৬৪ সংশোধনী নিয়ে অর্থ বিল পাস
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি এবং কিছুক্ষেত্রে করছাড়ের ৬৪টি সংশোধনীসহ অর্থ বিল, ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের সংশোধিত অর্থবিলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে চার লাখ টাকা নির্ধারণ করা। একই সঙ্গে ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে আগের মতোই টিআইএন ছাড়াই ব্যাংক হিসাব খোলা যাবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৮তম দিনে গতকাল সোমবার ‘অর্থ বিল ২০২৬’ সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। সংসদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। এর আগে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, কালো টাকা সাদা করার প্রস্তাব প্রত্যাহারসহ কয়েকটি প্রস্তাব সংশোধনের সুপারিশ করেন। পরে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংশোধিত আকারে অর্থবিল পাসের প্রস্তাব করলে সংসদ তা কণ্ঠভোটে অনুমোদন দেয়।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি পাসের প্রস্তাব তুলে বলেন, আমি প্রস্তাব করছি যে সরকারের আর্থিক প্রস্তাবাবলী কার্যকরকরণ এবং কতিপয় আইন সংশোধনকল্পে আনীত বিলটি অর্থ বিল, ২০২৬ সংসদে স্থিরীকৃত আকারে পাস করা হোক। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ প্রস্তাবটি ভোটে দেন। কণ্ঠভোটে তা পাস হয়। স্পিকার বলেন, অতএব সংসদে স্থিরীকৃত আকারে অর্থ বিল, ২০২৬ পাস হল।
এর আগে বিলটি জনমত যাচাইয়ে পাঠানোর প্রস্তাবের পক্ষে ও বিপক্ষে আলোচনা হয়। কয়েকজন সংসদ সদস্য বাজেট প্রণয়নে জনগণ ও জনপ্রতিনিধিদের আরো বেশি সম্পৃক্ত করার দাবি জানান।
জনমত যাচাইয়ের দাবি : পাবনা-১ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান বলেন, বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনগণ ও জনগণের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যে ধরনের ইন্টারঅ্যাকশন দরকার ছিল, তার অভাব দেখা গেছে।
তিনি বলেন, শুধুমাত্র বাজেট বিল, অর্থ বিল সেটাই না; অন্য যে কোনো বিলের ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেখানে গ্রিন পেপার, হোয়াইট পেপার দিয়ে জনমত যাচাইয়ের প্রচলন রয়েছে, আমাদের দেশে আমরা দেখছি সেখানে সংসদ সদস্যদের যেদিন বিলটা উত্থাপিত হয়, সেদিন বিলের কপি দেয়ার মতো ঘটনা প্রতিনিয়ত দেখতে পাচ্ছি।
অর্থ বিল স্থায়ী কমিটিতে পাঠিয়ে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করার সুযোগ নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, সে কারণেই জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। নাজিবুর বলেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নিয়ে জনগণের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীও বাজেট বক্তৃতায় এ ধরনের বিধান প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছেন। সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীও এ বিষয়ে সংশোধনী দিয়েছেন। সর্বনি¤œ করহার নিয়ে আপত্তি তুলে তিনি বলেন, এটি ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ করার দাবি আছে।
নাজিবুর বলেন, সরকারি দল বলছে এটা যুগান্তকারী। অন্যদিকে অনেকে বলছেন এই বাজেট গরিব মারার বাজেট। সেক্ষেত্রে জনমত যাচাইয়ের জন্য এই বিলটা যদি দেওয়া হয়, তাহলে জনগণ আসলে এটাকে গ্রহণ করছে কি না, এই ব্যাপারে সুস্পষ্ট ধারণা আমরা পেতে পারি।
পাবনা-৩ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ আলী আসগর বলেন, অর্থ বিলে মূলত পরিচালন ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয়ের কাঠামো রয়েছে। তার মতে, পরিচালন ব্যয় বেশি ধরা হয়েছে, উন্নয়ন ব্যয় তুলনামূলক কম। তিনি বলেন, উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে পরিচালন ব্যয় কমানো দরকার।
প্রধানমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার প্রশংসা করে আলী আছগর বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও কথা বলেছেন বলে তার মনে হয়েছে। বিভিন্ন কর কমানো ও মওকুফের কথা বলায় তাকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, অর্থ বিল পাস হলেই বাজেট বাস্তবায়নের যাত্রা শুরু হবে। তাই বিলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ২০১৭ সালে গ্যাস উৎপাদন ছিল ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ঘনফুট, যা এখন নেমে এসেছে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ঘনফুটে। এ অবস্থায় শিল্পকারখানার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ জানান শাহজাহান চৌধুরী।
