×

প্রথম পাতা

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর

‘পাইলটের প্রশিক্ষণে ঘাটতি ও তত্ত্বাবধানে অভাব ছিল’

তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে তথ্য

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

‘পাইলটের প্রশিক্ষণে ঘাটতি ও তত্ত্বাবধানে অভাব ছিল’

স্কুলের আঙিনা থেকে আগুনে ঝলসে যাওয়া শরীর নিয়ে ৮/৯ বছরের শিশু কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে আসছে। তার ইউনিফর্ম পুড়ে দগ্ধ চামড়ার সঙ্গে মিশে গেছে। মর্মান্তিক এ দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত-বেদনার্ত হয়েছে পুরো জাতি। এমন দৃশ্য কেবল একজনের ক্ষেত্রেই ঘটেনি, ঘটেছে আরো অনেক শিশুর জীবনে। দগ্ধ শরীরের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে অনেক ছোট্ট শিশুর প্রাণ থেমে গিয়েছে। অনেকে এই যুদ্ধে জয়ী হলেও ভয়াবহ সেই দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কুঁকড়ে বেঁচে আছেন। বলছি, রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনার কথা। গত বছর ২১ জুলাই ঘটেছিল জাতিকে স্তম্ভিত করে দেয়ার মতো এই ঘটনা। আজ মঙ্গলবার সেই ঘটনার এক বছর পূর্ণ হচ্ছে। এই ঘটনায় ৩৬ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ২৮ জনই শিক্ষার্থী। যুদ্ধবিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও নিহত হন।

দিনটি সামনে রেখে এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ এবং আহত ব্যক্তিদের সুস্থতা কামনায় গতকাল সোমবার দোয়া ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসে এই দোয়া ও স্মরণসভা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়া একই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ১৬টি শাখায় দোয়া ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়।

দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসের অনুষ্ঠানে কলেজটির অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, শিক্ষার্থীরা তাদের হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের স্মরণ করতে এখানে হাজির হয়েছে। তারা নিহত সবার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছে। শিক্ষার্থীসহ যারা এ ঘটনায় আহত হয়েছেন, তাদের সুস্থতা কামনা করছে।

এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ এবং আহত ব্যক্তিদের প্রতি সংহতি জানাতে দুই দিনের কর্মসূচি নিয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। এর অংশ হিসেবে দুর্ঘটনাস্থলটি আজ সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে বলে জানান অধ্যক্ষ। তিনি বলেন, দুর্ঘটনাস্থলে স্কাউট ও রোভার সদস্যরা গার্ড অব অনার দেবেন। নিহত ব্যক্তিদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হবে। এক মিনিট নীরবতা পালন করা হবে। দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। স্মৃতিচারণার আয়োজন থাকবে। পাশাপাশি নিহত ব্যক্তিদের ছবি, বন্ধুদের লেখা স্মৃতিকথা ও বিভিন্ন বার্তা প্রদর্শন করা হবে। আয়োজনে অভিভাবকেরাও উপস্থিত থাকবেন।

এদিকে বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যুদ্ধ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় এর পাইলটের উড্ডয়ন প্রশিক্ষণের ঘাটতি ছিল বলে তদন্ত কমিশনের জমা দেয়া প্রতিবেদনে জানা যায়। একইসঙ্গে বিমানটির পাইলটের গ্রাউন্ড সুপারভাইজার বা অফিসার কমান্ডিংয়ের যথাযথ ও পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধানের অভাব ছিল বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ভয়াবহ এই বিমান দুর্ঘটনার পরপরই তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক সচিব এ কে এম জাফর উল্লা খানকে প্রধান করে ৯ সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। ৩ মাসেরও বেশি সময় ধরে তদন্ত শেষে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ওই তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয় কমিশন। সেই প্রতিবেদনে বিধ্বস্ত বিমানটি উড্ডয়নের আগে এবং ৭ মিনিটের উড্ডয়নকালে কী হয়েছিল, তার বর্ণনাও উঠে এসেছে। তখন আরো কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সরকারের গঠিত তদন্ত কমিশন অন্য তদন্ত কমিটিগুলো যেমন- বিমান বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউকের তদন্ত প্রতিবেদনগুলোও পর্যালোচনা করেছে। এসব তদন্ত প্রতিবেদন সরকারের কমিশন তাদের প্রতিবেদনেও যুক্ত করেছে। শিশুসহ এত প্রাণহানির ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিশনের সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন পাওয়ার পর সেটি নিয়ে তৎকালীন উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা হয়েছিল। কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে কয়েকটি মন্ত্রণালয়কে দায়িত্বও দেয়া হয়েছিল।

তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবনটিতে একটি মাত্র বের হওয়ার পথ বা সিঁড়ি ছিল। বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে ঠিক সেই সিঁড়ির সামনেই। যে কারণে প্রাণহানি বা হতাহত বেশি হয়েছে। সেই সঙ্গে বিমানবন্দর এলাকায় উচ্চতার সীমা লঙ্ঘনকারী অসংখ্য স্থাপনা থাকার বিষয়গুলোও উঠে এসেছে কমিশনের প্রতিবেদনে।

এক বছর আগে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ওই ঘটনার দিনে, রাত থেকে নিহতদের মৃতদেহ গুম করার কিছু অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে কমিশন বলেছে, তারা সব পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে এর কোনো সত্যতা পায়নি। তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে আহত-নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণে সুনির্দিষ্ট প্যাকেজের সুপারিশ করা হলেও এক বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি, এ নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশার কথা জানিয়েছে নিহত-আহতদের পরিবারগুলো।

যেভাবে ঘটেছিল দুর্ঘটনাটি

দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত বছরই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন। প্রকৃত ঘটনা জানতে ওই কমিশন বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলসহ অন্য রেকর্ডিং ও কারিগরি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে। একই সঙ্গে ওই ঘটনায় নিহত পাইলটের অফিসার কমান্ডিং ও মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ারের বক্তব্যও নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা, তথ্য যাচাই-বাছাই ও বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন ও নিজেদের পাওয়া তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে কমিশন।

ঘটনা সম্পর্কে তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম এফটি-৭ বিজিআই বিমানটি নিয়ে ওই দিন অর্থাৎ গত বছরের ২১ জুলাই আনুমানিক দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য বের হন। যেটি ছিল তার প্রথম একক ফ্লাইট পরিচালনা। এফটি-৭ বিজিআই হলো চীনে তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত এক আসন বিশিষ্ট একটি যুদ্ধ বিমান। আকাশে প্রতিপক্ষের যুদ্ধ বিমানকে প্রতিহত করতে এই বিমানটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। দুর্ঘটনার সময়ের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের বা এটিসির সঙ্গে কথোপকথনও তুলে ধরা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

সেই কথোপকথন পর্যালোচনা করে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্ঘটনা কবলিত বিমানটি বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টা ৪৩ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে এটিসির সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম দুপুর ১টা ৪ মিনিট ১৬ সেকেন্ডে রানওয়ে- ১৪ তে লাইন-আপ করে ১৫০০ ফিট উচ্চতায় উঠে যান বা উড্ডয়ন করেন সার্কিট ফ্লায়িং অনুশীলনের জন্য।

প্রথম সার্কিট শেষ করার পর অফিসার কমান্ডিং পাইলটকে দ্বিতীয় সার্কিট শুরু করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ওই নির্দেশনা কপি করেন পাইলট তৌকির। দুপুর ১টা ১১ মিনিট ৫৭ সেকেন্ডে অফিসার কমান্ডিং পাইলটকে বেজ টার্ন করার নির্দেশ দেন। বিমান বাহিনীতে সাধারণত এই ধরনের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ছোট ইউনিটের নেতৃত্বে যিনি থাকেন, তাকে অফিসার কমান্ডিং বলা হয়। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির তা কপি করে দুপুর ১টা ১১ মিনিট ৫৯ সেকেন্ডে রজার টার্নিং লেফট প্রত্যুত্তর দেন। এটিসির কথোপকথন অনুযায়ী, এটিই ছিল পাইলটের সঙ্গে শেষ কথোপকথন।

বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার সেই সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রতিবেদন বলা হয়েছে, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে বিমানটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দুপুর ১টা ১৩ মিনিট ১১ সেকেন্ডে। ঠিক সে সময় থেকে শুরু করে মোট ৫ বার বিমানটির পজিশন জানতে চাওয়া হলেও পাইলটের কোনো প্রত্যুত্তর আসেনি। দুপুর ১টা ১৪ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডে মোবাইল টাওয়ার অর্থাৎ অফিসার কমান্ডিং কর্তৃক জানানো হয় যে, বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। ৬ সেকেন্ডের মাথায় দুপুর ১টা ১৪ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডে বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার বিষয়টি পুনরায় নিশ্চিত করা হয়।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, পাইলট প্রথম সলো ফ্লাইট হিসেবে যখন টেক অফ করে যাবে, সে জন্য রুটটি মার্ক করা বা সুনির্দিষ্ট করা আছে- যেমন এত ফুট গিয়ে এই জায়গার ওপর দিয়ে সাভারের ওপর গিয়ে লেফট টার্ন করতে হবে, এরপর মিরপুরের এদিক এসে আফতাবনগরের দিক দিয়ে এসে ল্যান্ড করতে হবে। এটাই অনুসরণ করবে পাইলট।

বিমানটি বিধ্বস্ত হয় কয়েক সেকেন্ডেই

কোনো কারিগরি ত্রæটি না থাকার পরও ঠিক কী কারণে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এই যুদ্ধবিমানটি হঠাৎই বিধ্বস্ত হলো, সে ব্যাপারে বাহিনীটিও তদন্ত করেছে। বিমানটির ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার বা এফডিআরের তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা হয়, বিমান চলাকালে ইঞ্জিনের অবস্থা, হাইড্রলিক সিস্টেম ও কন্ট্রোল সিস্টেম থেকে কোনো ওয়ার্নিং সিগন্যাল পাওয়া যায়নি। কিন্তু বিমানটি বেইজ থেকে ফাইনালে বাঁক নেয়ার সময় মাত্র চার সেকেন্ডের ব্যবধানে ব্যাংক অ্যাঙ্গেল ৫৯ ডিগ্রি থেকে ৬৫.৩ ডিগ্রিতে বেড়ে যায়।

তদন্ত প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন পাইলট কন্ট্রোল স্ট্রিকে জোরালো টান দেয়ার ফলে বিমানটির অ্যাঙ্গেল অব অ্যাটাক মাত্র এক সেকেন্ডের ব্যবধানে বেড়ে গিয়ে ২৩ দশমিক ২০ থেকে ২৭ দশমিক ৩০ ডিগ্রিতে পৌঁছে যায়। যা বিমানটির ক্রিটিক্যাল অ্যাঙ্গেল অব অ্যাটাক ২৪ ডিগ্রির বেশি। প্রতিবেদনে এও বলা হয়, ‘ক্রিটিক্যাল অ্যাঙ্গেল অব অ্যাটাক অতিক্রান্ত হওয়ায় বিমানটি স্টলড কন্ডিশনে চলে যায়। পরে পাইলট চেষ্টা করেও ব্যাংক অ্যাঙ্গেল কমিয়ে বিমানটিকে আর নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। ফলে ক্রমাগত উচ্চতা হারিয়ে বিধ্বস্ত হয় বিমানটি।

বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, একটা বিমান যত উপরে থাকবে, তত নিরাপদে থাকবে। এখানে উচ্চতা এত কম ছিল, দুর্ঘটনাও খুব অল্প সময়ে ঘটেছে। এর মধ্যে তাকে যদি ডিসাইড করতে হয় যে, আমি ‘ইজেক্ট’ করব, তাহলে ইটস এ ফ্র্যাকশন অব সেকেন্ড, এ মোমেন্ট।

এই ঘটনায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও থেকে বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পূর্বে বিমানের উইন্ড-শিল্ডে একটি কালো দাগ দেখা যায়। এই কালো দাগ পাখি বা উড্ডীয়মান কোনো বস্তুর আঘাতে হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

