×

প্রথম পাতা

আক্রান্ত-মৃত্যু বেশি কর্মক্ষমদের

Icon

সেবিকা দেবনাথ

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আক্রান্ত-মৃত্যু বেশি কর্মক্ষমদের

এক সময়ের নগরকেন্দ্রিক ডেঙ্গু জ্বর ছড়িয়েছে গ্রামসহ পুরো দেশে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রতিবারের মতো চলতি বছরও এডিস মশাবাহিত এই জ্বর আক্রান্ত ও মৃত্যু বেশি হচ্ছে ২৬ থেকে ৫০ বছর বয়সী অর্থাৎ কর্মক্ষম মানুষের। তবে আক্রান্তের ক্ষেত্রে শিশুদের সংখ্যাও কম নয়। শূন্য বছর থেকে ৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্ত বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর এ পর্যন্ত (পহেলা জানুয়ারি থেকে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা অনেকটাই কম। তবে গ্রাফটা যে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে তা পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট। গত বছর রোগীর সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ২১৮ জন। প্রাণহানি ছিল ৬২ জনের। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। যা চলতি বছরে একদিনে সর্বোচ্চ। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৩৭ জনের।

এর মধ্যে বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে ২৬ থেকে ৫০ বছর বয়সী ২৩ জন, যা মোট মৃত্যুর ৬২ দশমিক ১৬ শতাংশ। এদের মধ্যে ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি। ৭ জন। ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৫ জন, ৩৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী ৪ জন, ৪১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৩ জন আর ৪৬ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৪ জন। আর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ৮৫৭। এর মধ্যে ছিল শূন্য থেকে ৫০ বছর বয়সী রোগীর সংখ্যা ৯ হাজার ৫৮৭ জন। শতকরা হিসাবে আক্রান্তদের ৮৮ দশমিক ৩০ শতাংশই শূন্য থেকে ৫০ বছর বয়সী। আর লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্তদের মধ্যে ৬০ দশমিক ৯ শতাংশই পুরুষ। আর নারী ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ। তবে মৃত্যুর ক্ষেত্রে এগিয়ে নারীরা। মোট মৃত্যুর ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশই নারী, পুরুষ ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ।

মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি মাসে আক্রান্ত ১ হাজার ৮১ জন আর ২ জনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুতে। ফেব্রুয়ারিতে রোগী ৪০৯ ও ২ জনের মৃত্যু হয়। মার্চ ও এপ্রিলে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়নি কারো। মার্চে ৩৫৩ জন ও এপ্রিলে ৬৪০ জন রোগী ছিল। মে মাসে ১ জনের মৃত্যু আর রোগী ছিল ৭১৪ জন। জুন মাসের ডেঙ্গুতে ১৩ জনের মৃত্যু আর রোগী ছিল ২ হাজার ৯০৭ জন। আর জুলাই মাসের মাত্র ২০ দিনেই প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন। রোগীও বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৭৫৩ জন। এদিকে সামনের দিনগুলোতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি যে ভয়াবহ রূপ নিবে সেই শঙ্কার কথা আগেই জানিয়েছিলেন গবেষক, কীটতত্ত্ববিদ ও বিশেষজ্ঞরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনসেক্ট রিয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশন (আইআরইএস) থেকে নিয়মিত সারাদেশের মশা নিয়ে কাজ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার। ঢাকাতেও তাদের নিয়মিত সার্ভেইল্যান্স চলে। এডিস মশার ঘনত্ব, ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা- এই কয়েকটি প্যারামিটার মিলিয়ে সব সময় একটি ফোরকাস্টিং মডেল বা প্রেডিকশন মডেল তৈরি করে। ইতোপূর্বে এই গবেষকের প্রতিনিধি দল যত মডেল তৈরি করেছে, যত ফোরকাস্টিং করেছে, প্রতিটিই সঠিক হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এ বছর ড. কবিরুল বাশারের গবেষণার তথ্য বলছে, এ বছর তারা যা দেখছে, তাতে আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর- এই দুই মাস ডেঙ্গু পরিস্থিতি বেশ ভয়াবহ হতে পারে।

তিনি বলেন, যদি আমরা এখনই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রাখতে না পারি। তাহলে আগামী দুই মাস আমাদের জন্য পরিস্থিতি বেশ ভয়াবহ হবে। নগরকেন্দ্রিক এই রোগ অনেক আগেই ছড়িয়েছে সারাদেশে। গতবছরও ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ ছিল। এ বছরও তেমনটাই আভাস দিয়েছিলেন মশা নিয়ে দীর্ঘ ২৬ বছরের বেশি সময় ধরে গবেষণা করা এই গবেষক। তিনি বলেন, বাংলাদেশে একটা সময় ডেঙ্গু ছিল ঢাকাকেন্দ্রিক। যখন আমরা ডেঙ্গুকে ঢাকার মধ্যে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারিনি, তখন সেটা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিন ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলাতে প্রচুর মানুষ যানবাহনে যাতায়াত করে। সেই যানবাহনে বা বাসে চড়ে মানুষ তো যায়ই, মশাও চলে যায়। এভাবে সারা বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা শহর এখন এডিস মশার দখলে চলে গেছে।

তিনি বলেন, অন্য বছরের তুলনায় এ বছর ঢাকাতে সংক্রমণ হয়তো অতটা বেশি হবে না। কারণ ঢাকাতে চান্স অব ইনফেকশন অনেকটা কমে গেছে। তাই ঢাকা ছাড়াও ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে এখন ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমাদের অনেক বেশি প্রস্তুতি প্রয়োজন। আমি খুব সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারি, এ বছর কোন কোন জেলায় ডেঙ্গু বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা আছে। বরিশাল বিভাগের বেশ কয়েকটি জেলা, যেমন- বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী। কাছাকাছি আছে বাগেরহাট ও খুলনা। এছাড়া চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চাঁদপুর, কুমিল্লা, ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ- এই জেলাগুলো ডেঙ্গুতে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে অনেক বেশি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। যখন কোনো ভাইরাল ডিজিজ শুরু হয়, তখনই সেটাকে থামিয়ে ফেলতে হয়। যদি আমরা থামাতে না পারি, তখন এটা আস্তে আস্তে জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে ঠিক এই ঘটনা ঘটেছে বলে জানান এই গবেষক।