পিরোজপুর-১ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী বলেন, অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা সচল রাখতে অর্থ বিলের গুরুত্ব ‘অপরিসীম’।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কঠিন হলেও দেশের স্বার্থে সরকার সফল হোক, এমন প্রত্যাশা জানান তিনি। মাসুদ সাঈদী বলেন, বিরোধী দল হিসেবে কেবল সমালোচনা নয়, দেশের অর্থনীতির স্বার্থে সুনির্দিষ্ট কিছু গঠনমূলক প্রস্তাব পেশ করতে চাই।
তার প্রস্তাব, করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানো হোক। সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি ভ্যাটের চাপ না দিয়ে নতুন করদাতা শনাক্ত এবং কর প্রশাসন পুরোপুরি ডিজিটাল করা হলে রাজস্ব আয় বাড়বে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে বিশেষ সুরক্ষার আওতায় রাখার দাবি জানিয়ে জামায়াতের এই এমপি বলেন, এ খাতই দেশের কর্মসংস্থানের মূল ভিত্তি।
পরিবেশবান্ধব ও নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে কর ছাড় এবং দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর ‘গ্রিন ট্যাক্স’ আরোপের প্রস্তাব দেন তিনি। মাসুদ সাঈদী বলেন, সাধারণ মানুষের চিকিৎসা খরচ কমাতে সব ধরনের জীবনরক্ষাকারী আমদানি করা ওষুধে শুল্ক-ভ্যাট সম্পূর্ণ মওকুফ করা উচিত। এর ঘাটতি পূরণে বিলাসবহুল গাড়ি ও পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো যেতে পারে। কৃষিকে আধুনিক ও যান্ত্রিক করতে কৃষিযন্ত্র আমদানিতে শুল্ক শূন্যের কোঠায় নামানোরও প্রস্তাব দেন তিনি।
পাবনা-৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য আবু তালেব মন্ডল বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যে দেশের রাজনীতিতে সম্মানের সংস্কৃতির ইঙ্গিত; পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা সংসদকে সাইকেলের দুই চাকার সঙ্গে তুলনা করেছেন। সরকারি দল ও বিরোধী দল একসঙ্গে দায়িত্বশীলভাবে চললে দেশ অর্থনৈতিক দিক থেকেও এগিয়ে যাবে।
আবু তালেব বলেন, আমরা সকলেই দুর্নীতি এবং মাদককে না বলি। আমরা যারা এই সংসদে আছি, সকলেই এ ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ হই।
চট্টগ্রাম-১৬ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ব্যাংক খাতের সংকট নিয়ে কথা বলেন।
তিনি বলেন, ব্যাংক খাত সংকটপূর্ণ সময় পার করছে। আমানত সংরক্ষণ ও গ্যারান্টির ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি।
পরিচালন ব্যয় কমানো, বিদেশ প্রশিক্ষণের নামে অপচয় রোধ, দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের সম্মানী বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সিসি ক্যামেরা, অটো ক্যামেরা ও চেকপোস্টের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর প্রস্তাব দেন জহিরুল।
কুষ্টিয়া-৩ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. আমির হামজা বলেন, বাজেট নিয়ে দুই পক্ষের আলোচনা অর্থবহ হবে, যদি বাজেট কার্যকর করা যায়।
গত অর্থবছরের ১০ মাসে রাজস্ব আদায় ছিল প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এবার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যা সরকারের জন্য কঠিন হবে বলে তিনি মনে করেন।
আমির হামজা বলেন, বাজেটের আকার ৬ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা ধরা হলে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা তৈরি হতো না।
নি¤œমানের সিগারেট ও মদের ওপর কর কাঠামো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নি¤œমানের সিগারেটের খুচরা দাম ৬ টাকা ২০ পয়সা হলেও খুচরা পয়সার অভাবে ভোক্তাকে ৭ টাকা দিতে হচ্ছে। বাকি ৮০ পয়সা সরকার পাচ্ছে না। এ অংশ সরকার পেলে রাজস্ব আদায় বাড়তে পারে।
