×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

অসীম শক্তির হাতছানি

জিরো-পয়েন্ট এনার্জি ও ভবিষ্যতের পৃথিবী

Icon

ড. এন এইচ এম আবু বকর

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জিরো-পয়েন্ট এনার্জি ও ভবিষ্যতের পৃথিবী

মহাজাগতিক নিঃসঙ্গতায় দাঁড়িয়ে আমরা মানুষ বরাবরই শক্তির তৃষ্ণায় কাতর। সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকে আগুন জ্বেলে, কয়লা পুড়িয়ে, পরমাণুকে ভেঙে আমরা কেবলই খুঁজে চলেছি এক বিন্দু স্বস্তি, এক চিলতে আলো। কিন্তু আমাদের চারপাশের এই বিশাল মহাবিশ্ব কি কেবলই শূন্যতার আধার? নাকি এই আপাত শান্ত শূন্যতার গভীরে লুকিয়ে আছে শক্তির এক সমুদ্র, যা এখনো আমাদের নাগালের বাইরে? আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং রহস্যময় ধারণার নাম জিরো-পয়েন্ট এনার্জি- শক্তির সেই আদিম উৎস যা এই মহাবিশ্বের প্রতিটি কণিকায়, প্রতিটি শূন্যস্থানে স্পন্দিত হচ্ছে নিরন্তর। কল্পনা করুন এমন এক পৃথিবীর কথা, যেখানে শক্তির জন্য আমাদের আর প্রকৃতির বুক চিরে কয়লা তুলতে হবে না, পারমাণবিক চুল্লির তেজস্ক্রিয়তাকে ভয় পেতে হবে না, কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের আতঙ্কে প্রতি মুহূর্ত কাটাতে হবে না। জিরো-পয়েন্ট এনার্জি কেবল একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নয়, এটি মানুষের সভ্যতার মুক্তি এবং উত্তরণের এক স্বপ্নগাথা।

এই স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম বৈজ্ঞানিক প্রতিভা নিকোলা টেসলা (১৮৫৬-১৯৪৩)। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভেই তিনি অনুভব করেছিলেন যে, আকাশ নিজেই এক শক্তির অফুরান ভাণ্ডার, যা কেবল আহরণের অপেক্ষায় আছে। তার উত্তরসূরি হিসেবে পরবর্তীতে বিজ্ঞানী হ্যারল্ড পুথফ (১৯৩৬-) এবং টম বিয়ার্ডেন (১৯৩০-২০২২) এই তাত্ত্বিক কাঠামোকে আরো এগিয়ে নিয়েছেন। তারা দেখিয়েছেন, জিরো-পয়েন্ট এনার্জি হলো কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়ামের সেই শক্তি, যা পরম শূন্য তাপমাত্রাতেও বিদ্যমান থাকে। সাধারণ দৃষ্টিতে যাকে আমরা ‘শূন্য’ বা ‘ভ্যাকুয়াম’ বলি, পদার্থবিজ্ঞানের সূ²তম দৃষ্টিতে তা আসলে এক মহাজাগতিক নৃত্যক্ষেত্র, যেখানে অনবরত কণা ও প্রতিকণার সৃষ্টি ও ধ্বংস ঘটছে। এই শক্তিটি এতই বিশাল যে, বলা হয় এক কাপ আয়তনের ভ্যাকুয়াম থেকে যে পরিমাণ শক্তি আহরণ করা সম্ভব, তা দিয়ে আমাদের পৃথিবীর সমস্ত সমুদ্রকে মুহূর্তের মধ্যে বাষ্পীভূত করে ফেলা যায়।

এই ধারণাটি যখন প্রথম মাথায় আসে, তখন মনে হয় আমরা যেন কোনো এক জাদুর রাজ্যের সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু কেন আমরা এই শক্তি ব্যবহার করতে পারছি না? কেন আমাদের পৃথিবী আজো জ্বালানিসংকটের যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছে? এর কারণ আমাদের সীমাবদ্ধ প্রযুক্তি এবং সেই চিরাচরিত দৃষ্টিভঙ্গি, যা কেবল দৃশ্যমান উৎস থেকেই শক্তি আহরণে অভ্যস্ত। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম হয়তো ভিন্ন। যদি আমরা এমন কোনো যন্ত্র বা ক্ষেত্র তৈরি করতে পারি, যা ভ্যাকুয়াম থেকে এই শক্তিকে শুষে নিয়ে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তর করতে সক্ষম হই, তবে পৃথিবী রাতারাতি বদলে যাবে। ফ্রি এনার্জি বা জিরো-পয়েন্ট এনার্জি যদি বাস্তবে ধরা দেয়, তবে তা মানুষের কল্যাণে এক নতুন যুগের সূচনা করবে।

