অংশের মধ্যে চলমান দীর্ঘদিনের তীব্র বিরোধ। চলতি জুন মাসের প্রথম দুই দিনেও বিক্ষোভকারীরা প্লাস্টিকের তৈরি বিশালাকার ফুটবলারদের ভাস্কর্যে আগুন ধরিয়ে দিলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দেয়। আন্দোলনকারীদের সৃষ্টি করা ব্যাপক যানজটের কারণে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবম স্বয়ং জাতীয় প্রাসাদে পৌঁছাতে পারেননি।
এই বিরোধের মূল কারণ হলো, প্রেসিডেন্ট শেইনবমের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০০৭ সালের বিতর্কিত ‘আইএসএসএসটিই’ আইন বাতিল করা। এই আইনটির মাধ্যমে মূলত রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা থেকে শিক্ষকদের একটি ভিন্ন ও কম সুবিধাজনক কাঠামোর দিকে পরিবর্তন করা হয়েছিল। বর্তমানে সিএনটিই দেশজুড়ে টানা ১০ম দিনের মতো ধর্মঘট পালন করছে, যার ফলে দেশটির ১০ লাখের বেশি শিশুর স্কুলযাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে সংগঠনটি শিক্ষকদের শতভাগ বেতন বৃদ্ধির দাবিও জানিয়ে আসছে।
শিক্ষকদের আন্দোলনের পাশাপাশি দেশটিতে লাগামহীন মাদক সহিংসতার বিষয়ে সরকারের উদাসীনতার অভিযোগেও মেক্সিকোর সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে শামিল হয়েছেন। গত রোববারও ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা আজতেকা স্টেডিয়ামের প্রধান সড়কটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সে সময় তাদের বহন করা একটি ব্যানারে আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে উদ্দেশ্য করে লেখা ছিল—‘ফিফা, চলে যাও।’
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী দিনে এমন অচল অবস্থা ও তীব্র যানজট এড়াতে মেক্সিকো সরকার গত ৯ জুন ঘোষণা করে, ম্যাচের দিন রাজধানীর সব স্কুলের ক্লাস বন্ধ থাকবে। এর আগে গত মে মাসে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষাবর্ষ নির্ধারিত সময়ের ছয় সপ্তাহ আগেই শেষ করার একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিলেও তীব্র সমালোচনার মুখে পাঁচ দিন পরই তা বাতিল করতে বাধ্য হয়। মাঠের বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলেও মেক্সিকোর অভ্যন্তরীণ এই ক্ষোভের আগুন কাতার বিশ্বকাপের পরবর্তী এই আসরকে কতটা প্রভাবিত করে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
