×

প্রথম পাতা

শোকের মধ্যে আবারো কঠিন বার্তা দিলো ইরান

Icon

মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শোকের মধ্যে আবারো কঠিন বার্তা দিলো ইরান

নিজেদের সক্ষমতা জানান দিতে ফের হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্ব ও প্রতিরোধ অক্ষের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখারও বার্তা দিয়েছে দেশটি। তেহরান বলেছে, প্রয়োজন হলে মুসলিম দেশগুলোকে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহসহ রাজনৈতিক সমর্থন দেয়া হবে।

ইরান এমন এক সময় এই বার্তা দিল, যখন ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানে নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরবিরারে সদস্যদের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান চলছে। যেখানে প্রিয় নেতা খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসে বুকে আঘাত করে মাতম করছেন লাখ লাখ মানুষ। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্পের প্রতিকৃতিতে প্রতীকীভাবে পাথর নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটছে। ভয় ভেঙে ইরানের সাধারণ মানুষ যেন বলতে চাইছেন- আমরা ঐক্যবদ্ধ। বহিরাগত (যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল) শক্তির কাছে মাথা নত করবে না তেহরান।

এমন আবহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেছেন, ‘আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় লাখ লাখ ইরানি সমবেত হচ্ছেন। কোনো হুমকিতে তারা বা আমাদের সশস্ত্র বাহিনী- কেউই পিছু হটবে না। আপনারা আপনাদের স্বাক্ষরকে সম্মান করুন। হুমকি অব্যাহত থাকলে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনা শুরু হবে না।’ এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। গতকাল মঙ্গলবার এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে ইরানের আধাসরকারি সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ। এছাড়া ওয়াশিংটনকে অবিশ্বস্ত আখ্যা দিয়ে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের কোনো শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক নেই। আর ইসরায়েলকে কখনোই স্বীকৃতি দেবে না ইরান।’

গালিবাফ বলেন, ‘ইরান মুসলিম বিশ্ব ও প্রতিরোধ অক্ষের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখবে। প্রয়োজন হলে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করবে এবং দরকার হলে রাজনৈতিক সমর্থনও দেবে।’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ইরান তার মূল দাবি থেকে সরে আসেনি। ওই দাবির মধ্যে ছিল ইরানের আঞ্চলিক মিত্র এবং প্রতিরোধ অক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করা। যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকে এ বিষয়টি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। ইরান আলোচনায় চূড়ান্ত কিছু সীমারেখা টেনে দিয়েছে। আলোচনার পুরোটা সময় তা বজায় রাখা হয়েছে।’ গাজা যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় ধাপটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করারও প্রতিশ্রুতি দেন গালিবাফ। গত রবিবার তেহরানে হামাসের শুরা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ দারবিশের সঙ্গে বৈঠকে এসব কথা বলেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।

অপরদিকে সোমবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র হয় ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাবে, অথবা তাদের শেষ করে দেব। আমরা এক ঘণ্টার মধ্যে তাদের সেতুগুলো ভেঙে ফেলতে পারি। আমরা তাদের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারি। তাদের কাছে এখন কোনো টাকা নেই। আমরা তাদের কোনো টাকা দিইনি।’ এদিকে খামেনির দাফন প্রক্রিয়ার মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। সোমবার মধ্যরাতে এ হামলার ঘটনা ঘটে। মঙ্গলবার দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, হামলায় দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সামুদ্রিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সোমবার জানিয়েছে, তারা একটি তেলবাহী জাহাজের কাছ থেকে প্রতিবেদন পেয়েছে। জাহাজটি হরমুজ প্রণালিতে ওমান উপকূলের কাছ দিয়ে দক্ষিণমুখী যাত্রা করছিল। এ সময় একটি অজ্ঞাত প্রক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানান, আরেকটি বাণিজ্যিক জাহাজও ইরানের নিক্ষেপ করা একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, হামলার ফলে জাহাজগুলোর ইঞ্জিন রুমে আগুন লাগে এবং চারদিকে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে না। জাহাজটির সব নাবিক নিরাপদে জাহাজের ডান পাশে একত্রিত হয়েছেন।

