×

প্রথম পাতা

উজ্জ্বল তারার মলিন বিদায়

Icon

আজিজুর রহমান জিদনী

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

উজ্জ্বল তারার মলিন বিদায়

এটাই শেষ বিশ্বকাপ আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। তাই শেষটা বিশ্বকাপ জয় দিয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকুক- শুধু তারই নয়, চাওয়া ছিল দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে থাকা তার অগণিত ভক্তদের। তবে সেই আশা গত সোমবার রাতে চুরমার হয়ে যায় স্পেনের সঙ্গে হার দিয়ে। ৬ বিশ্বকাপের অনন্য কীর্তি নিয়েও অপূর্ণ রয়ে যায় তার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন। সেই রাতে কাঁদেন নিজেও কাঁদান পুরো পর্তুগালকে। হ্যাঁ, এতক্ষণ যার কথা হচ্ছে তিনি আর কেউ নন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, যার পায়ের জাদুতে মুগ্ধ কোটি ফুটবল দর্শক। সি আর-৭ হিসেবেও রয়েছে যার পরিচিতি।

চার দশকেরও বেশি সময়ের জীবনের অভিজ্ঞতা, দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্বফুটবলের শীর্ষ মঞ্চে রাজত্ব, অগণিত গোল, অসংখ্য রেকর্ড আর কোটি ভক্তের আবেগ- সবকিছুর পরও বিশ্বকাপ নামের মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়টি লিখতে পারলেন না ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে পর্তুগাল। আর সেই সঙ্গেই শেষ হয়ে গেল ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসরে ৪১ বছর বয়সী রোনালদোর দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য পথচলা। যে ম্যাচটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই অতিরিক্ত সময়ে গড়াবে বলে মনে হচ্ছিল, তার ভাগ্য বদলে যায় নির্ধারিত সময়ের যোগ করা প্রথম মিনিটে। বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনোর ঠাণ্ডা মাথার নিখুঁত ফিনিশে জয় নিশ্চিত করে স্পেন। শেষ বাঁশি বাজার পর একা, নিঃশব্দে ও চোখের জল লুকাতে না পেরে মাঠ ছেড়ে যান রোনালদো। বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা অধ্যায়ের সমাপ্তিটা হয় হৃদয়বিদারক। স্পেনের জন্য এই জয় শুধু কোয়ার্টার ফাইনালের টিকেটই নয়, আরেকবার শিরোপা জয়ের দাবিকে আরো শক্তিশালী করল। শেষ আটে তাদের প্রতিপক্ষ হবে বেলজিয়াম। শেষ মুহূর্তের ভুলেই ভাঙল পর্তুগালের প্রতিরোধ।

ম্যাচজুড়ে দুই দলই ছিল বেশ সতর্ক। বলের দখলে এগিয়ে থেকেও স্পেন খুব বেশি পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। অন্যদিকে ব্রুনো ফার্নান্দেস, বের্নার্দো সিলভা কিংবা রোনালদো- কেউই আক্রমণে কাক্সিক্ষত প্রভাব ফেলতে পারেননি। লামিন ইয়ামাল কয়েকবার ডান প্রান্ত দিয়ে বক্সে ঢোকার চেষ্টা করলেও পর্তুগালের রক্ষণ তাকে আটকে রাখে।

ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে যোগ করা সময়ে। দ্রুত নেয়া একটি ফ্রি-কিকের সময় পর্তুগালের রক্ষণ মুহূর্তের জন্য মনোযোগ হারায়। সেই সুযোগে ফেরান তোরেস বল পেয়ে প্রথম স্পর্শেই ঘুরে দাঁড়িয়ে অসাধারণ একটি থ্রæ পাস বাড়ান মিকেল মেরিনোর উদ্দেশে। দেরিতে বক্সে ঢুকে নিখুঁত সময়জ্ঞান দেখিয়ে বল নেন মেরিনো। এরপর কাছের পোস্ট ঘেঁষে দুর্দান্ত শটে জাল খুঁজে নেন তিনি। এক মুহূর্তের সেই ভুলই বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দেয় পর্তুগালকে। ক্লাব ফুটবলে মাঝেমধ্যে স্ট্রাইকার হিসেবেও খেলেছেন মেরিনো। সেই অভিজ্ঞতারই নিখুঁত প্রয়োগ দেখা গেল তার গোলটিতে।

রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপে আলো ছিল কম, প্রশ্ন বেশি : ম্যাচের আগেই রোনালদো নিশ্চিত করেছিলেন, এটিই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ। যদিও শেষ অধ্যায়ে তিনি নিজের পরিচিত রূপে ফিরতে পারলেন না। স্পেনের বিপক্ষে পুরো ৯০ মিনিট খেলেও মাত্র ২০ বার বল স্পর্শ করেন তিনি। প্রথমার্ধে বল ছুঁয়েছিলেন মাত্র ১২ বার, যা মাঠে থাকা অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়েও কম। পুরো ম্যাচে স্পেনের বক্সে মাত্র তিনবার বল পেয়েছেন। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ওপর আগেরমতো চাপ সৃষ্টি করতে পারেননি, ড্রিবলিং কিংবা গতি- কোনোটিই দেখা যায়নি পরিচিত ধারায়। এবারের বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা ছিল তিনটি। গ্রুপ পর্বে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে করেছিলেন দুটি গোল। শেষ বত্রিশে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে করেছিলেন আরেকটি। কিন্তু নকআউট পর্বে ওপেন প্লে থেকে গোল করার অপেক্ষা আর শেষ হলো না।

যে পরিসংখ্যান বলছে কঠিন বাস্তবতা : রোনালদোর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের গৌরব যতটা উজ্জ্বল, নকআউট পর্বের পরিসংখ্যান ততটাই বিবর্ণ। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ১০ ম্যাচে ৭৪১ মিনিট খেলেও তার গোল মাত্র একটি, সেটিও পেনাল্টি থেকে। কোনো অ্যাসিস্টও নেই। এবারের বিশ্বকাপে তিনি মোট ১৭টি শট নিয়েছেন। অথচ সতীর্থদের জন্য একটি সুযোগও তৈরি করতে পারেননি। গত ৬০ বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোনো সুযোগ সৃষ্টি না করে এত বেশি শট নেয়ার নজির আর নেই। আরো বিস্ময়কর তথ্য হলো, বিশ্বকাপে নিজের শেষ ৯ ম্যাচে একবারও ড্রিবলিংয়ের চেষ্টা করেননি তিনি। সফল ড্রিবলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে টানা ১৫ বিশ্বকাপ ম্যাচ। নকআউট পর্বের কোনো ম্যাচেই তিনি কখনো অন-টার্গেটে দুইটির বেশি শট নিতে পারেননি।

তবু অর্জনের খাতায় তার নামই সবার ওপরে। বিশ্বকাপে ছয়টি ভিন্ন আসরে গোল করা ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার তিনি। মোট ১১ গোল নিয়ে পর্তুগালের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলদাতা। ২৭ ম্যাচ খেলে তিনি এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা ফুটবলার; তার ওপরে আছেন শুধু আরেক লিজেন্ড ফুটবলার লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বয়সী গোলদাতা ও নকআউট পর্বের সবচেয়ে বেশি বয়সে গোল করা খেলোয়াড়ও এখন রোনালদো।

কেন রামোসকে নামালেন না? ব্যাখ্যা মার্তিনেজের : পরাজয়ের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, কেন পুরো ম্যাচ খেলানো হলো ৪১ বছর বয়সী রোনালদোকে? আগের ম্যাচে বদলি নেমে গোল করা গনসালো রামোসকে কেন এক মিনিটও সুযোগ দেয়া হলো না? সংবাদ সম্মেলনে সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেন কোচ রবের্তো মার্তিনেজ। তার ভাষায়, একটি গোলের জন্য যখন দল লড়াই করছে, তখন রোনালদোর মতো খেলোয়াড়কে তুলে নেয়ার কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। শুধু গোল নয়, তার উপস্থিতিই প্রতিপক্ষের রক্ষণে বাড়তি চাপ তৈরি করে। সেট পিস কিংবা বক্সের ভেতরে যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয়ার সামর্থ্য তার আছে বলেই বিশ্বাস করেন তিনি। মার্তিনেজ বলেন, অতিরিক্ত সময়ে গেলে রামোসকে ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ম্যাচ শেষ হয়ে যায় যোগ করা সময়েই।

