মেসি ম্যাজিকে অদম্য আর্জেন্টিনা
মুহাম্মদ রুহুল আমিন
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মাত্র ১৩ মিনিট। ফুটবলের ইতিহাসে কখনো কখনো এতটুকু সময়ই যথেষ্ট একটি ম্যাচ নয়, পুরো বিশ্বকাপের গল্প বদলে দিতে। আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে সেটিই করে দেখাল আর্জেন্টিনা। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে জিতে পৌঁছে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে। এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের কেন্দ্রে ছিলেন লিওনেল মেসি- শুরুতে পেনাল্টি মিস করেও পরে একটি গোল, একটি অ্যাসিস্ট এবং পুরো দলের অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে ওঠেন তিনি।
ম্যাচের আগে ফেবারিট ছিল আর্জেন্টিনাই। তবে মোহাম্মদ সালাহর নেতৃত্বে মিসর শুরু থেকেই শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ ও দ্রুত পাল্টা আক্রমণে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের চাপে ফেলে। ১৫ মিনিটে মারাওয়ান আত্তিয়ার ক্রস থেকে ইয়াসের ইব্রাহিমের শক্তিশালী হেডে এগিয়ে যায় আফ্রিকার দলটি। গোল হজমের পরই সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা। নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে ফাউল করলে পেনাল্টি পান মেসিরা। কিন্তু মোস্তফা শুবির দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন মেসির স্পট কিক। চলতি বিশ্বকাপে এটি ছিল মেসির দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস।
এরপর আক্রমণের পর আক্রমণ চালায় আর্জেন্টিনা। ২৮ মিনিটে ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড, ৩১ মিনিটে মেসির ফ্রি-কিক পোস্টে লাগা এবং ৩৯ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেসের নিশ্চিত গোল- সবই রুখে দেন শুবির। প্রথমার্ধে বল দখল, শট ও আক্রমণে এগিয়ে থেকেও ১-০ ব্যবধানে পিছিয়েই বিরতিতে যেতে হয় স্কালোনির দলকে।
প্রথম ৪৫ মিনিটের পরিসংখ্যানও ছিল আর্জেন্টিনার পক্ষেই। বলের দখল, পাসের সফলতা, আক্রমণের সংখ্যা ও গোলমুখে শট- প্রায় সব সূচকেই এগিয়ে ছিল তারা। কিন্তু ফুটবলে পরিসংখ্যানের চেয়ে কার্যকারিতাই শেষ কথা। সেই জায়গায় মিসর ছিল নিখুঁত। সীমিত সুযোগকে তারা গোলে পরিণত করেছে, আর গোলরক্ষক মোস্তফা শুবির একাই যেন আর্জেন্টিনার সামনে অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। পেনাল্টি ঠেকানোর পাশাপাশি ম্যাক অ্যালিস্টার, আলভারেস ও মেসির একাধিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে প্রথমার্ধের অন্যতম নায়ক হয়ে ওঠেন তিনি।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার খেলায় আক্রমণের বৈচিত্র্য থাকলেও শেষ মুহূর্তের ফিনিশিংয়ে ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। কখনো পোস্ট, কখনো শুবির, আবার কখনো শেষ পাসের সামান্য ভুল- সব মিলিয়ে হতাশা বাড়ছিল আলবিসেলেস্তেদের। অধিনায়ক মেসির মুখেও তখন হতাশার ছাপ স্পষ্ট। তবে স্কালোনির দলকে দেখে মনে হয়নি তারা আত্মবিশ্বাস হারিয়েছে। বিরতিতে খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষাতেও ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়। কারণ এই দলটি গত কয়েক বছরে বহুবার প্রমাণ করেছে, প্রতিকূল পরিস্থিতিই তাদের সেরাটা বের করে আনে। আর সেই বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয়ার্ধে রূপ নেয় বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় প্রত্যাবর্তনের মহাকাব্যে।
বিরতির পর আরো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা। ৫৮ মিনিটে মোস্তফা জিকো গোল করলেও ভিএআরে তা বাতিল হয়। তবে ৬৭ মিনিটে সালাহর নেতৃত্বে দুর্দান্ত পাল্টা আক্রমণ থেকে জিকো আবার গোল করে ব্যবধান ২-০ করেন। তখন মনে হচ্ছিল, বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিদায় কেবল সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয় ইতিহাস। ৭৯ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে মেসির নিখুঁত ক্রসে ক্রিস্তিয়ান রোমেরো হেডে ব্যবধান কমান। গোল করার পর উদযাপনে সময় নষ্ট না করে দ্রুত বল নিয়ে মাঝমাঠে ফেরেন তিনি, যেন সতীর্থদের মনে করিয়ে দেন- লড়াই এখনো শেষ হয়নি।