এই শক্তির ব্যবহার হবে পুরোপুরি দূষণমুক্ত। আজ যখন বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ গলছে, বন উজাড় হচ্ছে, আর বিষাক্ত ধোঁয়ায় আমাদের ফুসফুস শ্বাস নিতে পারছে না, তখন এই শক্তি হতে পারে আমাদের পৃথিবীর জন্য আশীর্বাদ। কোনো কার্বন নির্গমন নেই, নেই কোনো তেজস্ক্রিয় বর্জ্য- কেবল এক বিশুদ্ধ আলোকবর্তিকা যা আমাদের ঘর আলোকিত করবে, আমাদের গাড়ি চালাবে এবং আমাদের শহরগুলোকে সচল রাখবে। দারিদ্র্যের একটি বড় কারণ হলো জ্বালানির উচ্চমূল্য। কৃষি থেকে শিল্প, প্রতিটি ক্ষেত্রে শক্তির ব্যয় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। ফ্রি এনার্জি এই অর্থনৈতিক শৃঙ্খল ভেঙে দেবে। কৃষক তার সেচ পাম্প চালাতে কোনো জ্বালানির মুখাপেক্ষী হবে না, প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ কোনো গ্রিডের সংযোগ ছাড়াই বিদ্যুতের আলোয় পড়তে পারবে, প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব শক্তির উৎস নিয়ে স্বনির্ভর হয়ে উঠবে।

চিকিৎসাক্ষেত্রেও আসবে আমূল পরিবর্তন। বিশুদ্ধ পানি তৈরিতে কিংবা উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে জটিল রোগ নিরাময়ে শক্তির অবারিত জোগান আমাদের আরো দীর্ঘায়ু ও সুস্থ জীবন নিশ্চিত করবে। তবে এই স্বপ্নের যাত্রাপথে কাঁটা কম নয়। জিরো-পয়েন্ট এনার্জি বা ফ্রি এনার্জির গবেষণাকে অনেক সময় অবৈজ্ঞানিক বা কাল্পনিক বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। এর পেছনে আছে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর স্বার্থ, যারা চায় না আমাদের পুরনো জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা শেষ হোক। তারা ভয় পায়, যদি মানুষ ফ্রি এনার্জি পেয়ে যায়, তবে বর্তমান পৃথিবীর অর্থব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। কিন্তু মানুষের ইতিহাসে প্রতিটি নতুন উদ্ভাবনই তো পুরনোকে ভেঙে নতুনকে প্রতিষ্ঠা করেছে। স্টিম ইঞ্জিন কিংবা বিদ্যুৎ আবিষ্কারের সময়ও কি মানুষ সংশয় প্রকাশ করেনি?

মানুষের এই অদম্য অনুসন্ধিৎসাই একদিন হয়তো প্রকৃতির রহস্যকে আমাদের অনুগত করবে। আমাদের পৃথিবী আজ এক ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে অসীম জ্ঞান ও প্রযুক্তির হাতছানি, অন্যদিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পরিবেশ। জিরো-পয়েন্ট এনার্জি এই দুইয়ের মাঝে এক সেতু হতে পারে। এটি কেবল বিজ্ঞানের একটি সমীকরণ নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক নতুন দিশা। হয়তো একদিন কোনো এক ল্যাবরেটরিতে একাগ্রচিত্ত কোনো বিজ্ঞানী ভ্যাকুয়ামের সেই স্পন্দনকে সুরের মতো ধরে ফেলবেন, আর সেদিনই পৃথিবী তার সমস্ত গøানি মুছে ফেলে নবজন্ম নেবে। সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় আমাদের স্বপ্ন দেখতে হবে, কারণ স্বপ্নই মানুষকে অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রেরণা দেয়।

মহাবিশ্বের এই অসীম শক্তির ভাণ্ডার আমাদের দিকে চেয়ে আছে, কেবল সাহসের অভাবে হয়তো বৈজ্ঞানিকেরা লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না। যেদিন বৈজ্ঞানিকেরা ভয়কে জয় করে প্রকৃতির এই অপার রহস্যকে মানব কল্যাণে কাজে লাগাতে শিখবে, সেদিন কেবল অন্ধকারই ঘুচবে না, ঘুচবে মানুষের সব দুঃখ-কষ্টের কালো ছায়া। মানবসভ্যতা তখন আর কেবল একটি গ্রহের সীমাবদ্ধতায় বন্দি থাকবে না, সে পাড়ি জমাবে নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রান্তরে, কারণ তার সঙ্গে থাকবে লুকিয়ে থাকা শক্তির সম্ভাবনা, যা একদিন হয়তো বাস্তবে রূপ পাবেই।

ড. এন এইচ এম আবু বকর : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

‘দেশের ১১ শতাংশ মানুষ আর্সেনিক ঝুঁকিতে’

‘দেশের ১১ শতাংশ মানুষ আর্সেনিক ঝুঁকিতে’

ফেনী জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আর নেই

ফেনী জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আর নেই

‘হাসিনার বক্তব্য প্রচার না করতে গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে সরকার’

‘হাসিনার বক্তব্য প্রচার না করতে গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে সরকার’

৪ দিনেই ১০০ কোটির ক্লাবে ‘ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল’

৪ দিনেই ১০০ কোটির ক্লাবে ‘ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল’

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App