×

মুক্তচিন্তা

৪৪ সরকারি কারখানা বেসরকারি খাতে, জনগণের লাভ কতটা?

Icon

মাহফুজ খান, ভোরের কাগজ

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৯ পিএম

৪৪ সরকারি কারখানা বেসরকারি খাতে, জনগণের লাভ কতটা?

ছবি : সংগৃহীত

বছরের পর বছর লোকসান, সরকারি অর্থের ওপর চাপ আর বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা কারখানা। এবার এসব রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভাগ্য বদলাতে যাচ্ছে। ৪৪টি সরকারি কারখানা বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য খুলে দিয়েছে সরকার।

কিন্তু প্রশ্ন একটাই- এতে কি জনগণের টাকা বাঁচবে? নাকি রাষ্ট্রীয় সম্পদ থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে স্বাধীনতার পরের বাংলাদেশে। ১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণ করে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। পাটকল, বস্ত্রকল, চিনিকল, রাসায়নিক ও প্রকৌশল শিল্প- বিভিন্ন খাতে তৈরি হয় বিশাল রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পব্যবস্থা। একসময় দেশের শিল্পের স্থায়ী সম্পদের প্রায় ৯২ শতাংশই ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানায়।

উদ্দেশ্য ছিল শিল্প চালু রাখা, কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠানে বাড়তে থাকে লোকসান। অতিরিক্ত জনবল, পুরোনো প্রযুক্তি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি এবং উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বাজারদরের অসামঞ্জস্য- সব মিলিয়ে অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। তখন শুরু হয় বেসরকারিকরণ।

১৯৭২ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যেই প্রায় ৩৪৫টি ছোট রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বেসরকারি বা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়া হয়। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে আরও প্রায় ২২২টি প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণের আওতায় আসে। পরবর্তী সময়েও চলে এই প্রক্রিয়া।

কিন্তু এখানেই চমক। বেসরকারি হলেই সব প্রতিষ্ঠান লাভজনক হয়েছে- এমন প্রমাণ নেই। ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বেসরকারি হওয়া ৩৮টি প্রতিষ্ঠানের একটি পরবর্তী মূল্যায়নে দেখা যায়, ১৪টি চালু থাকলেও ২০টি বন্ধ হয়ে যায়। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আবার ব্যবসার ধরন পরিবর্তন করে। অর্থাৎ শুধু মালিকানা বদলালেই একটি প্রতিষ্ঠান সফল হয় না।

তবে কিছু প্রতিষ্ঠান বেসরকারি হওয়ার পর উল্লেখযোগ্য উন্নতিও করেছে। একটি গবেষণায় চট্টগ্রাম কেমিক্যাল কমপ্লেক্সের উদাহরণে দেখা যায়, বেসরকারিকরণের পর গড় বার্ষিক বিক্রি প্রায় ৩৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৮৮ কোটি টাকায় এবং গড় বার্ষিক লাভ প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা থেকে প্রায় ১৫ কোটি টাকায় ওঠে। অর্থাৎ কোথাও বেসরকারিকরণ কাজ করেছে, আবার কোথাও করেনি।

এবার আসা যাক আজকের বাংলাদেশে। ২০২৬ সালে সরকার বন্ধ ও লোকসানি ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পাট, চিনি, বস্ত্র, রাসায়নিক, ইস্পাত ও প্রকৌশল খাতের প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রয়েছে ১০ হাজার একরেরও বেশি শিল্পভূমি। আর সবচেয়ে বড় বিষয়- এই সম্পদে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। কেউ পুরোনো কারখানা চালাতে চায়, কেউ কৃষিভিত্তিক শিল্প করতে চায়, কেউ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড স্টোরেজ বা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প করতে চায়।

পাট খাতেও ইতোমধ্যে নতুন উদ্যোগ শুরু হয়েছে। তিনটি বন্ধ রাষ্ট্রীয় পাটকল চালুর জন্য সাম্প্রতিক চুক্তিতে প্রায় ৬১৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ১১ হাজার ৬০০ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, এগুলো প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ ও সম্ভাব্য কর্মসংস্থান; প্রকৃত সাফল্য যাচাই হবে বাস্তব বিনিয়োগ ও উৎপাদন শুরু হওয়ার পর। চিনিকলেও একই ধরনের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু এতদিন ধরে যে কারখানাগুলো রাষ্ট্র চালিয়ে লোকসান করেছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেগুলোতে হঠাৎ আগ্রহী কেন? কারণ শুধু কারখানা নয়, এসব প্রতিষ্ঠানের জমি, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও যোগাযোগব্যবস্থাও বড় সম্পদ।

আর এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। রাষ্ট্র এই সম্পদ কত দামে দিচ্ছে? যদি সরকার দীর্ঘমেয়াদি ইজারা বা অন্য কোনো ব্যবস্থায় সম্পদ দেয়, তাহলে জানতে হবে ইজারার মূল্য কত? বিনিয়োগ কত? সরকার কত রাজস্ব পাবে? কত কর্মসংস্থান হবে? আর প্রতিষ্ঠানটি কত বছর শিল্প হিসেবে চালানোর বাধ্যবাধকতা থাকবে?

