স্মরণীয়-বরণীয়
শিশিরকুমার ভাদুড়ী
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
আধুনিক বাংলা নাট্যজগতের পথিকৃৎ, খ্যাতনামা অভিনেতা ও নির্দেশক শিশিরকুমার ভাদুড়ী ১৮৮৯ সালের ২ অক্টোবর হাওড়ার রামরাজাতলায় জন্মগ্রহণ করেন। গিরিশচন্দ্র ঘোষের পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলা রঙ্গমঞ্চের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। বাংলা নাটকের স্বর্ণযুগে তিনিই প্রথম আধুনিক মঞ্চসজ্জা (সেট) ও আলোর ব্যবহারের মাধ্যমে নাট্যশিল্পে বাস্তবধর্মী ও প্রাকৃতিক আবহ প্রবর্তন করেন। নাট্যকলায় অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি ‘নাট্যাচার্য’ উপাধিতে ভূষিত হন।
শিক্ষাজীবনে শিশিরকুমার ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ১৯০৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর, তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বি.এ এবং ১৯১৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ পাস করেন। এরপর তিনি বিদ্যাসাগর কলেজে (তৎকালীন মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন) ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সুবেশ ও সুকণ্ঠের অধিকারী এই অধ্যাপক তার নিষ্ঠার কারণে ছাত্রদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। ছাত্রাবস্থা ও অধ্যাপনাকালে তিনি শৌখিন অভিনেতা হিসেবে বহু ইংরেজি ও বাংলা নাটকে অভিনয় করেন। ১৯১২ সালে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’ নাটকে ‘কেদার’ চরিত্রে তার অভিনয় দেখে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ হয়ে প্রশংসা করেছিলেন। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ তাকে রবীন্দ্রনাট্য মঞ্চায়নে উৎসাহিত করেন এবং প্রচলিত সূত্রানুযায়ী তাকে ‘নটরাজ’ অভিধায় ভূষিত করেন।
অভিনয়ের প্রতি প্রবল টানের কারণে ১৯২১ সালে অধ্যাপক জীবন ছেড়ে তিনি পেশাদারি নাট্যমঞ্চে যোগ দেন। ওই বছরের ১০ ডিসেম্বর ম্যাডান থিয়েটার কোম্পানির রঙ্গালয়ে ‘আলমগীর’ নাটকের নামভূমিকায় অভিনয় করে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা পান। এরপর ‘চাণক্য’ ও ‘রঘুবীর’ চরিত্রেও তিনি তার অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতানৈক্যের কারণে তিনি চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আঁধারে আলো’ ও ‘চন্দ্রনাথ’ চলচ্চিত্র দুটি পরিচালনা ও তাতে অভিনয় করেন।
১৯২৩ সালে তিনি নিজস্ব নাট্যদল গঠন করেন। তার মতো একজন উচ্চশিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান মানুষের হাত ধরে বহু তরুণ প্রতিভা নাট্যজগতে আসেন। ইডেন গার্ডেন একজিবিশনে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘সীতা’ নাটকে রামচন্দ্রের ভূমিকায় তার অভিনয় নাট্যজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, যা ১৯৩৩ সালে তারই পরিচালনায় চলচ্চিত্র রূপ পায়। এছাড়া তিনি ‘বসন্তলীলা’ গীতিমালাও মঞ্চস্থ করেছিলেন। বাংলা নাটকের এই মহান রূপকার ১৯৫৯ সালের ৩০ জুন কলকাতায় বরাহনগরের নিজ বাসভবনে ৬৯ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