বিশ্বকাপ শেষ, শেষ মার্তিনেজ অধ্যায়ও : পরাজয়ের পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন মার্তিনেজ। নিশ্চিত করেন, পর্তুগালের কোচ হিসেবে এটিই ছিল তার শেষ ম্যাচ। গত ২০২৩ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর ইউরোতে কোয়ার্টার ফাইনাল, পরে নেশন্স লিগের শিরোপা জিতলেও বিশ্বকাপে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি তিনি। তার ভাষায়, তিনি পর্তুগালে বিশ্বকাপ জিততে এসেছিলেন। সেই লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার আর কোনো মানে দেখছেন না। বিশ্বকাপের অন্যতম শক্তিশালী স্কোয়াড নিয়েও শেষ ষোলো পার হতে না পারায় সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। তবে দলের অধিনায়ক রোনালদো শেষ মুহূর্তেও কোচের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, মার্তিনেজ শুধু একজন ভালো কোচ নন, একজন অসাধারণ মানুষও। পর্তুগালের জন্য তিনি যা করেছেন, তার প্রশংসা প্রাপ্য। তার সঙ্গে কাজ করা ছিল দারুণ এক অভিজ্ঞতা।

বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে গর্ব-আক্ষেপও : ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলতে গিয়ে রোনালদো বলেন, ম্যাচটি যেকোনো দিকেই যেতে পারত। তবে শেষ মুহূর্তে স্পেন ভাগ্যের সহায়তা পেয়েছে। বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়ে হতাশা প্রকাশ করলেও নিজের সর্বোচ্চটা দেয়ার তৃপ্তির কথাও জানান তিনি। রোনালদো বলেন, তিনি পরিষ্কার বিবেক নিয়েই বিদায় নিচ্ছেন। এটাই ছিল তার শেষ বিশ্বকাপ। এখন পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে চান। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের বিষয়ে এখনই কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেবেন না। তার কণ্ঠে ছিল আক্ষেপ, আবার গর্বও। বড় টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় সব সময়ই কষ্টের, কিন্তু দল মাথা উঁচু করেই মাঠ ছেড়েছে বলে মনে করেন তিনি। প্রসঙ্গত, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো হয়তো আর কখনো বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরবেন না। কিন্তু ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম ফুটবলার, পর্তুগালের সর্বকালের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলদাতা ও কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠা এই কিংবদন্তির নাম বিশ্বকাপের ইতিহাসে চিরকালই লেখা থাকবে অনন্য উচ্চতায়। তার শেষ ম্যাচটি জয়ের গল্প হয়ে ওঠেনি, কিন্তু তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হয়েই থাকবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ট্রাকের পেছনে মোটরসাইকেলের ধাক্কা, প্রাণ গেল এনসিপি নেতার

ট্রাকের পেছনে মোটরসাইকেলের ধাক্কা, প্রাণ গেল এনসিপি নেতার

মিরসরাইয়ের সব ঝরনায় পর্যটক প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ

মিরসরাইয়ের সব ঝরনায় পর্যটক প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ

পাহাড়ধসের শঙ্কায় সাজেক ভ্যালি বন্ধ, সড়ক ও নৌযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

পাহাড়ধসের শঙ্কায় সাজেক ভ্যালি বন্ধ, সড়ক ও নৌযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

ভারী বর্ষণে থানচিতে আটকে পড়া ৯০ পর্যটক উদ্ধার

ভারী বর্ষণে থানচিতে আটকে পড়া ৯০ পর্যটক উদ্ধার

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App