রক্তের অক্ষরে লেখা স্বাধীনতা: ইতিহাসের আড়ালে থাকা সূর্যসন্তানেরা
খান শোয়েব উল্লাহ আমান
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৮:০০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
চব্বিশের জুলাই-আগস্টের সেই রক্তঝরা দিনগুলোতে, যখন রাষ্ট্রযন্ত্র তার সমস্ত হিংস্রতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ছাত্র-জনতার ওপর, চারদিকে যখন বুলেটের গর্জন আর লাশের মিছিল, তখন বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কিছু মানুষ। সব রকমের সামরিক সুযোগ-সুবিধা, পেনশন, এমনকি নিজের জীবনের নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়ে কতজন প্রাক্তন অবিনাশী সৈনিক সেদিন রাজপথে নেমেছিলেন—তার কোনো নিখুঁত হিসাব আজ হয়তো রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক খাতায় নেই।
এমনই একজন বীর সাবেক সেনা সদস্য—খান শোয়েব উল্লাহ আমান। সেদিন ঢাকার উত্তাল রাজপথে তিনি যে ব্যানারটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তা আসলে কোনো সাধারণ প্রতিবাদের ভাষা ছিল না; ওটা ছিল একটা জীবন্ত 'ডেথ ওয়ারেন্ট'। স্বৈরাচারের পতন না হলে হয়তো আজ তাঁর নাম-নিশানাও মুছে যেত কোনো অন্ধকার 'আয়নাঘরে'।
সেই ব্যানারের সবচেয়ে বুক কাঁপানো দৃশ্য ছিল—সেখানে লেখা ছিল তাঁর নিষ্পাপ সন্তানদের নাম! একজন বাবা যখন নিজের সন্তানদের নাম বুকে বেঁধে, তাঁদের ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চিত অন্ধকারের মুখে ঠেলে দিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ান, তখন বুঝতে বাকি থাকে না—তিনি জীবনকে বিদায় জানিয়েই রাজপথে নেমেছিলেন। সন্তানদের এতিম হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে, দেশের কোটি সন্তানকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন এই পিতা।

মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং সেনাবাহিনীর রূপান্তর
ইতিহাস সাক্ষী, ৫ই আগস্টের আগে রাস্তায় নেমেছিল পুলিশ, বিজিবি এবং সেনাবাহিনী। পুলিশ ও র্যাবের একাংশ যখন নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছিল, তখন সেনাবাহিনীর ওপর চাপ ছিল কঠোর ক্র্যাকডাউনের। কিন্তু মোহাম্মদপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনী যখন দেখল—তাঁদেরই প্রাক্তন সহকর্মী ও দেশের সাধারণ মানুষ বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তখন তাঁদের ভেতরের দেশপ্রেম জাগ্রত হয়েছিল। তারা মূলত ফাঁকা গুলি (Blank Ammunition) ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি বুক লক্ষ্য করে ট্রিগার চাপতে অস্বীকৃতি জানান।
বলা চলে, খান শোয়েব আমানের মতো বীরদের এই আত্মঘাতী এবং আবেগঘন ব্যানারগুলোই সেদিন ব্যারাকে থাকা নিয়মিত সৈনিকদের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। নিজের চেনা সিনিয়র বা সহকর্মীকে যখন একজন সৈনিক রাজপথে মৃত্যুর মুখোমুখি দেখে, তখন বন্দুকের নল ঘুরে যায় স্বৈরাচারের দিকেই। আর এ কারণেই, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সেনাবাহিনীর হাতে রক্তের দাগ লাগেনি বললেই চলে। সাবেক সেনানিদের এই মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধই ৫ই আগস্টের চূড়ান্ত বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল।
আমরা জানি না, রাষ্ট্র আজ এই সূর্যসন্তানদের কোনো যোগ্য সম্মান দিয়েছে কি না, কিংবা কোনো খোঁজ রেখেছে কি না। ক্ষমতার চেয়ার বদলের চেনা ভিড়ে আর কোলাহলে এই নিঃস্বার্থ বীরদের আত্মত্যাগ যেন হারিয়ে না যায়।
হে বীর, রাষ্ট্র আপনাকে স্যালুট জানাক বা না জানাক, এই দেশের মাটি ও মানুষ আপনাকে চিরকাল শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে। বাংলাদেশ বারবার ধন্য হোক এমন হাজারো সূর্যসন্তানের জন্ম দিয়ে। সালাম আপনাকে, সালাম আপনার সেই অকুতোভয় সন্তানদের!
লেখক: খান শোয়েব উল্লাহ আমান, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা
