বঙ্গভবনে বদলের হাওয়া
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
হরলাল রায় সাগর
দুই দিন ধরে গুঞ্জন চলছে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে। একটি ফেসবুক পোস্টের সূত্র ধরে এই গুঞ্জনের সূত্রপাত। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও খবর এসেছে। তবে সেই গুঞ্জন সত্যি হতে চলেছে বলেই ধারণা পাওয়া যাচ্ছে বঙ্গভবন সংশ্লিষ্টদের কথায়। রাষ্ট্রপতির দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা এবং তার ঘনিষ্ঠ একজন বলেছেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তবে স্পিকার দেশে না থাকায় পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার বিষয়টি বিলম্বিত হচ্ছে। দুই-এক দিনের মধ্যেই তিনি পদত্যাগ করতে পারেন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে এক্ষেত্রেও কে হবেন বিএনপি সরকারের পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান, তা নিয়েও জল্পনা-কল্পনা চলছে।
এদিকে ক্ষমতাচ্যুৎ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কথিত ফোনালাপ নিয়েও আলোচনার ডালপালা ছড়িয়েছে। যদিও ফোনালাপের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘এটি কল্পনার বাইরে।’ তাছাড়া পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, এরকম ফোনালাপের তথ্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই।
সংবিধানে কী আছে : সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র পাঠিয়ে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, চিকিৎসার জন্য গত ১৯ জুলাই থাইল্যান্ডে গেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সূচি অনুযায়ী তার ২৬ তারিখ ফেরার কথা। তবে তার আগেই তিনি ফিরতে পারেন বলে আভাস পেয়েছেন তার দপ্তরের কর্মকর্তারা।
পূর্বাপর : সরকারি চাকরিতে কোটাবিরোধী থেকে বৈষম্যবিরোধী ও পরে সরকার পতনের আন্দোলনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ক্ষমতাচ্যুৎ হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। এই পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে অপসারণের দাবি জানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে তারা এ নিয়ে বঙ্গভবনের সামনে গিয়ে আন্দোলন করেন। তবে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার সাংবিধানিক কারণে তাকে সরাতে রাজি হয়নি। তাছাড়া দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপিও তখন এ বিষয়ে সায় দেয়নি। শেষ পর্যন্ত সেই দাবি স্তিমিত হয়ে যায়।
তাছাড়া ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অধীনেই শপথ নেন অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একাধিকবার আলোচনায় ওঠে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ কিংবা অপসারণের বিষয়টি। মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে মাঝে-মাঝে
উত্তপ্ত হয়েছে রাজপথ। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি বহাল থাকেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞাপন ও নিয়মিত রুটিন কাজ ছাড়া তার আর কিছুই করার ছিল না। সম্ভাব্য অনাকাক্সিক্ষত আচরণ এড়াতে রাষ্ট্রীয় অনেক আচার অনুষ্ঠানেও তার উপস্থিতি ছিল না। রাষ্ট্রীয় দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন অপাঙ্ক্তেয়। এমনকি জাতীয় ঈদগাহেও তিনি নামাজ পড়তে যেতে পারেননি।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। এবারো অনেকে মনে করেছিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করতে পারে সরকার। আলোচনা ছিল রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারবেন কিনা। তবে এই সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি সরকার। সরকারপ্রধান তারেক রহমানের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সব অনুষ্ঠানেই যোগ দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। কিন্তু আকস্মিভাবেই তার পদত্যাগের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এখন বিষয়টি টক অব দ্য কান্ট্রি-পদত্যাগ করছেন রাষ্ট্রপতি।
কথিত ফোনালাপ : গত বুধবার থেকেই আলোচনায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ। একটি ফেসবুক পোস্ট থেকেই এই আলোচনার সূত্রপাত। এরপর বিভিন্ন গণমাধ্যমে রাষ্ট্রপতির ফোনালাপের বিষয়টি ঘিরে তার পদত্যাগের খবর আরো ঘনীভূত হয়েছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যম ও ফেসবুক পোস্টে দাবি করা হয়েছে- রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন স্বাস্থ্য চিকিৎসার জন্য গত ৯ মে লন্ডনে যান। সেখানে বসে দিল্লিতে আশ্রয় নেয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। দাবি করা হয়েছে, এমন ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগের কথা বলা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুই-এক দিনের মধ্যে পদত্যাগ করবেন মো. সাহাবুদ্দিন। কিন্তু ফোনালাপের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছেন রাষ্ট্রপতি নিজেই। তিনি এটাকে পুরোটাই মিথ্যা বলেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে তিনি এক হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় বলেন, এটি কল্পনার বাইরে।
গতকাল বিকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম রাষ্ট্রপতির কথিত ফোনালাপের প্রসঙ্গে বলেছেন, এরকম ফোনালাপের তথ্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। এমন কিছু হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকার তদন্ত করে দেখবে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, শারীরিক অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি চাইলে পদত্যাগ করতে পারবেন। সংবিধানে সেই সুযোগ রয়েছে। তিনি চাইলে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দিতে পারবেন। এর বেশি কিছু জানা নেই।