কুষ্টিয়া-৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. আফজাল হোসেন বলেন, শিক্ষাখাতে বরাদ্দ থাকলেও মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষায় মাত্র ১৮ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষকে নৈতিকভাবে শিক্ষিত করে তুলতে না পারলে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। ইবতেদায়ি শিক্ষাকে জাতীয়করণের কোনো ব্যবস্থা বাজেটে রাখা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। মাদ্রাসা শিক্ষা শক্তিশালী করতে বাজেট জনমত যাচাইয়ে পাঠানোর দাবি জানান আফজাল।
চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিন কর কাঠামো নিয়ে কয়েকটি প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলেও প্রথম ধাপে সরাসরি ১০ শতাংশ কর আরোপের পরিবর্তে ৫ শতাংশ রাখলে করদাতারা উপকৃত হবেন।
টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এমন ৫৪টি খাতের তথ্য কর ফাইলের সঙ্গে যুক্ত করা হলে কর আহরণ বাড়বে বলেও মত দেন তিনি।
দ্বিতীয় গাড়ির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কর আদায়ের পাশাপাশি মালিকানা পরিবর্তন বাধ্যতামূলক করা হলে আরও রাজস্ব আসতে পারে বলে প্রস্তাব করেন রুহুল আমিন।
গাজীপুর-৪ আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আইউবী বলেন, দেশের যুবকেরা বাজেটের কাছে কর্মসংস্থান চায়। কিন্তু নতুন কর্মসংস্থানের বদলে প্রতিদিন মিল-কারখানা বন্ধ হচ্ছে। তিনি বলেন, গত আন্দোলনে অনেক যুবক অপেক্ষা করেছিল সুসময় আসবে, চাকরি হবে, তারপর তারা বিয়ে করবে। কিন্তু বাজেটে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন নেই।
হামিম গ্রুপের মালিকের বক্তব্য উদ্ধৃত করে আইউবী বলেন, বাজেটের পরদিন সংবাদ সম্মেলনে তিনি কর্মসংস্থান কমা ও কারখানা বন্ধের কথা বলেছেন এবং নিজের প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থানের কথা বলা হলেও এ খাতে বরাদ্দ আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে বলে দাবি করেন তিনি। আইউবী বলেন, বরাদ্দ কমিয়ে কর্মসংস্থান বাড়াবেন, এটা স্ববিরোধী।
কৃষি ভর্তুকি, এডিপিতে কৃষিখাত এবং স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ কমেছে দাবি করে তিনি বলেন, কৃষক ও যুবকদের কাছে বাজেট কীভাবে দেখা হচ্ছে, তা জানতে জনমত যাচাই প্রয়োজন।
জনমত যাচাই নাকচ : আলোচনা শেষে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিলটির বিষয়বস্তু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা, পর্যালোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। তিনি বলেন, এই পর্যায়ে বিলটি পুনরায় জনমত যাচাইয়ের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সংসদ সদস্যদের জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এরপর স্পিকার জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাবগুলো ভোটে দিলে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাবগুলো নাকচ হয়। পরে অর্থ বিল, ২০২৬ অবিলম্বে বিবেচনার জন্য গ্রহণের প্রস্তাব কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়।
৬৪ সংশোধনী গ্রহণ : বিলটি বিবেচনার জন্য গৃহীত হওয়ার পর দফাভিত্তিক সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন শুরু হয়। স্পিকার জানান, বিলের বিভিন্ন দফা ও তফসিলের ওপর সংশোধনী এনেছেন এস কে আজিজুল বারী, এ বি এম মোশারফ হোসেন, আব্দুস সালাম আজাদ, খন্দকার আবু আশফাক, মোহাম্মদ সেলিম ভূঁইয়া, মোহাম্মদ শামীম কায়সার, রাশেদা বেগম হীরা, আলহাজ জসিমউদ্দিন আহমদ, রেহানা আক্তার রানু, শিরিন সুলতানা এবং হুম্মাম কাদের চৌধুরী।
এসব সংশোধনী প্রস্তাব অর্থমন্ত্রী গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, মাননীয় সংসদ সদস্যগণ অর্থ বিল, ২০২৬-এর সংশোধনী তালিকা-২-এ যে সকল সংশোধনী প্রস্তাব এনেছেন, তা আমি গ্রহণ করছি। এরপর স্পিকার একে একে সংশোধনীগুলো ভোটে দেন। সব সংশোধনী কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়।
সংশোধনী গ্রহণের পর স্পিকার বিলের দফা ও তফসিলগুলো সংসদের সামনে পেশ করেন। সংশোধিত আকারে বিভিন্ন দফা এবং তফসিল-২সহ বিলের অংশগুলো কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়।
এরপর বিলের শিরোনাম, দফা-১, প্রবর্তন এবং প্রস্তাবনা বিলের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। পরে অর্থমন্ত্রী বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে কণ্ঠভোটে অর্থ বিল, ২০২৬ পাস হয়।