বিমান বাহিনীর প্রতিবেদনেও বলা হয়, পাখি বা উড্ডীয়মান কোনো বস্তুর এই আঘাত পরিহার করতেই হয়তো পাইলট তৎক্ষণাৎ কন্ট্রোল স্ট্রিক টেনে বিমানের গতিপথ পরিবর্তন করার চেষ্টা করেন। যার ফলে হঠাৎ ব্যাংকিং কোণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরপরই বিমানটিকে ক্রমাগত বাম কাত হয়ে নিচের দিকে পড়তে দেখে অফিসার কমান্ডিং পাইলটের উদ্দেশে ৩ বার ‘ইজেক্ট’ কমান্ড দিয়েছিলেন। এটিসি রেকর্ড পর্যালোচনা করে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, দুপুর ১টা ১২ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডে শুধু একটি ‘ইজেক্ট’ কমান্ড পাওয়া গেছে। সেই এটিসি রেকর্ডের কপিও যুক্ত রয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুপুর ১টা ১৪ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডে মোবাইল টাওয়ার অর্থাৎ অফিসার কমান্ডিং কর্তৃক জানানো হয় যে, ওই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। মাত্র ছয় সেকেন্ডের মাথায় দুপুর ১টা ১৪ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডে বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার বিষয়টি পুনরায় নিশ্চিত করা হয়।

বিমান বিধ্বস্তের পেছনে দায় কার?

বিমানটি মাইলস্টোন স্কুল ?এ্যান্ড কলেজের দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসে বিধ্বস্ত হওয়ার পর ওইদিনই তা উদ্ধার করে কুর্মিটোলা একে খন্দকার বিমান ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। বিমানের ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার বা এফডিআর উদ্ধার করে তথ্য চীনে বিমান প্রস্তুতকারক কোম্পানির কাছে পাঠানো হয়।

এই ঘটনায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্ত বোর্ডের প্রতিবেদনও গত বছরের ১১ অক্টোবর তদন্ত কমিশনের কাছে দাখিল করা হয়। দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত এফটি-৭ বিজিআই বিমানটির রক্ষণাবেক্ষণের ইতিহাস পর্যালোচনা করে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানটির কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী করা হয়েছিল।

এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিমানটি যেদিন বিধ্বস্ত হয়, ওইদিন উড্ডয়নের জন্য বিমানটি প্রস্তুত কিনা, তা দেখতে সকালেও একবার উড্ডয়নের পর আবার নিরাপদে অবতরণও করা হয়েছিল। পরে দুপুর সাড়ে ১২টায় উড্ডয়নের জন্য উপযুক্ত ঘোষণা করা হয়।

বিমান বাহিনীর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম উড্ডয়নের জন্য শারীরিকভাবে সুস্থ ছিলেন এবং আবহাওয়াও উড্ডয়নের অনুকূলে ছিল। প্রশ্ন হলো, এই বিমানটি যদি উড্ডয়নের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত থাকে, তাহলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ কী?

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত পাইলটের অফিসার কমান্ডিং সকালে পাইলটকে প্রি-ফ্লাইট ব্রিফিং দেন। বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ সিলেবাস অনুযায়ী এই ফার্স্ট সলো ফ্লাইটের উড্ডয়নের মিশন প্রোফাইল ছিল- ‘ফ্লাই থ্রæ লো গো’, ‘ফ্লাই থ্রæ লো গো’, ফুল স্টপ’। সেই হিসেবে পাইলটের দ্বিতীয় সার্কিটে ‘লো-গো’ আসার কথা ছিল।

তদন্ত কমিশন এসব তথ্যে কিছু গড়মিল বা অসামঞ্জস্য পেয়েছে বলেও জানানো হয় তাদের প্রতিবেদনে। এটিসির কথোপকথন ও বিমান বাহিনীর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, কমান্ডিং অফিসার মোবাইল ভ্যান থেকে পাইলটকে পুনরায় ইনিশিয়ালে আসার নির্দেশনা প্রদান করেন, যা ফার্স্ট সলো ফ্লাইট এর মিশন প্রোফাইলের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অফিসার কমান্ডিং তদন্ত কমিশনের কাছে জানিয়েছেন যে, বিমানটি অবতরণের প্রাথমিক ধাপে পৌঁছানোর পরই উচ্চতা হারাতে শুরু করে। তখনই অফিসার কমান্ডিং তাকে ‘গেটিং লো’ দেন। কিন্তু তারপরও উচ্চতা ক্রমাগত কমতে দেখে পাইলটকে দুইবার রিকভার কল দেন তিনি। বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরীণ রিপোর্টের বরাতে তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বিমান দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামের অনিয়মিত উড্ডয়ন প্রশিক্ষণকে উল্লেখ করা হয়েছে। যার ফলে বিমানটি নিয়ন্ত্রণে নিহত পাইলট সঠিক ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেননি। বিমান বাহিনীর তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সরকার গঠিত তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকিরের প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতার ঘাটতি ছিল। ছিল কর্মদক্ষতার অভাব। যে কারণে এমন পরিস্থিতিতে অসচেতনতার কারণে বিমানটিকে আর স্বাভাবিক অবস্থায় বা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি পাইলট।

