বিমানের ফ্লাইট ঘিরে নিরাপদে স্বর্ণ পাচার চক্রের নেটওয়ার্ক
হরলাল রায় সাগর
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
স্বর্ণ চোরাকারবারের যেন নিরাপদ বাহনে পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমানের ফ্লাইটগুলো। তিন মাসের ব্যবধানে ধরা পড়েছে স্বর্ণের বড় দুটি চালান। পরিত্যক্ত অবস্থায় এসব স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে বিমানের বিশেষ জায়গা থেকে। একের পর এক কোটি কোটি টাকার স্বর্ণের চালান এভাবে বিমানে আসার ঘটনা প্রমাণ করে- বিমানবন্দরের কড়া নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে রাষ্ট্রীয় উড়োজাহাজের ভেতরেই গড়ে উঠেছে স্বর্ণ পাচারের শক্তিশালী অপরাধ চক্রের নিরাপদ নেটওয়ার্ক। নিয়মিত স্বর্ণ চোরাচালনের অভিযোগ আছে বিমানের বিরুদ্ধে। তবে মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। তাও আবার পরিত্যক্ত অবস্থায়। প্রতিষ্ঠানটির অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে স্বর্ণ চোরাচালানকারীদের সহায়তা ও স্বর্ণ ভাগবাঁটোয়ারা করে নেয়ার অভিযোগ পুরনো। চক্রের সুগভীর নেটওয়ার্ক ও পাচারের অভিনব কৌশলে ধরাশায়ী শুল্ক গোয়েন্দা, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ও এপিবিএনসহ নিরাপত্তায় নিয়োজিত সংস্থাগুলোর সদস্যরা। তবে এই চক্রের সদস্যরা তেমন ধরা পড়ছে না। কারণ মামলায় আসামি থাকে অজ্ঞাত। তদন্ত হয়, কিন্তু তা আলোর মুখ দেখে না। দেন-দরবারে বেশিরভাগ মামলায় আসামি থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর এ কারণে কঠোর নজরদারির পরেও স্বর্ণ চোরাচালন বন্ধ হচ্ছে না। এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে কারা চোরাচালান করছে।
জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজে বারবার এমন স্বর্ণ পাচারের ঘটনা বৈশ্বিক এভিয়েশন খাতে বাংলাদেশের মর্যাদা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। বিমানের ভেতরে থাকা কালো ভেড়া বা অপরাধীদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক রুটের বিমানগুলোতে সিসিটিভি ও স্ক্যানিং ব্যবস্থা আরো আধুনিক না করলে, রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাকে চোরাচালানের কলঙ্ক থেকে মুক্ত করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী; ইঞ্জিনিয়ারিং, বিমানের কারিগরি ও কেবিন ক্রু বিভাগের একটি অসাধু চক্র স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের মূল চালিকাশক্তি। এই চক্রের সদস্যরা নিজেরা যেমন পাচার করছে, তেমনি বাইরের মাফিয়া চক্র তাদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করছে।
চোরাকারবারিরা এখন আর শুধু যাত্রীদের শরীরে বা লাগেজে স্বর্ণ আনছে না। সাম্প্রতিক চালানের বড় অংশই উদ্ধার হচ্ছে বিমানের কার্গো হোল্ড (মালপত্র রাখার জায়গা) থেকে। উড়োজাহাজের ভেতরের প্যানেল, সিটের নিচে, টয়লেটের আয়নার পেছনে, এয়ারক্রাফটের প্যানেলের ভেতরে বিশেষ কায়দায় বা লাইফ ভেস্টের পকেটে আঠালো টেপ দিয়ে স্কচটেপ পেঁচিয়ে স্বর্ণ লুকিয়ে রাখা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানকারী চক্রের সদস্যরা প্রথমে স্বর্ণের বার সংগ্রহ করে বিমানে নির্দিষ্ট জায়গায় গোপন করে রাখে। এরপর বিমান ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেট ও চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর পরিচ্ছন্নতা কর্মী বা ক্যাটারিং সার্ভিসের অসাধু সদস্যরা তা বের করে আনে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বলয় ও মেটাল ডিটেক্টর ফাঁকি দিয়ে বিমানবন্দরের বাইরে স্বর্ণ পাচার করা হয়।
শুল্ক গোয়েন্দা, এপিবিএনসহ বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় নিয়োজিত অন্য সংস্থার সদস্যরা যখনই সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে বিমানে তল্লাশি চালায়, স্বর্ণগুলো পরিত্যক্ত বা বেওয়ারিশ অবস্থায় উদ্ধার হয়। ফলে মূল অপরাধী বা বহনকারী ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ইঞ্জিনিয়ারিং বা কেবিন ক্রু বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরাসরি সাহায্য ছাড়া উড়োজাহাজের স্পর্শকাতর জায়গায় স্বর্ণ লুকিয়ে রাখা অসম্ভব। বিগত সময়ে বেশ কিছু ঘটনায় বিমানের কর্মীরা জড়িত থাকার প্রমাণও মিলেছে।
দুবাই, শারজাহ বা আবুধাবি থেকে আসা ফ্লাইটগুলো যখন চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকায় অবতরণ করে, তখন অভ্যন্তরীণ যাত্রী নামানোর উছিলায় বিমানবন্দরের কাস্টমস ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করা হয়। বিমান অবতরণের পর গ্রাউন্ড স্টাফদের সহায়তায় স্বর্ণ বিমান থেকে নামিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে বাইরে পাচার করা হয়।
স্বর্ণ আটকের পর শুল্ক বিভাগ বিমানবন্দর থানায় মামলা করে ঠিকই, তবে তদন্তের গভীরে গিয়ে মূল অর্থ জোগানদাতা বা সিন্ডিকেটের গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। কাস্টমস হাউস, ডিজিএফআই এবং এপিবিএন তল্লাশি বাড়ালেও মূল হোতারা পর্দার আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। ঘটনার পর বিভাগীয় মামলা ও তদন্ত কমিটি গঠন হলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধ থামছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অভিযুক্ত হলেও তাদের বিরুদ্ধে খুব একটা কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্তা নেয়া হয় না। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বিমানের ভেতরের শত্রু বা কালো ভেড়াদের চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিলে, এই রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইন্সকে চোরাচালানমুক্ত করা অসম্ভব।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে ডিজিএফআই, এভসেক (এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি) ও কাস্টমসের সমন্বিত তৎপরতা ভালো ফল দিলেও, তা সাময়িক। পাচার পুরোপুরি বন্ধে দরকার স্থায়ী প্রযুক্তিগত নজরদারি।