সংশোধনীতে যা যা আছে : প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের প্রস্তাবে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ, বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং শুধু তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষাদানে নিয়োজিত বেসরকারি কলেজের আয়ের ওপর করহার ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সংশোধনী তালিকায় সেই প্রস্তাব যুক্ত হয়।
জমি নিবন্ধনের বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহার : প্রকৃত মূল্য ও মৌজা মূল্যের পার্থক্য নিরসনের নামে অর্থবিলে একটি বিশেষ বিধান রাখা হয়েছিল। তবে এটি কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে- এমন সমালোচনার মুখে পুরো বিধানই প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে জমি নিবন্ধন নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের অবসান ঘটেছে।
কোম্পানি করহার : কোম্পানি করহারের কাঠামোতেও পরিবর্তন এসেছে। যেসব পাবলিকলি ট্রেডেড কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার আইপিও, ডাইরেক্ট লিস্টিং, রাইট ইস্যু বা আরপিওর মাধ্যমে হস্তান্তরিত হয়েছে, তাদের করহার ২২ দশমিক ৫ শতাংশ রাখা হয়েছে। তবে সব লেনদেন ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে হলে করহার হবে ২০ শতাংশ।
পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশের কম শেয়ার বাজারে হস্তান্তরিত হয়েছে এমন পাবলিকলি ট্রেডেড কোম্পানির করহার ২৫ শতাংশ; সব লেনদেন ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে হলে তা হবে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যান্য কোম্পানির করহার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ; সব লেনদেন ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে হলে তা হবে ২৫ শতাংশ।
ব্যাংক, বীমা ও ফাইন্যান্স কোম্পানির ক্ষেত্রে পাবলিকলি ট্রেডেড কোম্পানির করহার ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং পাবলিকলি ট্রেডেড নয় এমন কোম্পানির করহার ৪০ শতাংশ রাখা হয়েছে।
তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারক কোম্পানির করহার ৪৫ শতাংশ এবং মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানির করহার ৪৫ শতাংশ রাখা হয়েছে। তবে মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানি পাবলিকলি ট্রেডেড হলে করহার হবে ৪০ শতাংশ।
মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইনের সংশোধনীতে নিবন্ধিত বা তালিকাভুক্ত ব্যক্তিকে প্রতি তিন কর মেয়াদ শেষে ১৫ দিনের মধ্যে দাখিলপত্র বা রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, ব্যাংক, বীমা এবং শূন্য রিটার্ন দাখিলকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তিন কর মেয়াদ শেষে ২০ দিনের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে পারবে।
কোনো ব্যক্তি চাইলে প্রতি কর মেয়াদে স্বেচ্ছায় রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন। জনস্বার্থে এনবিআর সুদ ও জরিমানা ছাড়া রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়াতে পারবে।
বিআইএন, অগ্রিম কর ও স্বর্ণ ব্যবসা : ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চলতি হিসাব বা এসটিডি হিসাব খোলা ও পরিচালনা, ব্যাংক বা এনবিএফআই থেকে ঋণ নেয়া, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা, বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদ নেয়া বা নবায়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ নেয়া এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বিআইএন বা তালিকাভুক্তির প্রমাণক বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আমদানিকৃত সেবাকে করযোগ্য সরবরাহ হিসেবে বিবেচনা করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের বিধান রাখা হয়েছে। এ ভ্যাট পরিশোধের দায় থাকবে সেবা গ্রহীতার ওপর। ব্যাংক বা অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান সেবা আমদানির মূল্য পরিশোধের সময় ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা দেবে।