রোগতাত্ত্বিক ও জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গুতে তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষজন বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে। এটা আমাদের জাতীয় জীবনের জন্য চিন্তার বিষয়। কর্মক্ষম মানুষ সবচেয়ে বেশি মারা যাচ্ছে। এতে ওই পরিবারগুলো অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। কী কারণে কর্মক্ষম মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে সে প্রসঙ্গে তারা বলছেন, যাদের মোবিলিটি বেশি তারাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এটার সহজ হিসাব হলো একজন কর্মক্ষম মানুষ কাজের উদ্দেশে বাসা থেকে অফিসসহ বিভিন্ন এলাকায় যায়। যে কারণে তাদের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ থাকে বেশি। তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া মানে শুধু যে চিকিৎসা ব্যয় বাবদ অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে তা নয়, কর্মঘণ্টা ও কর্মস্পৃহাও নষ্ট হচ্ছে। আর কর্মক্ষম মানুষের মৃত্যু বেশি হওয়ার নেপথ্যে অবহেলাকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করছেন তারা। এক্ষেত্রে তারা বলছেন, জ্বর জ্বর অনুভব করলেও কাজ ফেলে অনেকেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে যান না। ফলে ওই ব্যক্তিটি নীরবে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হতে থাকে। এরপর পরিস্থিতির অবনতি হলে রোগী হাসপাতালে নিয়ে এলেও শেষ রক্ষা হয় না।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, কোনো মৃত্যুই কাম্য নয়; কিন্তু কর্মক্ষম মানুষের মৃত্যু দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। কর্মক্ষম মানুষের মৃত্যু মানে তার ওপর নির্ভরশীল পরিবার এখন নিঃস্ব। কর্মক্ষম মানুষ যখন ভোরে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, তখন হয়তো তিনি এডিস মশার আক্রমণের শিকার হয়। অথবা বাইরে বিচরণের কারণে ঘরের বাইরে থেকেও মশার কামড়ে ডেঙ্গু সংক্রমিত হতে পারে। সাধারণ থিওরি- যারা বেশি আক্রান্ত হয় তাদের মৃত্যুও বেশি হয়। তবে প্রকৃত কারণ জানতে ডেথ রিভিউর বিকল্প নেই।

একটা সময় ডেঙ্গু মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরের তথ্য বলছে, ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ নয়। ২০২১ সালে মোট আক্রান্তের মাত্র ১৬ শতাংশ ছিল ঢাকার বাইরের। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৩৭ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৬৫ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৬০ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৬৯ শতাংশে পৌঁছায়। চলতি বছর সেই হার বেড়ে ৭৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে।

ডেঙ্গুতে নারীদের মৃত্যু কেন বেশি; সে সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেনেটিক কারণে নারীদের জটিলতা বেশি দেখা দেয়। আর এ কারণে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়ার হার বেশি। এছাড়া গর্ভাবস্থায় ও ঋতুস্রাবকালে কোনো নারী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তাদের মৃত্যু ঝুঁকি বেশি থাকে। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে নারীরা তাদের যত্ন নেন। কিন্তু নিজে অসুস্থ হলে গুরুত্ব কম দেন। অসুস্থ হলে বাসায় থেকে চিকিৎসা নেন তারা। এসব কারণে হাসপাতালেও দেরি করে আসেন। দেরি করে আসলে ঝুঁকিতেও থাকেন তারা।

২০০০ সালে ঢাকায় প্রথম ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। ওই বছর ৫ হাজার ৫৫১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং মারা যান ৯৩ জন। ঘটনা তখন সাধারণ মানুষের কাছে নতুন ছিল। দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা প্রকট আকার নেয় ২০১৯ সালে। সে বছর ১ লাখেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয় এবং মারা যায় ১৭৯ জন, যা তখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ছিল। তবে ৪ বছর পর, ২০২৩ সালে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়। ইতিহাসের সর্বাধিক সংক্রমণ ও মৃত্যুর রেকর্ড তৈরি হয় ওই বছর, যা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় সতর্ক সংকেত হিসেবে চিহ্নিত হয়। ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মানুষ শনাক্ত ও মারা যায়। সে বছর ডেঙ্গু শনাক্ত হয় ৩ লাখের বেশি মানুষের শরীরে এবং মারা যায় ১ হাজার ৭০৫ জন। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয় ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মারা যায় ৫৭৫ জন। ২০২৫ সালে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং মারা যান ৪১৩ জন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গ, রাস্তায় নামলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গ, রাস্তায় নামলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

চিকিৎসার জন্য রাতেই সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন ধর্মমন্ত্রী, চাইলেন দেশবাসীর দোয়া

চিকিৎসার জন্য রাতেই সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন ধর্মমন্ত্রী, চাইলেন দেশবাসীর দোয়া

স্পেনকে রাজকীয় সংবর্ধনা দিলো মাদ্রিদ

স্পেনকে রাজকীয় সংবর্ধনা দিলো মাদ্রিদ

সাবেক রূপালী ব্যাংক ব্যবস্থাপকের ২৫ বছরের কারাদণ্ড

সাবেক রূপালী ব্যাংক ব্যবস্থাপকের ২৫ বছরের কারাদণ্ড

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App