ঈদ উপলক্ষে বর্ণীল সাজে সজ্জিত পাহাড় রাণী খাগড়াছড়ি
শংকর চৌধুরী,খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম
ছবি: কাগজ প্রতিবেদক
ঈদের টানা ছুটি কাটানোর নানা জল্পনা-কল্পনা আর আনন্দের প্রধান অংশ নিঃসন্দেহে প্রিয়জনদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু কীভাবে কী করলে ছুটি সবচেয়ে ভালোভাবে কাটানো যাবে এ নিয়ে ভাবনার শেষ নেই । আর ঈদের ছুটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভ্রমণবিলাসী মনের আনন্দ। এবার ঈদের ছুটিতে নিরাপদ ভ্রমনে বর্ণীল সাজে সজ্জিত পাহাড় রাণী খাগড়াছড়ি। চারদিকে সবুজ পাহাড়, তার মাঝখানে আঁকাবাঁকা পিচ সড়ক, ঝরনা, ঐতিহ্যবাহী খাবার, মেঘের খেলা ভ্রমণপিয়াসী প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে এ সময়ের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে পাহাড়ের রানী খাগড়াছড়ি। তাই পরিবার বা বন্ধু দলবেধে বেছে নিতে পারেন খাগড়াছড়ির এই সাতটি স্থান।
গতকাল সকালে আলুটিলা পর্যটন ও জেলা পরিষদ পার্কে পর্যটকদের আকর্ষণ করতে সবধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
খাগড়াছড়ি পর্যটন কেন্দ্রগুলোর প্রস্তুতি সম্পন্ন
জেলার প্রধান আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র - খাগড়াছড়ি শহর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এখানে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট দেশের সর্ববৃহৎ রহস্যময় সুরঙ্গ রয়েছে। সূর্যাস্তের পর আলুটিলা থেকে খাগড়াছড়ি শহরের দৃশ্য যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবি দেখা যায় । সন্ধ্যার পর অন্ধকারে জেলা শহরের বৈদ্যুতিক বাল্ব আলো যেন চারপাশে হাজার হাজার জোনাকি ঘুরে বেড়াচ্ছে । নিদারুণ এক রোমাঞ্চকর অনুভূতির সৃষ্টি করে।
রহস্যময় সুরঙ্গের এক প্রান্ত দিয়ে প্রবেশ করে অন্য প্রান্ত দিয়ে বের হওয়ার অভিজ্ঞতা পর্যটকদের জন্য রোমাঞ্চকর । সুরঙ্গে প্রবেশ করতে হয় মুটোফোনের প্লাস দিয়ে।
রিসাং ঝরনা ( তৈইবাকলাই ) – আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে এ ঝরনাটি । পাদদেশে অবস্থিত রিসাং ঝরনা । পাহাড়ি পথ পেরিয়ে পৌঁছালে দেখা মেলে ঠান্ডা স্বচ্ছ জলের ধারা।
নিউজিল্যান্ডপাড়া - খাগড়াছড়ি শহরের থেকে দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে পানখাইয়াপাড়া আর পেরাছড়ার কিছু অংশ নিয়েই নিউজিল্যান্ড পাড়া গঠিত। নিউজিল্যান্ড পাড়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় রূপ হচ্ছে সড়কের ওপর বসে পাহাড়ে দেখা। এখানে শুধু পাহাড় আর সবুজ প্রকৃতিই নয়, সূর্যাস্তও দেখা যায়। এ ছাড়া পাহাড়ি জনপদের জীবনযাপনের পদ্ধতিও কাছ থেকেই দেখতে পারবেন।
মায়াবিনী লেক – জেলা শহর থেকে ২০ মিনিটের পথ পেরিয়ে দেখা মিলবে বিনোদন কেন্দ্র মায়াবিনী লেক । প্রবেশ পথেই দৃষ্টিনন্দন অভিবাদন গেইট বলে দেয় পর্যটনের সম্ভাবনার কথা। পাহাড়ের উঁচু-নিচু ভাঁজে ভাঁজে বাঁধ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ব্রীজ । স্বর্গময় লেকের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলছে হাঁস। প্রশ্বস্ত লেকের স্বচ্ছ পানিতে নৌকায় বসে প্রকৃতি উপভোগ করতে রয়েছে বিভিন্ন নৌকা। এমনই পরিবেশে পর্যটকদের মায়া ছড়ায় মায়াবিনী লেক।
মাতাই পুখিরি (দেবতা পুকুর) - পাহাড়ের চূড়ায় স্বচ্ছ জলাধার জেলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে মহালছড়ি উপজেলার মাইসছড়ি ইউনিয়নের নুনছড়ি থলিপাড়ায় ৭৫০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এ দেবতা পুকুর। স্থানীয় ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মতে, এ পুকুরের পানি কখনও কমে না এবং পরিষ্কার করতে হয় না। তাই এর নাম মাতাই পুখিরি বা দেবতা পুকুর। বিশেষ করে বাংলা বছরের শেষে বৈসাবী উৎসবের দিন এখানে হাজারো পর্যটকের সমাগম ঘটে।
