চোখের জলেই শেষের কবিতা লিখলেন মেসি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফুটবলের ইতিহাসে খুব কম খেলোয়াড়ই আছেন, যাদের প্রতিটি স্পর্শ কোটি মানুষের আবেগ হয়ে ওঠে। লিওনেল মেসি সেই বিরলদের একজন। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা ব্যালন ডি’অর- প্রায় সবকিছুই জয়ের পরও ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে তার চোখে ছিল আরেকটি স্বপ্ন। টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে আর্জেন্টিনাকে ইতিহাসের নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে সেই স্বপ্ন থেমে গেল স্পেনের কাছে ১-০ গোলের পরাজয়ে।
শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠে বসে পড়া মেসির ছবিটিই হয়তো এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত হয়ে থাকবে। চারপাশে স্পেনের উল্লাস, গ্যালারিতে লাল-হলুদের উৎসব, আর মাঝমাঠে নীরবে বসে থাকা আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে বহুবার আলো ছড়ানো মানুষটি যেন প্রথমবারের মতো শব্দহীন হয়ে গেলেন।
ফাইনালের আগে পুরো বিশ্বকাপজুড়েই ছিলেন আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা। আট গোল ও চার অ্যাসিস্ট করে দলকে টেনে তুলেছিলেন ফাইনালে। ৩৯ বছর বয়সের একজন ফুটবলারের কাছ থেকে এমন পারফরম্যান্স অনেকের কাছেই ছিল বিস্ময়ের। প্রতিটি ম্যাচে অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব ও অসাধারণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, বয়স তার প্রতিভাকে স্পর্শ করতে পারেনি।
কিন্তু ফাইনালের গল্প ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুরুতেই একবার সুযোগ পেয়েও স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমোনের দ্রুত সিদ্ধান্তে গোল করতে পারেননি মেসি। এরপর ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নেয় স্পেন। রদ্রির নেতৃত্বে মাঝমাঠের দখল, পেদ্রি ও দানি ওলমোর নিরন্তর চাপ এবং লামিন ইয়ামাল-নিকো উইলিয়ামসের গতিময় ফুটবল আর্জেন্টিনাকে ক্রমেই নিজেদের অর্ধে ঠেলে দেয়।
মেসিকে আলাদা করে মার্কিং করার বদলে তার চারপাশের জায়গাগুলো বন্ধ করে দেয় স্পেন। ফলে বল পেলেও সামনে খেলার মতো জায়গা পাননি তিনি। আর্জেন্টিনার আক্রমণও হয়ে পড়ে একমাত্রিক। পুরো ম্যাচে দলটি মাত্র দুটি শট নিতে পারে, যার একটিও ছিল না লক্ষ্যে। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। পরিসংখ্যানই বলে দেয়, মেসি নয়- পুরো আর্জেন্টিনা দলই সেদিন নিজেদের ছন্দ খুঁজে পায়নি।
তবু ম্যাচটি আরো দীর্ঘ সময় গোলশূন্য ছিল একজনের কারণে- এমিলিয়ানো মার্তিনেস। একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করে তিনি স্পেনকে হতাশ করছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের শেষদিকে এনসো ফের্নান্দেস লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার পর আর্জেন্টিনার লড়াই আরও কঠিন হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের জোরালো ভলিতে ভেঙে যায় আকাশি-সাদা জার্সিধারীদের সব আশা।
এই হার হয়তো মেসির ক্যারিয়ারের সংজ্ঞা বদলে দেবে না। কারণ তার ফুটবলজীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় কোনো একটি ম্যাচ নয়; বরং দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের সেরা ফুটবল উপহার দেয়া। আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকার দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান এনে দেয়া, বিশ্বকাপ জেতানো এবং অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দেয়া- এসব অর্জন তাকে আগেই কিংবদন্তির আসনে বসিয়েছে।
তবু ফাইনালের পর রানার্সআপের রুপালি পদক গলায় ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেসির মুখে যে হতাশা দেখা গেছে, সেটি ছিল এক প্রতিযোগিতা হারার বেদনার চেয়েও বড়। সেটি ছিল শেষ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার কষ্ট, আরেকবার ইতিহাস লেখার স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যাওয়ার আক্ষেপ।
এটাই কি মেসির শেষ বিশ্বকাপ? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাননি। তবে পরবর্তী বিশ্বকাপের সময় তার বয়স হবে ৪৩ বছর। তাই স্বাভাবিকভাবেই ফুটবলবিশ্বের বড় অংশ মনে করছে, মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সেই রাতই হয়তো বিশ্বকাপ মঞ্চে তার শেষ উপস্থিতি।
যদি সত্যিই সেটিই শেষ হয়, তবে বিদায়টি শিরোপা হাতে নয়, চোখে জল নিয়েই লেখা থাকবে। কিন্তু একটি পরাজয় কখনোই মেসির উত্তরাধিকারকে ছোট করতে পারবে না। তিনি শুধু ট্রফি জেতা একজন ফুটবলার নন; তিনি এমন এক শিল্পী, যিনি এক প্রজন্মকে ফুটবলকে নতুনভাবে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের আলো নিভে যাবে, ২০২৬ বিশ্বকাপ ইতিহাসের পাতায় জায়গা নেবে, নতুন নায়কও আসবে। কিন্তু আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে বল পায়ে যে মানুষটি কোটি মানুষের স্বপ্নকে বারবার বাস্তবে রূপ দিয়েছেন, তার গল্প থেমে যাবে না। হয়তো বিশ্বকাপের অধ্যায় শেষ হবে, কিন্তু লিওনেল মেসি নামের মহাকাব্য ফুটবল ইতিহাসে অনন্তকাল ধরে উচ্চারিত হবে।
