×

তথ্যপ্রযুক্তি

‘নিজের কবর নিজেই খুঁড়েছি’

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৭ পিএম

‘নিজের কবর নিজেই খুঁড়েছি’

ছবি : সংগৃহীত

প্রায় ১৫ বছর ধরে কনটেন্ট রাইটিংয়ের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেছেন লিসা। কলেজ শেষ করার পর থেকেই তিনি লেখালেখিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। দীর্ঘদিন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করার পর দ্রুত সম্প্রসারিত আউটসোর্সিং শিল্পে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন।

লিসার দাবি, কাজের ক্ষেত্রে কখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের প্রয়োজন অনুভব করেননি। কিন্তু নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার মাত্র আট মাসের মাথায়, স্থায়ী নিয়োগ পাওয়ার এক মাস আগেই তাকে চাকরি হারাতে হয়। ফিলিপাইনে সাম্প্রতিক সময়ে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন আরও অনেক কর্মী।

চাকরি হারানোর আগে তার প্রতিষ্ঠান একটি জনসংযোগ সংস্থার মাধ্যমে এআই দিয়ে বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরি করাত। পরে সেই লেখাগুলো সম্পাদনার দায়িত্ব দেওয়া হয় লিসা ও তার সহকর্মীদের। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের লেখার ধরণ ও ভাষাশৈলী শেখাতে তাদের কাজ ব্যবহার করে এআইকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।

এই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে লিসা বলেন, এখন তার মনে হয়, যে প্রযুক্তিকে তারা নিজের হাতে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেটিই তাদের চাকরি কেড়ে নিয়েছে। তার ভাষায়, “মনে হচ্ছে, নিজের কবর নিজেই খুঁড়েছি। আমরা নিজেরাই এআইকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি, পরে সেটিই আমাদের জায়গা দখল করেছে।”

নিরাপত্তার কারণে ‘লিসা’ তার প্রকৃত নাম নয়। বিবিসির সঙ্গে কথা বলা আরও কয়েকজন সাবেক আউটসোর্সিং কর্মীও পরিচয় গোপন রাখতে চেয়েছেন। চাকরি ছাড়ার সময় তারা গোপনীয়তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে ক্ষতিপূরণ নিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, প্রকাশ্যে কথা বললে ভবিষ্যতে এই খাতে নতুন চাকরি পাওয়া কঠিন হতে পারে, কারণ আউটসোর্সিং শিল্পে কর্মীদের নেটওয়ার্ক তুলনামূলকভাবে ছোট।

তাদের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে- যে আউটসোর্সিং খাত লাখো মানুষকে মধ্যবিত্ত জীবনে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে, সেই খাতের কাজ যদি ধীরে ধীরে এআইয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হতে শুরু করে, তাহলে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের কী হবে?

ফিলিপাইনের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি

ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলার কিউবাও এলাকায় প্রতিদিন অফিস শেষে হাজারো কর্মী বহুতল ভবন থেকে বেরিয়ে আসেন। এসব ভবনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কল সেন্টার, হিসাবরক্ষণ, সফটওয়্যার উন্নয়ন, বিপণন কনটেন্টসহ নানা ধরনের আউটসোর্সিং কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই শিল্প ফিলিপাইনের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। ২০০০ সালের শুরুতে ইংরেজিভাষী দক্ষ জনশক্তির কারণে ভারত-নির্ভর আউটসোর্সিংয়ের বিকল্প হিসেবে ফিলিপাইনকে তুলে ধরা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকার কর-সুবিধা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমে খাতটির বিকাশে সহায়তা করে।

এর ফল হিসেবে অ্যাকসেঞ্চার, কনসেন্ট্রিক্স এবং টেলিপারফরম্যান্সের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান দেশটিতে বড় আকারের কার্যক্রম গড়ে তোলে। বর্তমানে ফিলিপাইনের আউটসোর্সিং শিল্পে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ কর্মরত এবং বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়, যা দেশটির মোট অর্থনীতির প্রায় ১০ শতাংশের সমান।

এআইয়ের ঝুঁকিতে লাখো চাকরি

বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্যান্য অনেক শিল্পের তুলনায় আউটসোর্সিং খাত এআইয়ের প্রভাবে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, ফিলিপাইনে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ মানুষ এমন পেশায় কর্মরত, যেগুলো জেনারেটিভ এআইয়ের প্রভাবে পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা।

