বন্যা অবনতির শঙ্কা
তিন নদীর পানি বিপৎসীমার উপরে
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আর এতে সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে। এতে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের নদী লাগোয়া নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও আকস্মিক অথবা স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে বলেও পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
এদিকে ভারতীয় উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে আবারো তিস্তা নদীর পানি বেড়েছে। পানির চাপ সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেয়া হয়েছে। এছাড়া দেশের বেশিরভাগ এলাকায় আবারো ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসা দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের গতকাল সোমবারের নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, সোমবার সকাল ৯টায় সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর পানি তিনটি জেলার চারটি পয়েন্টে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এরমধ্যে সুরমা নদীর পানি ছাতক (সুনামগঞ্জ) পয়েন্টে প্রবাহিত হচ্ছিল বিপৎসীমার ১৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে। কুশিয়ারা নদীর পানি ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার এবং মারকুলি (সুনামগঞ্জ) পয়েন্টে ৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছিল। এছাড়া নেত্রকোণার কলমাকান্দা পয়েন্টে সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমার পানি বেড়েছে, অন্যদিকে কুশিয়ারা নদীর পানি কমেছে। তবে নদী দুটির পানি আগামী তিন দিন বাড়তে পারে। তাতে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় নদী দুটির কিছু স্থানে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে এবং সিলেট ও সুনামগঞ্জের নি¤œাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। আর যেসব এলাকায় বন্যা চলছে, সেসবে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে।
ভারতের মণিপুর রাজ্যের আঙ্গামি নাগা পাহাড় থেকে উৎপন্ন বরাক নদী সিলেট সীমান্তে এসে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে দুটি স্রোতধারায় বিভক্ত হয়। এ দুই নদী কিশোরগঞ্জের ভৈরববাজারের কাছে মিলিত হয়ে মেঘনা নদী গঠন করে, যা চাঁদপুরে পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়ে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র বলছে, সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, জিঞ্জিরাম, সোমেশ্বরী, ভুগাই ও কংস নদীর পানি বেড়েছে, যা আগামী দুই দিন বাড়তে পারে।
আগামী ৪৮ ঘণ্টায় শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণায় ভুগাই, কংস ও সোমেশ্বরী নদী এবং সিলেট ও সুনামগঞ্জে সারিগোয়াইন, যাদুকাটা নদীর কিছু স্থানে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। তাতে নদী লাগোয়া নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। আর যেসব এলাকায় বন্যা চলছে, সেসবে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে।
এদিকে যাদুকাটা, সোমেশ্বরী, সারি গোয়াইন ও ভোগাই নদীর উজানে ভারতের মেঘালয়ে গেল ২৪ ঘণ্টায় অতি ভারি বৃষ্টি হয়েছে।
বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের উইলিয়ামনগরে ৩৭১ মিলিমিটার, চেরাপুঞ্জিতে ২৭৯ ও তুরায় ১০১ ও আর কে এম সোহরায় ২৮২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
এছাড়া আসামের গোয়াহাটিতে ১৩৮ এবং পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে ৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। তাছাড়া দেশের ভেতরে চট্টগ্রাম বাদে সব বিভাগে ভারী বৃষ্টির আভাস রয়েছে।
উত্তরের পরিস্থিতি : বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তরে রংপুর বিভাগে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বেড়েছে। আগামী দুই দিনে তা আরো বাড়তে পারে এবং তৃতীয় দিনে গিয়ে তা স্থিতিশীল থাকতে পারে। এর ফলে আগামী দুই দিনে নদীগুলোর কিছু স্থানে বিপৎসীমার উপরে পানি প্রবাহিত হতে পারে এবং লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের নদী লাগোয়া নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও আকস্মিক অথবা স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে।
গত একদিনে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গার পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে পদ্মার পানি সমতল স্থিতিশীল আছে। আগামী পাঁচ দিন এসব নদ-নদীর পানি বাড়তে পারে। এর ফলে আগামী তিন দিনের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের বিভিন্ন স্থানে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদী লাগোয়া নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও প্লাবিত হতে পারে।
রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের করতোয়া, আত্রাই, টাঙ্গন, পুনর্ভবা, মহানন্দা, যমুনেশ্বরী, আত্রাই ও ঘাঘট নদীর পানি গত একদিনে বেড়েছে। এসময়ে করতোয়া ও ছোট যমুনা নদীর পানি কমেছে, যা আগামী তিন দিনে বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে তিন দিনের মধ্যে নওগাঁ ও নাটোরে আত্রাই ও ছোট যমুনা নদীর কিছু স্থানে পানি সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদী লাগোয়া নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
গত একদিনে চট্টগ্রাম বিভাগে সাঙ্গু নদীর পানি বেড়েছে, অন্যদিকে হালদা নদীর পানি কমেছে; আর মাতামুহরীর পানি স্থিতিশীল রয়েছে। এসব নদীর পানি আগামী একদিন বৃদ্ধি এবং পরবর্তী দুদিন দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে।
তিস্তায় খুলে দেয়া হয়েছে ৪৪ জলকপাট : পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ডালিয়া ডিভিশনের তিস্তা নদীর পানি পরিমাপক নুরুল ইসলাম জানান, সোমবার সকাল ৯টায় দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি রেকর্ড করা হয়েছে ৫২ দশমিক ১০ মিটার। এটি বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। একই দিন সকাল ৬টায়ও পানির উচ্চতা একই পর্যায়ে ছিল।
পাউবো ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলছেন, তিস্তা নদীর পানি বেড়ে সকাল ৯টায় বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি আরো বাড়তে পারে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেয়া হয়েছে।