কারণ একটি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি হয়ে বছরে ১০০ কোটি টাকা লাভ করলেই জনগণ ১০০ কোটি টাকা লাভ করেনি। জনগণের লাভ তখনই হবে, যখন সরকারের ভর্তুকি কমবে, নতুন কর্মসংস্থান হবে, উৎপাদন বাড়বে, সরকার কর ও ইজারা থেকে আয় পাবে, আর ভোক্তা ভালো মানের পণ্য বা সেবা ন্যায্য দামে পাবেন।

উল্টোভাবে, যদি রাষ্ট্রীয় সম্পদ কম দামে দেওয়া হয়, কর্মসংস্থান কমে যায়, বাজার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যায় এবং পণ্যের দাম বেড়ে যায়, তাহলে বিনিয়োগকারী লাভ করলেও জনগণের লাভ নাও হতে পারে। এখানেই আসে সিন্ডিকেটের ভয়। তবে ৪৪টি কারখানা নিয়ে এখনই ‘সিন্ডিকেট হয়েছে’-এমন প্রমাণ নেই। বরং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। কিন্তু ভবিষ্যতে একই কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী যদি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

আর বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের বর্তমান আর্থিক চাপও ছোট নয়। ২০২৪ অর্থবছরে অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত সমন্বয়কৃত লোকসান ছিল প্রায় ৪৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা। একই সময়ে ভর্তুকি ও উন্নয়ন সহায়তাসহ এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারের নিট আর্থিক স্থানান্তর ছিল প্রায় ৮৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ।

তবে এই দুই সংখ্যা যোগ করে এক লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা লোকসান বলা যাবে না। একটি হলো প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত লোকসান, অন্যটি সরকারের মোট আর্থিক সহায়তা। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল আর্থিক ফলাফলের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল সুশাসন, অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক স্বচ্ছতার ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

তাহলে কি সব সরকারি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি করে দেওয়া উচিত? বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, বিষয়টি এত সরল নয়। যে প্রতিষ্ঠান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনায় লাভজনক হতে পারে, সেটিকে সংস্কার করেও চালানো সম্ভব। আর যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে লোকসান করছে, রাষ্ট্রের হাতে রাখার বিশেষ প্রয়োজন নেই এবং বেসরকারি বিনিয়োগে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ আছে, সেগুলো বেসরকারি খাতে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু শর্ত একটাই- স্বচ্ছ প্রক্রিয়া। কারখানা কার হাতে যাচ্ছে, কী দামে যাচ্ছে, কত বছরের জন্য যাচ্ছে, কত বিনিয়োগ হবে, কত মানুষ চাকরি পাবে এবং সরকার কত রাজস্ব পাবে- সব তথ্য প্রকাশ্যে থাকতে হবে।

কারণ এই কারখানাগুলো শুধু সরকারের সম্পদ নয়। এগুলো জনগণের সম্পদ। পাঁচ দশক ধরে জনগণের করের টাকা দিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠানের লোকসান সামলানো হয়েছে, এখন সেগুলো বেসরকারি হাতে গেলে জনগণ কী পেল- এই হিসাবটাও দিতে হবে। তাই ৪৪টি সরকারি কারখানা বেসরকারি বিনিয়োগে দেওয়ার আসল পরীক্ষা হবে না শুধু কারখানা আবার চালু হলো কি না।

পরীক্ষা হবে তিন জায়গায়- সরকার কত টাকা বাঁচাল, বিনিয়োগকারী কতটা উৎপাদন ও কর্মসংস্থান তৈরি করল, আর সাধারণ মানুষ কতটা সুবিধা পেল। কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠান লোকসান করছে- এটি যেমন দীর্ঘদিন চলতে পারে না, তেমনি রাষ্ট্রীয় সম্পদ বেসরকারি হাতে তুলে দিয়েই সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা সরকারি না বেসরকারি- এটা নয়। জনগণের সম্পদ থেকে জনগণ কতটা লাভ পেল? আর ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার ক্ষেত্রে সেই হিসাবই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সামিটের টার্মিনাল চালু, কমবে গ্যাস সংকট

সামিটের টার্মিনাল চালু, কমবে গ্যাস সংকট

প্রাইভেট পড়ালে শিক্ষকদের এমপিও বন্ধ

প্রাইভেট পড়ালে শিক্ষকদের এমপিও বন্ধ

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সংসদের বিশেষ অধিবেশন চায় জামায়াত

রাষ্ট্রপতিকে চিঠি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সংসদের বিশেষ অধিবেশন চায় জামায়াত

৪৪ সরকারি কারখানা বেসরকারি খাতে, জনগণের লাভ কতটা?

৪৪ সরকারি কারখানা বেসরকারি খাতে, জনগণের লাভ কতটা?

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App