কলম্বিয়াকে হারিয়ে ৭২ বছর পর শেষ আটে সুইজারল্যান্ড
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের নামটি বরাবরই পরিচিত। নিয়মিত অংশগ্রহণ করলেও শেষ আট যেন তাদের জন্য অধরাই থেকে গিয়েছিল। ১৯৫৪ সালের পর আর কখনো কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে পারেনি ইউরোপের দেশটি। অবশেষে সেই দীর্ঘ ৭২ বছরের অপেক্ষার অবসান হলো। কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠিত শেষ ষোলোর ম্যাচে কলম্বিয়াকে টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে সুইসরা। নির্ধারিত ৯০ মিনিট ও অতিরিক্ত ৩০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর স্নায়ুর লড়াইয়ে হাসে মুরাত ইয়াকিনের দল।
ম্যাচটি ছিল কৌশল, ধৈর্য ও রক্ষণভাগের লড়াই। বলের দখল ও আক্রমণে এগিয়ে ছিল কলম্বিয়া। লুইস দিয়াজ, কেভিন পুয়ের্তা ও কাম্পাসদের নেতৃত্বে লাতিন আমেরিকার দলটি একের পর এক আক্রমণ গড়লেও প্রতিবারই দেয়াল হয়ে দাঁড়ান সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড অপেক্ষা করেছে প্রতিপক্ষের ভুলের জন্য। আক্রমণের সংখ্যা কম হলেও রক্ষণে ছিল দুর্দান্ত শৃঙ্খলা।
প্রথম উল্লেখযোগ্য সুযোগ আসে ২১ মিনিটে। কেভিন পুয়ের্তার বাঁকানো শট দুর্দান্ত ঝাঁপিয়ে ফিরিয়ে দেন কোবেল। দ্বিতীয়ার্ধে সুইজারল্যান্ডও গোলের খুব কাছে গিয়েছিল। দান এনদোয়ের নিখুঁত পাসে জিব্রিল সো ফাঁকা অবস্থায় বল পেলেও তার শট অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়। ৬৪ মিনিটে কলম্বিয়ার লুইস দিয়াজও দারুণ সুযোগ নষ্ট করেন।
ম্যাচ যত শেষের দিকে এগিয়েছে, দুই দলই ঝুঁকি কমিয়ে রক্ষণভাগ শক্ত করেছে। ফলে নির্ধারিত সময় শেষ হয় গোলশূন্য সমতায়। অতিরিক্ত সময়েও কলম্বিয়াই ছিল অপেক্ষাকৃত আক্রমণাত্মক। ১১৬ মিনিটে সুইস রক্ষণভাগের ভুলে গোলরক্ষকের সঙ্গে একা হয়ে যান কাম্পাস। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে লক্ষ্যভ্রষ্ট করেন তিনি। সেই মিসই শেষ পর্যন্ত কলম্বিয়ার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
এরপর ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব যায় টাইব্রেকারে। প্রথম কয়েকটি শট সফলভাবে নেয় দুই দল। কিন্তু কলম্বিয়ার দ্বিতীয় শট বারের ওপর মারেন দাভিনসন সানচেজ। এরপর কুচো হার্নান্দেজের শট দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন কোবেল। সুইজারল্যান্ডের হয়ে কেবল মানুয়েল আকাঞ্জি একবার ব্যর্থ হন। শেষ শটে গোল করলেই ইতিহাস গড়বে সুইসরা- এই সমীকরণ সামনে রেখে এগিয়ে আসেন বদলি খেলোয়াড় রুবেন ভার্গাস। অসাধারণ আত্মবিশ্বাসে বল জালে জড়িয়ে পুরো সুইজারল্যান্ডকে উৎসবে ভাসান তিনি।
টাইব্রেকারের এই জয় শুধু একটি ম্যাচ জেতা নয়, সুইজারল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ১৯৩৪, ১৯৩৮ ও ১৯৫৪ সালের পর এবার চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ আটে উঠল তারা। তবে আধুনিক বিশ্বকাপ যুগে এটি তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।
ম্যাচ শেষে উচ্ছ¡াস লুকাতে পারেননি সুইজারল্যান্ডের কোচ মুরাত ইয়াকিন। তিনি বলেন, এটি আমাদের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমরা দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাফল্য অর্জন করেছি। তবে আমাদের যাত্রা এখানেই শেষ নয়। আমরা আরো এগিয়ে যেতে চাই। কোচের মতে, ম্যাচের প্রতিটি ছোট সিদ্ধান্ত, বদলি খেলোয়াড় নামানো এবং রক্ষণাত্মক পরিকল্পনা ঠিকভাবে কাজে লেগেছে।
বিশেষ করে রুবেন ভার্গাসকে দ্বিতীয়ার্ধের শেষ দিকে মাঠে নামানোর সিদ্ধান্তটি হয়ে ওঠে ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। ইউরো ২০২৪-এ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টাইব্রেকারের হতাশা বয়ে বেড়ানো এই উইঙ্গার এবার জয়সূচক পেনাল্টি নিয়ে বলেন, নিজের ওপর বিশ্বাস ছিল। বল জালে জড়ানোর মুহূর্তটি কখনো ভুলব না।
অন্যদিকে কলম্বিয়ার জন্য এটি হতাশার বিদায়। পুরো ম্যাচে ১৫টি শট, ৭টি কর্নার এবং একাধিক পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করেও গোল করতে পারেনি তারা। বিশেষ করে অতিরিক্ত সময়ে কাম্পাসের গোল মিস এবং টাইব্রেকারে সানচেজ ও হার্নান্দেজের ব্যর্থতা তাদের স্বপ্ন ভেঙে দেয়।
এখন সুইজারল্যান্ডের সামনে আরো বড় পরীক্ষা। কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। মিসরের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করে শেষ আটে ওঠা লিওনেল মেসির দলই এখন সুইসদের পরবর্তী বাধা। ১২ জুলাই বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় ক্যানসাস সিটিতে হবে বহুল প্রতীক্ষিত এই লড়াই।
ইতিহাস বলছে, আর্জেন্টিনা নিঃসন্দেহে ফেবারিট। তবে কলম্বিয়ার মতো শক্তিশালী দলকে টাইব্রেকারে হারিয়ে সুইজারল্যান্ড বুঝিয়ে দিয়েছে, তাদের হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। ৭ দশকের অপেক্ষা শেষে ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লেখা দলটি এবার আরো বড় স্বপ্ন নিয়েই নামবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে। আর সেই লড়াইয়ে নতুন কোনো বিস্ময় উপহার দিতে পারলে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চমকগুলোর একটি হয়ে থাকবে সুইসদের এই অভিযান।
