সাঁওতাল বিদ্রোহ
ভগনডিহির আগুন
চন্দন চৌধুরী
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
১৮৫৫ সালের জুন মাস। গ্রীষ্মের দাবদাহে তখন পুড়ছে ভাগলপুর আর বীরভূমের বিস্তীর্ণ অরণ্য অঞ্চল, যা সাঁওতালদের কাছে পরিচিত ছিল পরম মমতার ‘দামিন-ই কোহ’ বা পাহাড়ের স্কার্ট নামে। চিরকাল স্বাধীনচেতা, সরল প্রকৃতির সাঁওতালরা এই বনে নিজেদের ঘাম রক্ত জল করে সোনালি ফসল ফলাত। কিন্তু ১৭৯৩ সালের লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সেই কালো আইন যেন এক ঝটকায় কেড়ে নিল তাদের পৈতৃক অধিকার। প্রাচীন স্থানান্তর চাষ পদ্ধতি বন্ধ হয়ে গেল, আর অরণ্যের শান্ত বুকে রুইন্টারনাল-কে বসল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক, রক্তচোষা বাঙালি মহাজন (যাদের সাঁওতালরা ডাকত ‘দিকু’) এবং লোভী ব্যবসায়ীরা।
খাজনার নির্মম অত্যাচার, জাল দলিল আর চড়া সুদের ঋণে পিষ্ট হতে হতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল এই আদিবাসীদের। ঠিক তখনই ভগনডিহি গ্রামের এক কুটিরে জ্বলছিল এক ভিন্ন আগুন। সেখানে চার ভাই- সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব মুরমু সিদ্ধান্ত নিলেন, আর নয়। দাসত্বের শৃঙ্খল এবার ভাঙতেই হবে।
১৮৫৫ সালের ৩০ জুন। ভগনডিহির মাঠে জড়ো হলো প্রায় ত্রিশ হাজার সাঁওতাল কৃষক। বাতাসে উড়ছে তাদের ঐতিহ্যবাহী তির-ধনুক, আর চারদিক কাঁপিয়ে উঠছে সিধু-কানুর গর্জন : ‘রাজা-মহারাজাদের খতম করো’, ‘দিকুদের গঙ্গা পার করে দাও’, ‘আমাদের নিজেদের হাতে শাসন চাই!’
ইতিহাসের পাতায় এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সূচনা হলো সেদিন। এই বিশাল জনতা নিজেদের অধিকারের দাবিতে বীরভূম থেকে কলকাতার অভিমুখে এক দীর্ঘ পদযাত্রা শুরু করল- যা ভারতের ইতিহাসে প্রথম ‘গণপদযাত্রা’ হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
কিন্তু শোষকদের অত্যাচার থামেনি। জুলাইয়ের ৭ তারিখ, দিঘি থানার অত্যাচারী দারোগা মহেশলাল বিদ্রোহীদের দমন করতে এলে সাঁওতালদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ফেটে পড়ে। মহেশলালসহ ১৯ জনকে হত্যা করে বিদ্রোহীরা বুঝিয়ে দেয়, এবার তারা নিজেদের স্বাধীন সার্বভৌম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেই ছাড়বে।
এক নির্মম ট্র্যাজেডি: এই বিদ্রোহে শুধু পুরুষেরা নয়, সাঁওতাল নারীরাও সমভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন। মহারাজপুর গ্রামে পুরুষদের পাশাপাশি সাঁওতাল নারীরাও লুটেরা দিকুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কিন্তু এই লড়াইয়ের মূল্য দিতে হয়েছিল অনেক চড়া। সিধু ও কানুর বোন ফুলমনিকে ব্রিটিশ সেপাইরা নির্মম নির্যাতন ও ধর্ষণের পর হত্যা করে ফেলে রেখে যায় রেললাইনের ধারে। সেই শহীদ ফুলমনির রক্ত আজও সাঁওতালদের লোকগাথায় গানের সুরে সুর মেলায়।
বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়তে দেখে ব্রিটিশ রাজের সিংহাসন কেঁপে উঠল। কোম্পানির বড়লাটরা বিদ্রোহ দমনে নামালেন ৩৭শ, ৭ম, ৩১শ রেজিমেন্টসহ এক বিশাল আধুনিক সেনাবাহিনী। সাঁওতাল নেতাদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য কমিশনার মোটা অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করলেন- প্রধান নায়কের জন্য ১০ হাজার টাকা, আর স্থানীয় নায়কদের জন্য ১ হাজার টাকা। ১০ নভেম্বর জারি করা হলো সামরিক আইন।
যুদ্ধটা ছিল সম্পূর্ণ অসম। একদিকে ইংরেজদের আধুনিক বন্দুক ও গর্জে ওঠা কামান, অন্যদিকে সাঁওতালদের আদিম তির-ধনুক আর অদম্য সাহসের লড়াই। প্রখ্যাত লেখক চার্লস ডিকেন্সও সাঁওতালদের এই বীরত্ব ও সততা দেখে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন: ‘তাদের মধ্যে সম্মানের অনুভূতি আছে... তারা শিকারে বিষাক্ত তির ব্যবহার করলেও শত্রæদের বিরুদ্ধে তা কখনো করেনি। তারা আমাদের সভ্য শত্রæ রুশদের চেয়েও অসীম সম্মানের অধিকারী।’
কিন্তু ইতিহাসের এই নিষ্ঠুর সত্যকে এড়ানো গেল না। আধুনিক অস্ত্রের সামনে টিকতে না পেরে প্রায় ১০ হাজার সাঁওতাল যোদ্ধা প্রাণ হারালেন। সিধু মুরমু কিছু বিশ্বাসঘাতকের চক্রান্তে গ্রেপ্তার হলেন এবং তাকে গুলি করে হত্যা করা হলো। বীরভূমের ওপারে পুলিশের গুলিতে শহীদ হলেন কানু। চাঁদ ও ভৈরব ভাগলপুরের যুদ্ধে দেশের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিলেন। আরেক বীর নেতা চানকু মাহাতোকে ১৮৫৬ সালের ১৫ মে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হলো। ১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে চার ভাইয়ের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে শান্ত হয়ে এলো অরণ্যের বুক, অবসান ঘটল এক গৌরবময় ‘হুল’-এর।
সাঁওতালরা যুদ্ধে হারলেও, ব্রিটিশ সরকারকে তাদের দাবি মানতে বাধ্য করেছিল। বিদ্রোহের পর ইংরেজ সরকার তদন্ত কমিটি বসায় এবং বীরভূম ও ভাগলপুরের ৫,৫০০ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে গঠন করে ‘সাঁওতাল পরগণা’ নামক একটি অ-নিয়ন্ত্রিত (নন-রেগুলেটেড) বিশেষ জেলা।
এখানে সাঁওতালদের নিজস্ব মাঝি, পরানিক ও পরগনা ব্যবস্থার মাধ্যমে শাসন পরিচালনার অধিকার দেয়া হয়। তাদের নিজেদের আইনে বিচার-সালিশের ক্ষমতা এবং খাজনা আদায়ের দায়িত্ব তাদের হাতেই অর্পণ করা হয়। সবচেয়ে বড় জয়টি আসে ১৮৮৫ সালের ‘বেঙ্গল টেনান্সি অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে, যা অনুযায়ী আদিবাসীদের জমি সরকারি অনুমতি ছাড়া অন্য কারো কাছে বিক্রি করা নিষিদ্ধ হয়- যা আজও কার্যকর।
কলেয়ান গুরু তার ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘হড়কোড়েন মারে হাপড়ামকো রেয়াঃ কথা’-তে এই বিদ্রোহের লিপিকার হিসেবে সিধু-কানুর অমর বাণী ধরে রেখেছেন। পরবর্তীতে এই মহান আত্মত্যাগের কাহিনি মৃণাল সেনের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘মৃগয়া’-তেও জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের ঠিক আগে ঘটে যাওয়া এই সাঁওতাল হুল ছিল পরাধীনতার বিরুদ্ধে ভারতের প্রথম স্বাধীনতার সূর্যোদয়।
চন্দন চৌধুরী : লেখক, সাংবাদিক ও প্রকাশক।
