গ্যাস সংকটে বাড়ছে দুর্ভোগ
দেব দুলাল মিত্র
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
উৎপাদন ও আমদানিতে দিন দিন গ্যাসের ঘাটতি বেড়েই চলছে। ফলে জনজীবনে ভোগান্তিও বেড়ে চলছে। প্রতিদিন ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত গড়ে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ করা হয় ২ হাজার ৬৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। এই হিসাবে প্রতিদিন ১ হাজার ১৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। আগে ছুটির দিনে গ্যাস মিললেও এখন সেদিনও গ্যাসের খড়া থাকছে। গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সারাদিনেও রান্নার চুলা জ্বলছে না, রান্না করতে হয় গভীর রাতে। নির্ভর করতে হচ্ছে সিলিন্ডার গ্যাস ও ইলেকট্রিক্যাল চুলার ওপর। বিদ্যুৎ ও সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্ষেত্রেও এখন ভোক্তাদের স্বস্তি নেই। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি পূরণের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ কয়েকদিন আগে জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে উত্তোলনযোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতের পরিমাণ ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। তবে দেশে প্রতিদিন গ্যাস সরবরাহে প্রায় ১ হাজার ১৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে গড়ে প্রতিদিন ২ হাজার ৬৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়। ১ হাজার ১৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি কোনোভাবেই মেটানো যাচ্ছে না।
গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতে জানা যায়, ঢাকার প্রায় সব এলাকায় গ্যাসের চাপ আগের চেয়ে অনেক কমেছে। পুরো মিরপুর জুড়ে গ্যাস সংকটের কারণে জনগণের ভোগান্তি চরমে। গভীর রাত ছাড়া এই বিস্তীর্ণ এলাকার বাসাবাড়িতে রান্না হয় গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত। এ সময় গ্যাস পাওয়া যায়। কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ, লালবাগ, কোতোয়ালি এলাকার বাসিন্দারা বছর জুড়েই গ্যাস সংকটে থাকেন। সূত্রাপুর, মতিঝিল, খিলগাঁও, শেরেবাংলানগর, শেওড়াপাড়া, কাফরুল, মালিবাগ, উত্তরখান, দক্ষিণখান, ডেমরা এলাকায় গ্যাস সরবরাহ সব সময়ই কম থাকায় মানুষের ভোগান্তি আগের চেয়েও বেড়েছে। এসব এলাকার মানুষ তিতাসে অভিযোগ করেই যাচ্ছেন, কিন্তু সমস্যার কোনো সমাধান মিলছে না।
পল্লবী এলাকার বাসিন্দা সাবিহা হ্যাপী বলেন, গভীর রাত ছাড়া গ্যাস পাওয়া যায় না। তখন পরের দিনের খাবার রান্না করে রাখতে হয়। আগে ছুটির দিনগুলোতে গ্যাস পাওয়া যেত, এখন আর তাও পাওয়া যায় না। ভোগান্তি দিন দিন বাড়ছেই।
পলি বিশ্বাস বলেন, তিতাসকে গ্যাস সংকটের অভিযোগ জানিয়েও ভোগান্তি কমছে না। তিতাসের কর্মীরা দায় এড়াতে বলছে, লাইনে গ্যাস সরবরাহ ঠিক আছে, আপনাদের আভ্যন্তরীণ লাইনে সমস্যার কারণে গ্যাস আসছে না।
তীব্র গ্যাস সংকট চলছে ঢাকার কাছের এলাকা সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ তিতাসের আওতাভুক্ত এলাকাগুলোতে। এসব এলাকার মানুষও এখন আর দিনের বেলায় রান্না করতে পারেন না। গভীর রাতেই রান্নার অপেক্ষায় থাকতে হয় সবাইকে। গ্যাসের অভাবে এসব এলাকার অনেক ছোট ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সাভারের গৃহবধূ সুস্মিতা জানান, রাত ১১টার দিকে গ্যাস আসতে শুরু করে। তখন সকাল ও দুপুরের খাবার একসঙ্গে রান্না করে রাখতে হয়। অনেকেই হোটেল থেকে খাবার কিনে খাচ্ছে। অথচ গ্যাস না দিয়েও তিতাস নিয়মিত বিল নিয়ে যাচ্ছে। গত এক বছর ধরে এই সমস্যা নিয়েই চলতে হচ্ছে।
কামরাঙ্গীরচর এলাকার বাসিন্দা সেলিনা খাতুন বলেন, এমনিতেই গ্যাসের চাপ কম থাকে। আবার কয়েকদিনেও গ্যাস পাওয়া যায় না। তখন বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার গ্যাস কিনে রান্না করতে হয়। এখন তো সিলিন্ডার গ্যাসের দামও আগের চেয়ে বেড়েছে। তিতাস গ্যাস কোম্পানির সূত্রে জানা গেছে, তিতাসের প্রতিদিন ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২৭০ কোটি ঘনফটু গ্যাস। গত কিছু দিনে এই সরবরাহ আরো কমেছে। ফলে চাহিদা কোনোভাবেই মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। অফিসে হাজার হাজার অভিযোগ জমা হচ্ছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কলকারখানা, সিএনজি ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ করতে হয়। রান্নার জন্য ১০ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু এটাও সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া তিতাসের আওতাধীন অনেক এলাকায় সরবরাহ ঠিক থাকলেও পুরনো ও ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনে সমস্যা থাকার কারণে সংকট আরো বেড়েছে। সম্প্রতি জলাবদ্ধতার কারণে অনেক স্থানে গ্যাসের পাইপের ভেতরে পানি ঢুকে সমস্যা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থায় রাজধানীর অবস্থান শেষের দিকে হওয়ায় রাজধানীতে সংকট তুলনামূলক বেশি।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাস সংকট সমাধানে পেট্রোবাংলা সরকারের সঙ্গে কাজ করছে। দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। গ্যাসের সংকট মেটাতে এলএনজি আমদানিও অব্যাহত রয়েছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে- সহজেই চাহিদা অনুযায়ী সমস্যার সমাধান আমাদের হাতে নেই।
ক্যাবের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আরক বলেন, নিজস্ব উৎপাদন বাড়ানো এবং সরবরাহ লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ না করে অতীতের সরকারগুলোর আমদানিনির্ভরতার কারণে আজকের গ্যাস সংকট আরো তীব্র হয়েছে। সিস্টেম লস এখনো রয়েছে। অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতি রয়েছে। এখন সহজেই এই সমস্যার সমাধান আমি দেখতে পাচ্ছি না। তবে বসে থাকলে হবে না। নতুন করে পরিকল্পনা নিয়ে এখন থেকেই কাজ শুরু করতে হবে। এখন কাজ শুরু করলে হয়তো কয়েক বছর পর এর সুফল মিলতে পারে। সবকিছুই নির্ভর করছে সরকারের সদিচ্ছার ওপর।
