কুড়িগ্রাম নদ-নদীর পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
কাগজ প্রতিবেদক, কুড়িগ্রাম, রাজারহাট ও নাগেশ্বরী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কুড়িগ্রামে উজান থেকে আসা ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে দুধকুমার নদের পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। নাগেশ্বরী উপজেলার মুড়িয়ারহাট এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করায় ওই উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের প্রায় ১৫-২০ গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পাউবোর বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, নদনদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ধরলা নদীর পানি কুড়িগ্রাম পয়েন্টে বিপৎসীমার ০ দশমিক ৩৮ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে ০ দশমিক ৭ সেন্টিমিটার ও চিলমারী পয়েন্টে ৬২ সেন্টিমিটার এবং তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
তবে দুধকুমার নদের পানি পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম সদর, নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী ও রৌমারী উপজেলায় আকস্মিক পানি বৃদ্ধির কারণে বীজতলা, পাট ও শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। কুড়িগ্রাম কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, লাগাতার বৃৃষ্টিপাতের মাঝে মুড়িয়ারহাট এলাকার বেড়িবাঁধে ফাটল দেখা দিলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড সঠিক সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাটি সংস্কার না করায় গত রবিবার দুপুরের পর বাঁধের ওই অংশটি ভেঙে যায় এবং নদীর পানি দ্রুত লোকালয়ে প্রবেশ করে।
বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুল মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, মিয়াপাড়া ও মুড়িয়ারহাট এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে এবং কয়েকটি স্থানে বাঁধ উপচে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। এতে প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
রাজারহাট উপজেলার নাজিমখানের পলাশপুর, ঘড়িয়ালডাঙ্গার বুড়িরহাট, বিদ্যানন্দের তৈয়ব খাঁ ও রামহরি এলাকাসহ অন্তত ১০ গ্রামের হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। একই সঙ্গে চরাঞ্চলের বীজতলা, পাট, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল তলিয়ে গেছে।
গতকাল সোমবার দুপুরে পাউবো সূত্রে জানা গেছে, উজানের ঢলে জেলার সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। তিস্তা নদীর বিপৎসীমা ২৯.৩১ মিটার। তিস্তার কাউনিয়া পয়েন্টে সকাল ৬টায় পানি ছিল ২৯.০০ মিটার, যা বেড়ে দুপুর ১২টায় ছিল ২৯.২৯ মিটার এবং বিকেল ৩টায় ২৯.৩০ মিটারে পৌঁছেছে। বর্তমানে পানি বিপৎসীমার মাত্র ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫২.০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা নদীর পানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পানি বৃদ্ধির ফলে চরের পাট, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল তলিয়ে গেছে বলে রাজারহাট কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টিতে তিস্তা নদীর পানি বেড়ে বুড়িরহাট, তৈয়ব খাঁ ও বিদ্যানন্দ এলাকার কিছু অংশ ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ বিলম্বিত হওয়ায় এবং বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় পানি দ্রুত লোকালয়ে প্রবেশ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
নদী তীরবর্তী বাসিন্দা নূর আমীন জানান, ইতোমধ্যে জলিল ও নূর ইসলাম তাদের ঘরবাড়ি সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেয়ার চেষ্টা করছেন। নিম্নাঞ্চলের অধিকাংশ পরিবারের ঘরে পানি ঢুকে পড়ায় তারা দুর্ভোগে পড়েছেন।
যাবর আলী দুঃখ প্রকাশ করেন, আমার বাড়ি ইতোমধ্যে তিনবার নদীতে ভেঙে গেছে। এখন আবার পানি বাড়ছে। ভারি বৃষ্টি হলে এবারও বাড়ি রক্ষা করা কঠিন হবে। আর একবার ভাঙলে আমরা পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে যাব।
বুড়িরহাট এলাকার ভাণ্ডার জামে মসজিদের ইমাম বলেন, মসজিদটি নদীর খুব কাছাকাছি। পানি এভাবে বাড়তে থাকলে এবং ভারি বৃষ্টি হলে মসজিদেও পানি ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
নাগেশ্বরীতে চর ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত : নাগেশ্বরীতে বৃষ্টি ও উজানের ঢলে বৃদ্ধি পেয়েছে সকল নদনদীর পানি। তলিয়ে গেছে নদনদী অববাহিকার চরাঞ্চলীয় নিম্নাঞ্চল। বড় বন্যার আশঙ্কা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে বৃদ্ধি পেয়েছে দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গাধর, শংকোষ, ফুলকুমারের পানি। ইতোমধ্যে পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে দুধকুমারের পানি। নুনখাওয়া পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই। একইভাবে অন্যান্য নদনদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়ে তীব্র স্রোতে প্রবাহিত হচ্ছে। বামনডাঙ্গার তেলিয়ানীকুটিতে, বড়মানি ও মুড়িয়ারহাটে দুধকুমারের কুল উপচে তীব্র স্রোতে লোকালয়ে ঢুকছে পানি। তলিয়ে গেছে নদনদী অববাহিকার চরাঞ্চলীয় বল্লভেরখাসের ফান্দের চর, বামনডাঙ্গার বড়মানী, তেলিয়ানী, মুড়িয়ারহাট, চর লুছনি, কেদারের চর বিষ্ণুপুর, কাচাকাটার ধনিরামপুর শোলমারি, নুনখাওয়ার চর কাপনা, কালিকাপুর, চর পাটতলা, ব্যাপারীর চর, নারায়ণপুরের পদ্মারচর, ঝাউকুটি, মাঝিয়ালী, মীরকামারীসহ অনেক চরাঞ্চলীয় এলাকা। এসব এলাকায় তলিয়ে গেছে অনেক রাস্তা ঘাট। বামনডাঙ্গার আয়নালের ঘাট এলাকার আব্দুল ওহাব, অলিদ হাসান, ইমান আলী, মাঝিয়ালীর আলী হোসেন, শোলমারীর জিয়াউল হক জানান এভাবে পানি বাড়তে থাকলে দেখা দিবে বন্যা। তখন আমাদের ভোগান্তিতে পড়তে হবে। রোপা আমন বীজতলা নিয়েও আমরা শঙ্কিত।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান, উজানের ঢল ও ভারি বৃষ্টির কারণে জেলার নদনদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। দুধকুমার নদের পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের একটি নিচু সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় সেখান দিয়ে পানি লোকালয়ে ঢুকছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জিও ব্যাগ নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথের সঙ্গে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে কথা হলে তিনি বলেন, প্লাবিত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জরুরি সহায়তা হিসেবে দুই লাখ টাকা এবং শুকনো খাবার প্রস্তুত রয়েছে । এ ছাড়াও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রতিটি উপজেলার জন্য এক হাজার করে জিও ব্যাগ সংরক্ষণ করা হয়েছে।