এছাড়া বলা হয়েছে, গ্রাউন্ড সুপারভাইজার বা অফিসার কমান্ডিংয়ের পর্যাপ্ত সুপারভিশনের অভাবে পাইলট উড্ডয়নের সময় যথাযথ উড্ডয়ন প্যারামিটারসমূহ বজায় রাখতে পারেনি। ফলে সংকটাপন্ন অবস্থায় পাইলটের যথোপযুক্ত প্রতিক্রিয়ার অভাবে বিমানটি হঠাৎ স্টলড কন্ডিশনে চলে যায়। যেখান থেকে পাইলট পুনরায় চেষ্টা করেও বিমানটির স্বাভাবিক অবস্থা থেকে পুনরুদ্ধার করতে পারেননি।

একই সঙ্গে পরিবেশগত নিয়ামক হিসেবে পাখি বা অন্য কোনো উড্ডীয়মান বস্তু কর্তৃক বিমানের উইন্ড-শিল্ডে আঘাতও এই ঘটনায় পরোক্ষ ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে বলেও বলা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

এত হতাহতের কারণ কী?

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, যুদ্ধবিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিস্ফোরণ ঘটে। সে সময় প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত আগুনের শিখা তৈরি হয়। বিস্ফোরণের পরে আগুনের শিখার আকার কমে এলেও তীব্রতা যথেষ্ট বেশি ছিল। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে দেড় ঘণ্টা পর। জেট ফুয়েল বা পেট্রোলিয়াম থেকে তৈরি আগুনের কারণে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে ফোম সলিউশন ব্যবহার করা হয়েছিল।

বিমানটি মাত্র ৭ মিনিট আকাশে উড়েছিল। অফিসার কমান্ডিংয়ের লিখিত বক্তব্যের বরাত দিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আনুমানিক সাত মিনিট উড্ডয়ন শেষে বিধ্বস্তের সময় ফুয়েল ট্যাংকে আনুমানিক দুই হাজার ১৫০ লিটার জ্বালানি ছিল। এসময় বিমানটির গতি ছিল ছয়শ থেকে সাড়ে ছয়শ কিলোমিটার। বিধ্বস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিমানটির ফুয়েল ট্যাংকটি পুরোপুরি চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায় এবং তীব্র গতিতে জেট ফুয়েল বাষ্পীভূত হতে থাকে, সেখানেই আগুনের শিখা তৈরি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, প্রথমবার বিস্ফোরণের পরপরই দ্বিতীয়বার আরেকটি বিস্ফোরণ হয়। আগুনের ব্যাপ্তি নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানটি ওই স্কুলের হায়দার আলী ভবনের সিঁড়ির ঠিক বাম পাশে বিধ্বস্ত হয় এবং আগুনের শিখার ব্যাপ্তি বাম পাশেই বেশি ছিল। ঘটনার পর ভবনটিতে আটকা পড়াদের উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের একাধিক ইউনিট ও দিয়াবাড়ির মেট্রোরেলের ফায়ার ফাইটিং ইউনিট এবং অন্য স্বেচ্ছাসেবকরা অংশ নেয়। দুর্ঘটনা-পরবর্তী হতাহতের উদ্ধার-সংক্রান্ত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায়, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্ষতিগ্রস্ত হায়দার আলী ভবনটিতে একটি মাত্র সিঁড়ি ছিল। তাদের মতে, ভবনটির অকুপেন্ট লোড ও আয়তন অনুযায়ী ৩টি সিঁড়ি প্রয়োজন ছিল। অকুপেন্ট লোড ও আয়তন অনুযায়ী ভবনটিতে যথাযথ জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি থাকলে প্রাণহানির সংখ্যা অনেকাংশে কম হতো। এমনকি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ওই ক্যাম্পাসে অর্ধেকের বেশি ভবন অনুমোদনহীন ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ। অনুমোদনের নথিপত্র আগুনে পুড়ে গেছে বলে দাবি করছেন তারা। তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে স্কুলটির বিভিন্ন ভবন নির্মাণে অনুমোদন না থাকার যে বিষয় এসেছে।

কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি হতাহতরা

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনার পর সরকার গঠিত তদন্ত কমিশন ঘটনার কারণ নিরূপণ করাসহ বেশ কিছু সুপারিশ ও প্রস্তাবনা দিয়েছে সরকারের কাছে। তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে সুপারিশে বলা হয়, ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি মানবিক সংবেদনশীলতা এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করে একটি ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ তৈরি করার জন্য স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে কমিশন থেকে অনুরোধ করা হয়। এর প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট এই দুর্ঘটনায় নিহতদের জন্য এবং অগ্নিদগ্ধদের ক্ষয়ক্ষতি, ভবিষ্যত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের কথা বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত পদ্ধতি ব্যবহার করে একটি ক্ষতিপূরণ মডেল তৈরি করে। সে অনুযায়ী, নিহতদের ক্ষেত্রে ১৮ বছরের নিচে যে সব শিশু মারা গেছে, তাদের জন্য এক কোটি টাকা এবং প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য ৮০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিশন। কিন্তু সরকার ঘোষিত ক্ষতিপূরণ মেলেনি ক্ষতিগ্রস্তদের। অন্যদিকে, আহত ও অগ্নিদগ্ধদের জন্য যে ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে, সেখানে বলা হয়- শিশুদের ক্ষেত্রে গুরুতর ক্ষতিগ্রস্তদের ৬০ লাখ, মাঝামাঝি ক্ষতিগ্রস্তদের ৩০ লাখ, অল্প ক্ষতিগ্রস্তদের ১৫ লাখ টাকা করে দেয়া উচিত। একইভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ও গুরুতর ক্ষতিগ্রস্তদের ৪০ লাখ, মাঝামাঝি ক্ষতিগ্রস্ত ২০ লাখ, স্বল্প ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে তদন্ত কমিশনের সুপারিশে। এছাড়া ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় চিকিৎসার জন্য ১৫ লাখ, ৯ লাখ ও ১ লাখ টাকা করে অর্থ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বরাবর দিতে বলা হয়েছে। তাদের বাজেটে এই বিষয়টি যুক্ত করতেও বলা হয়েছে। তবে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বার্ন ইউনিট এই বাজেট পেলেও ঢাকার জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, এবার নতুন যে বাজেট তৈরি করা হয়েছে, সেখানে মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসায় নতুন করে কোনো বাজেট এখনো পর্যন্ত দেয়া হয়নি।

বর্তমান বিএনপি সরকারের অন্তত ৩ জন মন্ত্রীর কাছে তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন ও তাদের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি কী, তা জানতে চেয়েছিল বিবিসি বাংলা। তবে তাদের কেউ এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে লিখিতভাবেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ও কোনো বক্তব্য দেয়নি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গ, রাস্তায় নামলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গ, রাস্তায় নামলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

চিকিৎসার জন্য রাতেই সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন ধর্মমন্ত্রী, চাইলেন দেশবাসীর দোয়া

চিকিৎসার জন্য রাতেই সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন ধর্মমন্ত্রী, চাইলেন দেশবাসীর দোয়া

স্পেনকে রাজকীয় সংবর্ধনা দিলো মাদ্রিদ

স্পেনকে রাজকীয় সংবর্ধনা দিলো মাদ্রিদ

সাবেক রূপালী ব্যাংক ব্যবস্থাপকের ২৫ বছরের কারাদণ্ড

সাবেক রূপালী ব্যাংক ব্যবস্থাপকের ২৫ বছরের কারাদণ্ড

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App