গত ২ জুলাই সকালে ঢাকা কাস্টমস হাউস এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ অভিযানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-১৪৮ ফ্লাইট থেকে ১৮ কেজি ৭০০ গ্রাম (১৬০টি বার) স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য ৪২ কোটি টাকা। উড়োজাহাজটি দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসে। স্বর্ণগুলো উড়োজাহাজটির কার্গো হোল্ডে টেপ প্যাঁচানো পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল বলে জানিয়েছেন ঢাকা কাস্টম হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার কামরুল হাসান। এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা হয়েছে, যাতে কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি।
এর ঠিক তিন মাস আগে গত ২৮ মার্চ দিবাগত রাতে শাহজালাল বিমানবন্দরে বিমানের বিজি-৩৪৮ উড়োজাহাজের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেটের প্যানেলের ভেতরে সাদা কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম (১৫৩টি বার) স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। একটি গোয়েন্দা সংস্থা ও এভসেক এই স্বর্ণ উদ্ধার করে। ২৪ ক্যারেটের এসব স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪৬ কোটি টাকা। বিমানের এই ফ্লাইটটি দুবাই থেকে আসে। এ ঘটনায়ও একটি মামলা হয়েছে, যাতে আসামি হিসেবে কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন সময়ে স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততা মিলেছে। তাদের সঙ্গে নেপথ্যে কারা রয়েছে, সেটি বের করা যায় না।
বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বলেন, বিমানবন্দরকে চোরাকারবারিমুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই চেষ্টার কারণেই স্বর্ণের চালান ধরা পড়ছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম বলেন, ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না। যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিমানের কোনো কর্মীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুবাই থেকে আসা বিমানের একটি ফ্লাইটের (বিজি-২৪৮) সিটের নিচ থেকে পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় এক কেজি ১৬৬ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করে ২০২৪ সালের ৬ ডিসেম্বর। যার বাজার মূল্য ছিল এক কোটি ৩০ লাখ টাকা।
শাহজালাল বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটের (বিজি-১২২) টয়লেট থেকে ৪ কেজির ৪০টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয় ২০২৪ সালের ১৮ জানুয়ারি। যার আনুমানিক বাজারমূল্য সাড়ে চার কোটি টাকা।
দুবাই থেকে আসা সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানের একটি ফ্লাইট (বিজি ২৪৮) থেকে ৩৪ কেজি ৩৫১ গ্রাম (২৮০টি বার ও ৬টি পেস্ট করা স্বর্ণের ডিম) স্বর্ণ উদ্ধার করা হয় ২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর। স্বর্ণগুলো আসনের নিচে ও ওয়াশারুমে বিশেষভাবে মোড়ানো ছিল। যার বাজার মূল্য ছিল প্রায় ৩৫ কোটি টাকা।
২০২৩ সালের ১৮ মে মাস্কাট থেকে হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরে ল্যান্ড করা বিমানের একটি ফ্লাইটের (বিজি ১২২) কার্গো হোল্ড থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ২০৪টি স্বর্ণের বার। এই স্বর্ণের দাম প্রায় ২৫ কোটি টাকা। যথারীতি এ ঘটনায়ও অজ্ঞাতদের নামে মামলা হয়।
২০২১ সালের ২৫ অক্টোবর দুবাই ফেরত বিমানের একটি উড়োজাহাজের (বিজি-৪১৪৮) কার্গো হোল্ড থেকে ১২ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা।
আবুধাবি থেকে আসা বিমানের একটি ফ্লাইট (বিজি-১২৮) থেকে ২০২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ১৭ কেজি ৪০ গ্রাম ওজনের ১৫০টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। যার আনুমানিক বাজার মূল্য ১০ কোটি টাকা। স্বর্ণগুলো দুই সিটের পেছনের প্যানেলের পায়ের নিচে টেপ মোড়ানো অবস্থায় ছিল। এ ঘটনায় মামলা হলেও কাউকে আসামি করা হয়নি।
২০২২ সালের ২৫ এপ্রিলে একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের তথ্যমতে, এর আগের আড়াই বছরে বিমানের বিভিন্ন ফ্লাইট থেকে অন্তত আড়াইশ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। সে সময় এর বাজারদর ছিল প্রায় ১৫০ কোটি টাকা।
২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৬২ কেজি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। সেই ঘটনায় মামলা হলে বিমানের তিন কর্মকর্তাকে ১৪ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ডের রায় ঘোষণা করে আদালত। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- বাংলাদেশ বিমানের এয়ারক্রাফট মেকানিক আনোয়ারুল হাসান, আবু সালেহ এবং আক্তারুজ্জামান। দণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো এক মাসের কারাভোগের আদেশ দেয়া হয়। এছাড়া শাহজালাল বিমানবন্দরে বিমানের একটি উড়োজাহাজের টয়লেট থেকে ১০৮ কেজি স্বর্ণ জব্দের ঘটনায় চোরাচালান দলের সদস্য ইকরামুল হককে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ।