গত সোমবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল একটি রেকর্ডিংয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড সামুদ্রিক রেডিওর মাধ্যমে জাহাজগুলোকে সতর্ক করেছে। তারা বলেছে, ‘নির্দেশনা অমান্য করলে আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আপনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালাতে প্রস্তুত।’

হরমুজ প্রণালিতে হামলা বন্ধ রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া ৬০ দিনের চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পরপরই এ নিয়ে দুইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে তিন সপ্তাহেরও কম সময় আগে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা যায়নি। যদিও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্তেজনার জেরে ওয়াশিংটন ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালাতে পারে।

এর আগে সম্প্রতি ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এভার লাভলি’-তে ড্রোন হামলা চালায় ইরান। এ ঘটনাকে ভালোভাবে নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিবাদে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায় দেশটি। এরপর উপসাগরীয় দেশ বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন স্থাপনায় আঘাত হেনে পাল্টা জবাব দেয় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। এই হামলাকে কেন্দ্র করে স্ফূলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছিল মধ্যপ্রাচ্যে।

উল্লেখ্য, ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানাতে তার মরদেহ কোম নগরীতে পৌঁছে গতকাল মঙ্গলবার। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে শোকমিছিলে অংশ নিতে সমবেত হন লাখ লাখ শোকার্ত ইরানি। এর আগের দুইদিন তেহরানে জানাজা ও শোকমিছিল হয়। রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি অনুযায়ী আজ বুধবার কফিন নেয়া হবে প্রতিবেশী দেশ ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখান থেকে শোকযাত্রা হবে নাজাফ ও কারবালা শহরে। সেখানেও শোকাহত মানুষ তার প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানাবেন এবং জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে ৯ জুলাই জন্মস্থান ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে তাকে দাফন করার কথা রয়েছে।

টানা ৩৬ বছর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ইরানের সীমানা ছাড়িয়েও তার প্রভাব ছিল বিস্তৃত। মুসলিম বিশ্বের অনেকের কাছে তিনি ছিলেন বিদেশি আধিপত্যবিরোধী প্রতিরোধের এক জোরালো কণ্ঠস্বর। তিনি বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, ‘প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব তখনই, যখন জাতিগুলো নিজেদের মানুষ, নিজেদের জ্ঞান, নিজেদের সংস্কৃতি ও নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা রাখবে।’

ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে বিরোধের জেরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। অভিযানের প্রথম দিনই তেহরানে স্ত্রী, পুত্রবধূ এবং নাতনিসহ নিহত হন খামেনি। তেহরান ও কোম নগরীতে শোকমঞ্চে জমায়েত হওয়া লাখ লাখ মানুষের চোখে অশ্রু থাকলেও, সেই অশ্রুর ভেতরেই লুকিয়ে ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ, রুদ্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার দৃঢ়তা এবং শোককে শক্তিতে পরিণত করার বিপ্লবী ঐক্যের এক নতুন বার্তা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ট্রাকের পেছনে মোটরসাইকেলের ধাক্কা, প্রাণ গেল এনসিপি নেতার

ট্রাকের পেছনে মোটরসাইকেলের ধাক্কা, প্রাণ গেল এনসিপি নেতার

মিরসরাইয়ের সব ঝরনায় পর্যটক প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ

মিরসরাইয়ের সব ঝরনায় পর্যটক প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ

পাহাড়ধসের শঙ্কায় সাজেক ভ্যালি বন্ধ, সড়ক ও নৌযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

পাহাড়ধসের শঙ্কায় সাজেক ভ্যালি বন্ধ, সড়ক ও নৌযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

ভারী বর্ষণে থানচিতে আটকে পড়া ৯০ পর্যটক উদ্ধার

ভারী বর্ষণে থানচিতে আটকে পড়া ৯০ পর্যটক উদ্ধার

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App