তবে আইএলওর ধারণা, এসব চাকরির সবগুলো বিলুপ্ত হবে না; বরং অনেক ক্ষেত্রেই কাজের ধরন বদলে যাবে। কিন্তু যেহেতু ফিলিপাইনের কর্মসংস্থানের বড় অংশই সেবা খাতনির্ভর, তাই দেশটি তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

দ্রুত বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার

ফিলিপাইনের আইটি ও বিজনেস প্রসেস অ্যাসোসিয়েশন (আইবিপিএপি)-এর প্রেসিডেন্ট জ্যাক মাদ্রিদ জানিয়েছেন, দেশটির আউটসোর্সিং শিল্পে দ্রুত বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার। তার তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির সদস্য প্রতিষ্ঠানের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি ইতোমধ্যে এআই-ভিত্তিক পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু করেছে।

তার ভাষায়, বিশেষ করে এজেন্টিক এআই আরও দ্রুতগতিতে বিভিন্ন কাজ স্বয়ংক্রিয় করার সক্ষমতা রাখে। ইতোমধ্যে কিছু কাজ পুরোপুরি বা আংশিকভাবে এআইয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে।

তবে মাদ্রিদের দাবি, এআইয়ের কারণে যেসব কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের অধিকাংশকেই একই প্রতিষ্ঠানের অন্য দায়িত্বে স্থানান্তর করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, নিয়োগ কমে যাওয়ার পেছনে শুধু এআই নয়; বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং বিদেশে কাজ আউটসোর্স করার বিষয়ে কোম্পানিগুলোর অনিশ্চয়তাও ভূমিকা রাখছে।

তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কর্মীদের নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

‘কাজ কমেনি, বরং বেড়েছে’

মেরি নামের আরেক সাবেক কনটেন্ট রাইটারও এআইয়ের প্রভাবে চাকরি হারিয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে এটিও তার প্রকৃত নাম নয়।

তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠান উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে কর্মীদের এআই ব্যবহারে উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু বাস্তবে তিনি ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন।

মেরির ভাষায়, এআই তার কাজ সহজ করেনি; বরং আরও বেশি সম্পাদনা, তথ্য যাচাই এবং ভুল সংশোধনের দায়িত্ব তৈরি করেছে। কারণ, এআই তৈরি করা অনেক তথ্যই সঠিক ছিল না। ফলে প্রযুক্তিগতভাবে কাজের চাপ বরং বেড়ে যায়।

কোম্পানিগুলোর আশ্বাস

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যয় কমানো এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বিশ্বের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত এআই ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কল সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান টেলিপারফরম্যান্স জানিয়েছে, এআই কর্মীদের প্রতিস্থাপন নয়, বরং তাদের সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহৃত হবে। সহজ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো এআই করবে, আর কর্মীরা আরও জটিল দায়িত্ব পালন করবেন। এজন্য কর্মীদের নতুন করে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

অ্যাকসেঞ্চারের মতে, জেনারেটিভ এআই প্রায় সব ধরনের চাকরির ধরন বদলে দেবে, তবে চাকরি পুরোপুরি বিলুপ্ত করবে না। প্রতিষ্ঠানটি এআই প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।

অন্যদিকে, ফিলিপাইনের সবচেয়ে বড় আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান কনসেন্ট্রিক্স জানিয়েছে, তাদের এআই-ভিত্তিক কার্যক্রম মানুষের তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হবে। পাশাপাশি কর্মীদের নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে।

সূত্র: বিবিসি

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ছাত্রদল-যুবদলের হামলার ঘটনায় কড়া বিবৃতি জামায়াতের

ছাত্রদল-যুবদলের হামলার ঘটনায় কড়া বিবৃতি জামায়াতের

মোদির ভিডিও ফেসবুক থেকে মুছে ফেলায় জাকারবার্গকে ৩ দিনের আলটিমেটাম

মোদির ভিডিও ফেসবুক থেকে মুছে ফেলায় জাকারবার্গকে ৩ দিনের আলটিমেটাম

স্মরণকালের ভয়াবহ দাবদাহে পুড়ছে কোরিয়া, মৃত্যু ১৬

স্মরণকালের ভয়াবহ দাবদাহে পুড়ছে কোরিয়া, মৃত্যু ১৬

শিবিরের ‘মব সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের’ প্রতিবাদে নোয়াখালীতে ছাত্রদলের বিক্ষোভ

শিবিরের ‘মব সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের’ প্রতিবাদে নোয়াখালীতে ছাত্রদলের বিক্ষোভ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App