আজ দোহায় বৈঠকের ঘোষণা ট্রাম্পের, অস্বীকার করল ইরান
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের ওপর পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। মার্কিন প্রশাসনের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, চলমান উত্তেজনা প্রশমনের উদ্দেশ্যে কাতারের রাজধানী দোহায় উভয় দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের বৈঠক করার কথা রয়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যম বলছে, কাতারে আজ মঙ্গলবার আলোচনায় বসতে যাচ্ছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এ বৈঠকে বিশ্ববাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে। এছাড়া সমঝোতা চুক্তিতে উল্লিখিত বিষয়গুলো, উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি কারিগরি পর্যায়ের আলোচনাও হবে। বৈঠকে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনার অংশ নেবেন। গতকাল সোমবার ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট।
এর আগে ট্রæথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান আলোচনায় বসার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। আলোচনা আগামীকাল (আজ) দোহায় অনুষ্ঠিত হবে।’ এ বিষয়ে সিএনএনকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন থেকে দুই পক্ষ আর সংঘাতে জড়াবে না। আরো বিশদ আলোচনার জন্য তারা মঙ্গলবার কাতারের দোহায় আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে।’
নাম প্রকাশ না করে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে আরো একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘আপাতত উভয় পক্ষই সংঘাত থেকে সরে দাঁড়াবে। জাহাজগুলো অবাধে চলাচল করতে পারবে। কারণ, আলোচনা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।’
তবে এই বৈঠকের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি। তিনি বলেছেন, কাতারে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো বৈঠকের পরিকল্পনা নেই। টেলিগ্রামে দেয়া এক বিবৃতিতে গরিবাবাদি বলেন, ‘যদিও কাতারের সঙ্গে আলোচনায় অপর পক্ষের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত। এটি যথারীতি চলছে। তবে কিছু গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে ওয়ার্কিং গ্রুপগুলোর কারিগরি আলোচনা দোহায় অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘যখন শর্তগুলো পূরণ হবে এবং তারিখ ও স্থান নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর পর নির্ধারিত ওয়ার্কিং গ্রুপগুলোর কাঠামোর মধ্যে কারিগরি আলোচনার প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। এ বিষয়ে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।’
মূলত গত বৃহস্পতিবার ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এভার লাভলি’-তে ড্রোন হামলা চালায় ইরান। এ ঘটনাকে ভালোভাবে নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিবাদে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায় দেশটি। এরপর উপসাগরীয় দেশ বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন স্থাপনায় আঘাত হেনে পাল্টা জবাব দেয় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
এর আগে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে গত ১৭ জুন একটি সমঝোতায় সই করেন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতারা। এর মধ্য দিয়ে বিবদমান দেশ দুটির মধ্যে আলোচনার পথ খোলে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার আশা দেখা দেয়। তবে হঠাৎ করেই বৃহস্পতিবার থেকে স্ফূলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যে। এতে ঘি ঢালে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই।
আইআরজিসি জানায়, তাদের অনুমতি ছাড়া কিংবা নির্ধারিত রুটের বাইরে দিয়ে কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে যেকোনো পরিণতির জন্য তারা নিজেরাই দায়ী থাকবে। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ইরান হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে আবারো যুদ্ধে ফিরবে। আর যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে বাধ্য হলে ইরানের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।
১৭ জুন যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি ৬০ দিনের জন্য টোল-মুক্ত রাখার কথা ছিল। এর ধারাবাহিকতায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরান সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর উপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, চুক্তির শর্ত অমান্য করে ওমান উপকূলে বিকল্প নৌপথ ব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে ইরান এবং প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের একক নিয়ন্ত্রণের অধিকার দাবি করেছে দেশটি। ফলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের জন্য যে সমঝোতা হয়েছে, তার জন্য হরমুজ প্রণালি এখন বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত ভাষাগত অস্পষ্টতার কারণে সমঝোতা চুক্তি হওয়ার দুই সপ্তাহ পার না হতেই নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। এতে বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে চলমান শান্তি প্রচেষ্টা। চুক্তির ভাষাগত অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে দুপক্ষই মাঠের পরিস্থিতি নিজেদের মতো ব্যাখ্যা করছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ‘সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা’ বা ‘নিরাপদ যাতায়াত’-এর মতো শব্দগুলোর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা উল্লেখ না থাকায় গত রবিবার পর্যন্ত ৭২ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালিতে সংঘর্ষ ও উত্তেজনা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী তীব্র জ্বালানি সংকট, নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতি, শেয়ারবাজারে ধস এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়, যার সরাসরি আঘাত আসে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। তাই যুদ্ধ বন্ধে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি হতে আলোচনার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