পদত্যাগের সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতির : রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জনের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের (বঙ্গভবন) সচিব মো. নূরুল আমীন বৃহস্পতিবার বলেন, পদত্যাগপত্রে এখনো তিনি স্বাক্ষর করেননি। পদত্যাগ করলে জানানো হবে। তবে বঙ্গভবনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, স্পিকার দেশে না থাকায় চাইলেও এখনই পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারছেন না রাষ্ট্রপতি। পদত্যাগটা যার কাছে করবেন তিনি নিজেও দেশে নাই। সুতরাং এখন পদত্যাগের সুযোগও নেই। কত লোক কত কিছু বলবে, সেটা ধরে থাকলে তো আর চলবে না। রাষ্ট্রপতি ‘পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন’ জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেটা স্বাস্থ্যগত কারণেই হোক, আর মানসিক কারণেই হোক।
রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ একজনও স্পিকারের দেশে না থাকার বিষয়টি সামনে এনে বলেছেন, মহামান্য তার কর্মকর্তাদের বলেছেন, দুই-এক দিনের মধ্যে তিনি বঙ্গভবনের পাট চুকিয়ে ফেলতে পারেন।
মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০২৩ সালে বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ওই বছরের ২৪ এপ্রিল তিনি শপথ নেন। সে অনুযায়ী তার পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা।
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে : পরবর্তী রাষ্ট্রপতি বিএনপি থেকে কে হচ্ছেন? নাকি দলের বাইরে থেকে কাউকে রাষ্ট্রপতি করা হবে, এমন আলোচনাও গুরুত্ব পাচ্ছে। অনেকে বলছেন, তিনি পদত্যাগ করলে বিএনপি তাদের পছন্দ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নিয়োগের সুযোগ পাবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, বিএনপিতেই রাষ্ট্রপতি হওয়ার মতো ক্যারিয়ারসম্পন্ন যোগ্য প্রার্থী আছেন। হয়তো তাদের মধ্য থেকেই বাছাই করা হতে পারে। আর দলের বাইরের কাউকে আনার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপকালে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্তমান রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার আগ পর্যন্ত এ নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ নেই।
বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, তারা মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তারা এও জানান, এ নিয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
দলীয় সূত্র জানায়, পরবর্তী রাষ্ট্রপতির বিষয়ে দলের হাইকমান্ডে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। ভবিষ্যতের সম্ভাব্য কঠিন পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে দলের ক্লিন ইমেজধারী ও সিনিয়র নেতাদের প্রাধান্য দেয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আলোচনায় আছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সূত্র জানায়, বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে অবদানের কারণে হাইকমান্ডের গুডবুকে রয়েছেন তিনি।
এর বাইরে নতুন সরকারের কোনো পদে না থাকলেও আলোচনায় রয়েছেন আরো দুই বর্ষীয়ান নেতা। তারা সবাই স্থায়ী কমিটির সদস্য। তারা হলেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ড. আব্দুল মঈন খান। বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার মতে, উল্লিখিত তিন শীর্ষ নেতাই দলের পরীক্ষিত। যোগ্যতার দিক থেকেও অবিসংবাদিত। আলোচনায় ছিলেন আরেক বর্ষীয়ান নেতা ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার। গত ১২ জুলাই তিনি মারা যান।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া : ৯০ দশকের আগে সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার বিধান ছিল। ১৯৯১ সালে সংসদীয়-ব্যবস্থা চালুর পর আগের পদ্ধতি বাতিল হয়ে যায়। তখন থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হচ্ছেন এমপিদের পরোক্ষ ভোটে। তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত হয়ে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর। সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। এ ক্ষেত্রে কেউ দুইবারের বেশি এ পদে থাকতে পারবেন না।
মেয়াদ শেষ, পদত্যাগ বা অভিশংসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হয়ে থাকে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে ৩৫ বছরের বেশি ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মতো যোগ্য হতে হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ অবসানের কারণে পদ শূন্য হলে মেয়াদ-সমাপ্তির তারিখের পূর্ববর্তী ৯০ হতে ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। আর বিপক্ষে প্রার্থী না থাকলে তিনি বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হবেন। তফসিল ঘোষণার পর সংসদ অধিবেশন চলাকালীন এই নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হয়। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজনীয় সময়ে যদি অধিবেশনে না থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশন স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে ভোটগ্রহণের কমপক্ষে সাত দিন আগে অধিবেশন আহ্বান করবেন।