তৈদুছড়া ঝরনা - খাগড়াছড়ি দীঘিনালা উপজেলার দুর্গম সীমানাপাড়া গ্রামে অবস্থিত তৈদুছড়া ঝরনা। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে যেতে হয়। পথে দেখা মেলে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন । ঝরনায় যাওয়ার পথে ছড়ায় বড় বড় পাথর পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্ক – শহর থেকে ৩ কিমি দূরে জিরো মাইল এলাকায় অবস্থিত পার্কটি। একটি মনোরম ২২ একর জায়গায় গড়ে উঠা একটি দৃষ্টিনন্দন পর্যটন কেন্দ্র। পার্কে রয়েছে অন্যতম আকর্ষণীয় ঝুলন্ত সেতু, লেক, কিডস জোন, ফোয়ারা, কটেজ, দর্শনার্থীরা ওয়াচ টাওয়ার থেকে পুরো খাগড়াছড়ি শহরকে দেখা যায় নতুন এক দৃষ্টিতে এছাড়াও রয়েছে বার্মিজ মার্কেট।
ঢাকা থেকে যেভাবে আসবেন - গ্রীন লাইন, রবি এক্সপ্রেস, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, শান্তি পরিবহন, এস আলম, সৌদিয়া পরিবহন ছাড়াও রয়েছে স্লিপার বাস। এসি ১৭০০ ও নন এসি ৭৫০ টাকা ভাড়া নেয়। ভোরে বাস থেকে নামতে হবে শাপলা চত্বর এলাকায়।
কোথায় থাকবেন - থাকতে পারেন পর্যটন মোটেল, হোটেল গাইরিং, হোটেল অরণ্য বিলাস, হোটেল অবকাশসহ বিভিন্ন মানের হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। হোটেল ও কটেজে এসি ও নন-এসি রুম ভাড়া সাধারণত ১ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে।
কোথায় খাবেন – পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী খাবার পাওয়া যায় সিস্টেম রেস্টুরেন্ট, ব্যাম্বুসুট, বাঁশঝার রেস্টুরেন্ট, এছাড়া সাদামাটা রেস্টুরেন্ট, মনটানা রেস্টুরেন্টসহ অসংখ্য রেস্টুরেন্ট রয়েছে।
খাগড়াছড়ি গেইট এলাকায় খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন জীপ মালিক সমিতি ও পার্বত্য যানবাহন মালিক কল্যাণ সমিতির যৌথ কাউন্টার রয়েছে। তাদের নিধারিত ভাড়া করে জীপ (চাঁদের গাড়ি), পিকাআপ, সাফারি নিতে হবে। এছাড়া সিএনজি, মাহিন্দ, কাউন্টার এক সাথে।
সতর্কতা - অতিরিক্ত ভিড় এড়াতে আগে থেকে হোটেল ও গাড়ি বুকিং নিশ্চিত করতে হবে । যে কোন ঝরনায় নামার আগে পাথরের পিচ্ছিলতা খেয়াল রাখবেন । স্থানীয় সংস্কৃতি ও অদিবাসীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবেন। পরিবেশ রক্ষায় প্লাস্টিক বা ময়লা ফেলে আসবেন না।
জেলার প্রধান আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রকে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি সকল পর্যটন স্পট গুলোতে নিরাপত্তার জোরদার করা হয়েছে বলে জানান, খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মোঃ আনোয়ার সাদাত।
সরেজমিন খাগড়াছড়ি আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র গিয়ে দেখা গেছে, ঝুলন্ত সেতুতে রং করা সহ সবকিছু ঢেলে সাজানো হয়েছে। আর পার্কের চারপাশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে ব্যস্ত সময় পার করছে পরিচ্ছন্ন কর্মীরাসহ কর্তৃপক্ষরা।
জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্কের উপ-সহকারী কর্মকর্তা কান্তি বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, ঈদের ছুটিতে সারাদেশ থেকে পর্যটকদের সমাগম হবে, তাই পার্কের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য পার্কের চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কার করা হচ্ছে । এছাড়াও পার্কের সামনে বার্মিজ মার্কেট বড় আকারে করা হচ্ছে।
পর্যটন মোটেল করপোরেশন ইউনিট ইনচার্জ ক্যাচিং মারমা জানান, ঈদে মোটেলের ৮০ ভাগ রুম বুকিং হয়েছে। আশা করি এইবার বিপুল সংখ্যা পর্যটকের সমাগম হবে। রুমগুলো নাজুক অবস্থায় ছিল। ঈদকে সামনে রেখে সবকিছু সংস্কার করা হয়েছে। সকল প্রকার সেবা দিতে প্রস্তুত রয়েছে। বেশি ভাগ পর্যটক আসে বাইকে করে। তেল সংকট থাকলে পর্যটকরা আসতে পারবে না। না আসতে পারলে এর প্রভাব পড়তে পারে।
খাগড়াছড়ি টুরিস্ট পুলিশ জোনের পরিদর্শক (ইনচার্জ) জাহিদুল কবির (পিপিএম) বলেন, ঈদের দিন থেকে পর্যটকদের সমাগম ঘটবে। এখানে ঈদের দিন পর তিন থেকে পাঁচ দিন পর্যটকদের চাপ থাকতে পারে। আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র ও জেলা পরিষদ পার্কে সার্বক্ষণিক টুরিস্ট পুলিশ থাকবে। দুই স্তরের নিরাপত্তায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়াও বিভিন্ন স্পটে ঘুরার জন্য মোবাইল টিম থাকবে। ট্যুরিস্টদের কোনো সমস্যা হলে জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা নিশ্চিতে তাৎক্ষণিকভাবে সকল প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
