ফাইনালের আগে আরেক ফাইনাল
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল বললেও অনেকের কাছে এটি আসলে ফাইনালেরই আরেক নাম। কারণ মুখোমুখি হচ্ছে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ছন্দে থাকা দুই পরাশক্তি- স্পেন ও ফ্রান্স। শেষ চারের এই লড়াইয়ে যে দল জিতবে, তারাই বিশ্বকাপ জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার হয়ে উঠবে- এমন বিশ্বাস শুধু সমর্থকদের নয়, ফুটবল-বিশ্লেষক থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দেরও।
এই বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় উদাহরণ বেলজিয়ামের গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া। কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয়ার পর তিনি অকপটেই বলেছেন,
স্পেন-ফ্রান্স সেমিফাইনালের জয়ী দলই সম্ভবত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে। স্পেনকে তিনি টুর্নামেন্টের সবচেয়ে শক্তিশালী দল বলেও উল্লেখ করেছেন। প্রতিপক্ষের এমন মূল্যায়নই বলে দিচ্ছে, ডালাসে কী অপেক্ষা করছে ফুটবল বিশ্বের জন্য।
দুই দলের সেমিফাইনালে ওঠার পথ ছিল ভিন্ন। ফ্রান্স শুরু থেকেই নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে। গ্রুপ পর্বে শতভাগ জয়, নকআউটে আত্মবিশ্বাসী ফুটবল- সব মিলিয়ে দিদিয়ের দেশমের দল খুব বেশি প্রশ্নের মুখে পড়েনি। অন্যদিকে স্পেনের শুরুটা ছিল ধাক্কা দিয়ে। নবাগত কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের পর সমালোচনায় পড়তে হয়েছিল কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে। স্পেনের বল দখলনির্ভর ফুটবল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু সেই সমালোচনার জবাব দিয়েছে মাঠের খেলাতেই। একের পর এক জয় তুলে নিয়ে ১৬ বছর পর আবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে তারা।
শুধু ফল নয়, খেলার ধরনেও দুই দলের পার্থক্য স্পষ্ট। স্পেন বলের নিয়ন্ত্রণে ম্যাচ পরিচালনা করতে ভালোবাসে। মাঝমাঠে রদ্রির নেতৃত্ব, লামিন ইয়ামালের সৃজনশীলতা, দানি ওলমোর গতিময়তা, ফাবিয়ান রুইসের কার্যকারিতা এবং বদলি বেঞ্চ থেকে মিকেল মেরিনোর প্রভাব- সব মিলিয়ে স্পেনের আক্রমণ ও মাঝমাঠ এখন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ইউনিটগুলোর একটি। পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ ষোলো এবং বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল- দুই ম্যাচেই বদলি নেমে জয়সূচক গোল করেছেন মেরিনো। এটি স্পেনের বেঞ্চ শক্তিরও বড় প্রমাণ।
অন্যদিকে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় অস্ত্র গতি। কিলিয়ান এমবাপ্পেকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আক্রমণভাগ যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। দ্রুত পাল্টা আক্রমণ, শারীরিক সক্ষমতা এবং শেষ তৃতীয়াংশে নিখুঁত ফিনিশিং- এই তিন শক্তিতেই এগিয়ে ফরাসিরা। তাই ম্যাচটি কেবল দুই দলের নয়, দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনেরও লড়াই। একদিকে ধৈর্য, বলের নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পিত আক্রমণ; অন্যদিকে গতি, শক্তি ও সরাসরি আঘাত।
স্পেনের আত্মবিশ্বাসের আরেকটি বড় ভিত্তি সা¤প্রতিক ইতিহাস। ২০২৪ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনাল এবং ২০২৫ সালের নেশন্স লিগের সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়েছিল স্পেন। তিন বছরের ব্যবধানে এবার তৃতীয়বারের মতো বড় মঞ্চে মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। সেই দুই জয় এখনো স্প্যানিশ শিবিরে মানসিক শক্তি জোগাচ্ছে। কোচ দে লা ফুয়েন্তেও বলেছেন, ফ্রান্সকে তারা সম্মান করেন, কিন্তু হারানোর সামর্থ্য নিয়েও তাদের কোনো সংশয় নেই।
স্পেনের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামালও তাকিয়ে আছেন এই ম্যাচের দিকে। বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোল না পেলেও ম্যাচসেরা হয়েছেন তিনি। ইউরোর সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে গোল করার স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে ইয়ামাল বলেছেন, এবারও তিনি গোল করতে চান। তবে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলের জয়ই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই এমন পরিণত মানসিকতা স্পেনকে আরো আত্মবিশ্বাসী করছে।
ফ্রান্সও অবশ্য জানে, স্পেনকে হারাতে হলে শুধু এমবাপ্পের জাদু যথেষ্ট হবে না। মাঝমাঠের লড়াই জিততে হবে, বলের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে হবে এবং স্পেনের ছোট ছোট পাসের ছন্দ ভাঙতে হবে। অন্যদিকে স্পেনের লক্ষ্য থাকবে ম্যাচের গতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ফরাসি আক্রমণকে যতটা সম্ভব বলবিহীন রাখা।
পরিসংখ্যানও এই লড়াইকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। একদিকে টানা উন্নতি করে সেমিফাইনালে ওঠা স্পেন, অন্যদিকে শুরু থেকেই ধারাবাহিক আধিপত্য দেখানো ফ্রান্স। একটি দল আত্মবিশ্বাস নিচ্ছে সা¤প্রতিক সাফল্য থেকে, অন্যটি নিজেদের বর্তমান ছন্দ থেকে। তাই এই ম্যাচে কৌশল, মানসিক দৃঢ়তা, বেঞ্চের কার্যকারিতা এবং মুহূর্তের সিদ্ধান্ত- সবকিছুরই সমান গুরুত্ব থাকবে।
আগামী ১৫ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় ডালাসে শুরু হবে বহুল প্রতীক্ষিত এই সেমিফাইনাল। বিশ্বকাপের নিয়মে এটি শেষ চারের ম্যাচ, কিন্তু উত্তেজনা, প্রত্যাশা, দুই দলের সা¤প্রতিক শক্তিমত্তা এবং শিরোপার সম্ভাবনা- সব বিবেচনায় ফুটবলবিশ্বের কাছে এটি নিঃসন্দেহে একটি আগাম ফাইনাল।