খুচরা বিক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি বা সরবরাহের সময় উৎপাদনকারী, আমদানিকারক, সরবরাহকারী, পরিবেশক বা আড়তদারকে ০ দশমিক ২ শতাংশ হারে উৎসে অগ্রিম আয়কর সংগ্রহ করতে হবে। কর সংগ্রহ না করলে অনাদায়ী করের সমপরিমাণ অর্থ সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারী, আমদানিকারক, সরবরাহকারী, পরিবেশক বা আড়তদারকে পরিশোধ করতে হবে।
স্বর্ণ, রৌপ্য, স্বর্ণালংকার, রৌপ্যালংকার, রতœ-হীরা বা প্লাটিনাম ক্রয়-বিক্রয় ব্যবসায় নিয়োজিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ক্রয়মূল্যের ওপর ০ দশমিক ৫ শতাংশ উৎসে কর কর্তনের বিধান রাখা হয়েছে।
স্বর্ণ বা স্বর্ণালংকারে প্রতি ভরিতে ২ হাজার ৫০০ টাকা, রৌপ্য বা রৌপ্যালংকারে প্রতি ভরিতে ১০০ টাকা, প্লাটিনাম বা প্লাটিনামের অলংকারে প্রতি ভরিতে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং ডায়মন্ড বা ডায়মন্ডের অলংকারে প্রতি গ্রামে ২ হাজার ৫০০ টাকা ভ্যাট নির্ধারণ করা হয়েছে।
দ্রুত রিটার্নে প্রণোদনা, দেরিতে অতিরিক্ত কর : স্বাভাবিক ব্যক্তি ও হিন্দু অবিভক্ত পরিবার করদাতা ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ অথবা ২৫ হাজার টাকা, যেটি কম, সেই পরিমাণ কর প্রণোদনা পাবেন। ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিলে কোনো প্রণোদনা বা অতিরিক্ত কর থাকবে না। ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে রিটার্ন দাখিলে পরিশোধযোগ্য করের ২ শতাংশ অথবা ৩ হাজার টাকা, যেটি বেশি, সেই পরিমাণ অতিরিক্ত কর দিতে হবে।
১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে রিটার্ন দাখিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকা, যেটি বেশি, সেই পরিমাণ অতিরিক্ত কর প্রযোজ্য হবে।
যারা আগে কখনো রিটার্ন দেননি, তারা সংশ্লিষ্ট করবর্ষের জন্য প্রযোজ্য হারে আয়কর দিয়ে আয়বর্ষ শেষের পরবর্তী ৩০ জুনের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।
বিদেশে অবস্থানরত স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ফেরার ৯০ দিনের মধ্যে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ রাখা হয়েছে।
ফ্রিল্যান্সিং, এসএমই ও তামাকপণ্যে নতুন বিধান : কর অব্যাহতির তফসিলে ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন যুক্ত করা হয়েছে। নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মালিকানাধীন ক্ষুদ্র বা মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে বাৎসরিক টার্নওভার ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় কর অব্যাহতির বিধান রাখা হয়েছে। তবে শিল্পটি এসএমই ফাউন্ডেশনে নিবন্ধিত হতে হবে।
গোষ্ঠী বীমা পলিসি থেকে কর্মচারীর প্রাপ্ত অর্থ বা সুবিধাকে কর অব্যাহতির আওতায় আনা হয়েছে। সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্টে দানকৃত আয়কে কর রেয়াতযোগ্য দানের তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।
তামাকজাত পণ্যের নতুন শ্রেণি হিসেবে নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকোর জন্য করহার নির্ধারণ করা হয়েছে। নিকোটিন পাউচের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ গ্রামের খুচরা মূল্য ৫০০ টাকা ধরে করহার ৩৫ শতাংশ এবং হিটেড টোব্যাকোর ক্ষেত্রে ৬৭ শতাংশ হারের বিধান রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রস্তুত বিলাতি মদের ক্ষেত্রে প্রতি লিটার প্রæফে ৫০০ টাকা এবং অপ্রক্রিয়াজাত তামাকের ক্ষেত্রে প্রতি কেজিতে ৫০ টাকা নির্দিষ্ট ভ্যাট নির্ধারণ করা হয়েছে।
কাস্টমস ও কম্পিউটার যন্ত্রাংশ : কাস্টমস আইন সংশোধনে ওয়্যারহাউসে রাখা পণ্যের মালিককে যথাযথ কর্মকর্তাকে সার্বিক সহযোগিতা করার বিধান রাখা হয়েছে। কর্মকর্তা ওয়্যারহাউস বা প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে প্রবেশে অসহযোগিতার মুখে পড়লে প্রয়োজনে তালা ভেঙে বা অন্য যে কোনো উপায়ে প্রবেশ করতে পারবেন।
কাস্টমস তফসিলে পারসোনাল ডেস্কটপ কম্পিউটার এবং প্রসেসিং ইউনিটের জন্য পৃথক এইচএস কোড রাখা হয়েছে। পারসোনাল ডেস্কটপ কম্পিউটার ও প্রসেসিং ইউনিটের ক্ষেত্রে শূন্য শতাংশ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ শুল্কহার রাখা হয়েছে।