মাত্র চার মিনিট পরই জ্বলে ওঠেন মেসি। মিসরের ডি-বক্সে জটলার মধ্যে বাঁ পায়ের নিখুঁত প্লেসিংয়ে গোল করে ২-২ সমতা ফেরান তিনি। ম্যাচের গতি তখন পুরোপুরি আর্জেন্টিনার নিয়ন্ত্রণে। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে লাউতারো মার্তিনেসের মাপা ক্রসে এনসো ফের্নান্দেস দুর্দান্ত হেডে জয়সূচক গোল করলে আটলান্টা সাক্ষী হয় বিশ্বকাপের অন্যতম নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের।
এই জয়ের সবচেয়ে বড় স্থপতি ছিলেন মেসি। শুরুতে পেনাল্টি মিস করলেও মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে গোল করিয়েছেন, গোল করেছেন এবং পুরো ম্যাচে আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিংবদন্তিদের প্রকৃত পরিচয় যে ব্যর্থতার পর ঘুরে দাঁড়ানো, সেটিই আবার প্রমাণ করলেন তিনি।
ব্যক্তিগত অর্জনের খাতাও আরো সমৃদ্ধ করেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২১, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এটি ছিল তার ৩১তম বিশ্বকাপ ম্যাচ, আর টানা নবম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার অনন্য কীর্তিও এখন কেবল তার দখলে। এক আসরে আট গোল করে তিনি ছুঁয়েছেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি গিয়ের্মো স্তাবিলের প্রায় একশ বছরের পুরনো রেকর্ড। পাশাপাশি নকআউট পর্বে টানা ছয় ম্যাচে গোল করার নজিরও গড়েছেন তিনি। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও আবার শীর্ষে উঠে গেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তবে ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলের জয়কেই বড় করে দেখেছেন মেসি। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকার পর ঘুরে দাঁড়ানো সহজ নয়। কিন্তু এই দল কখনো হাল ছাড়ে না। আমরা শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস রেখেছি, লড়াই করেছি এবং তারই পুরস্কার পেয়েছি।
কোচ লিওনেল স্কালোনিও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘আমি চোখ তুলে তাকাতেও পারছি না। ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। কী অসাধারণ একদল খেলোয়াড়! তারা কখনো লড়াই ছেড়ে দেয় না।’ সতীর্থ হুলিয়ান আলভারেসও মেসির প্রশংসায় বলেন, ‘তিনি কিংবদন্তি, বিশ্বের সেরা, ইতিহাসের সেরা। তিনি যা করছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।’
শেষ বাঁশি বাজার পর আবেগের বিস্ফোরণ ঘটে। সতীর্থদের আলিঙ্গনে কাঁদতে থাকেন মেসি। গ্যালারিতেও অনেক সমর্থক চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। সেই আনন্দাশ্রæ ছিল শুধু কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার নয়, নিশ্চিত বিদায়ের মুখ থেকে ফিরে আসার স্বস্তি ও বিশ্বাসের প্রতীক।
স্কালোনির অধীনে গত কয়েক বছরে আর্জেন্টিনা বারবার প্রমাণ করেছে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই তারা সবচেয়ে ভয়ংকর। এই দলের শক্তি শুধু মেসির জাদু নয়; দলগত ঐক্য, আত্মবিশ্বাস এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রোমেরোর গোলের পর দ্রুত মাঝমাঠে ফিরে যাওয়া কিংবা এনসো ফের্নান্দেসের শেষ মুহূর্তের দৌড়- সবকিছুই সেই মানসিকতার প্রতিফলন।
এখন আর্জেন্টিনার সামনে কোয়ার্টার ফাইনালের চ্যালেঞ্জ। তবে মিসরের বিপক্ষে এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন শুধু শেষ আটে ওঠার গল্প হয়ে থাকবে না; বিশ্বকাপ ইতিহাসে স্মরণীয় এক মহাকাব্যিক ম্যাচ হিসেবেই জায়গা করে নেবে। কারণ, ফুটবল আবারো মনে করিয়ে দিল- শেষ বাঁশি বাজার আগে কোনো ম্যাচ শেষ হয় না। আর প্রতিপক্ষের নাম যদি হয় লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা, তাহলে অসম্ভবও অনেক সময় কেবল আরেকটি সম্ভাবনার নাম।
