জ্বালানির মজুত তলানিতে, শঙ্কা
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
টানা ১৩ দিন পাল্টাপাল্টি হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সামরিক সংঘর্ষ সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে আবারও কমতে শুরু করেছে জ্বালানি তেলের দাম। এমন খবরে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও এই সংঘাতের কারণে ইতোমধ্যে লোহিত সাগর ও কাস্পিয়ান সাগর অঞ্চলের মতো নতুন নতুন জলসীমায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এতে গত ছয় মাসের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় জ্বালানি খাতে হিমশিম খাচ্ছে এশিয়ার দেশগুলো। বিশেষ করে মজুত কমে যাওয়ায় অনেক দেশ এখন ‘তলানি ঘাঁটছে’।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে সৌদি আরবের জন্য নৌ অবরোধ জারি রেখেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উভয়পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে ওই অঞ্চলে তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। যা একপ্রকার অলিখিত অবরোধের মতোই।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৭০ শতাংশ লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে রপ্তানি করে সৌদি আরব। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার পর সৌদি আরব তাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ব্যবহার করে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি বহুগুণ বাড়িয়েছিল। কিন্তু বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে হুতিদের অবরোধের ফলে সেই বিকল্প পথটি এখন পুরোপুরি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। লোহিত সাগরে সৌদির তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দাবি এবং হুতিদের কড়াকড়ির কারণে অনেক জাহাজ পথ পরিবর্তন বা ইউটার্ন করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে সৌদির দৈনিক তেল লোডিং এবং বৈদেশিক মুদ্রার আয় কমিয়ে দিচ্ছে। এ কারণে সৌদির অর্থনীতি ও রাজস্ব আয়ে বড় বিপর্যয় নেমে আসার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে এটি নতুন একটি ফ্রন্ট হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মিত্রদের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া এই বিমান হামলা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। একই সঙ্গে আবার জোরালো হতে পারে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ।
গত সোমবার হুতি বিদ্রোহীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, লোহিত সাগর দিয়ে সৌদির কোনো পণ্য রপ্তানি করতে দেয়া হবে না। এমন পরিস্থিতিতে চাপে পড়েছে জাপান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো। এসব দেশ তাদের আমদানির ৯০ শতাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে ক্রয় করে থাকে। এখন হরমুজ প্রণালি ও বাব এল-মান্দেব প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ থাকায় চাপে পড়েছে এশিয়ার এসব দেশ। সরবরাহ নিশ্চিত করতে এখন নানা চেষ্টা চালাচ্ছে তারা।
ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, গত মার্চ মাসে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাব এল-মান্দেব প্রণালিকে এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি সরবরাহের ‘লাইফলাইন’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায়
এই পথ দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হতো। তবে সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবার সংঘাত শুরু হওয়ায় শিগগিরই জলপথটি স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ নেই। এ অবস্থায় বর্তমানে তেল পরিবহনের জন্য কেবল সুয়েজ খালই সচল আছে। গতকাল মঙ্গলবার দ্য গার্ডিয়ান তাদের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানিয়েছে।
এমন অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে- হঠাৎ কেন ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি আরব যুদ্ধে জড়াল? মূলত রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণে সৌদি আরবকে টার্গেট করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের বিরোধিতা, লোহিত সাগরে নৌ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং আঞ্চলিক সংঘাতে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়। এ ক্ষেত্রে হুতিদের মদদ দিয়েছে ইরান। এমনকি অভিযোগ রয়েছে, হুতি বিদ্রোহীদের কাছে ইরানি অস্ত্র মজুত রয়েছে। প্রকাশ্যে সৌদিকে সমর্থন জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রও।
অপরদিকে হরমুজ নিয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র। ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এই জলপথ ব্যবহারের জন্য তারা ফি বা মাসুল আদায় অব্যাহত রাখবে। ইতোমধ্যে অনুমতি না থাকায় স¤প্রতি হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টাকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ফিরিয়ে দিয়েছে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এমনকি নির্দেশনা না মানার কারণে কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলাও চালিয়েছে তেহরান। এ নিয়ে বিরোধে গত শুক্রবার পর্যন্ত টানা ১৩ রাত ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাল্টা হামলা চালিয়ে জবাব দিয়েছে ইরান।
হরমুজ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা, প্রণালিতে ইরানের একক নিয়ন্ত্রণ ও টোল আদায়ের দাবি প্রতিহত করা এবং মাইন অপসারণ করে জলপথটি উন্মুক্ত রাখা। হরমুজ ইস্যুতে এসব শর্তেই ইরানের সঙ্গে মূল বিরোধ যুক্তরাষ্ট্রের।
এছাড়া হরমুজ প্রণালি পরিচালনার জন্য ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে একটি যৌথ আঞ্চলিক ব্যবস্থা গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে ওমান। এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো প্রণালিটির ওপর ইরানের একক নিয়ন্ত্রণ না রেখে মালাক্কা প্রণালির আদলে স্বেচ্ছামূলক ফি ব্যবস্থার মাধ্যমে নৌ-চলাচল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
আল-জাজিরা ও সিএনবিসি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বব্যাপী তেল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ধমনি হিসেবে মনে করা হয়। বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি হয়। যা প্রতিদিন বিশ্ব তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। তবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ওমানের ত্রি-মুখী দাবির কারণে হরমুজ কার্যত বন্ধ রয়েছে।
অন্যদিকে রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ক্রেমলিন জানিয়েছে, সম্প্রতি কাস্পিয়ান সাগরে জাহাজের ওপর চালানো হামলাটিকে ইরানের ওপর হামলা হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত। ক্রেমলিনের মতে, এই ঘটনাটি দেখিয়ে দিচ্ছে ইউক্রেন থেকে আসা হুমকি নির্মূল করা কতটা জরুরি।
এর আগে ইউক্রেন দাবি করেছিল, কাস্পিয়ান সাগরে রাশিয়ার সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী দুটি জাহাজে ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা। জাহাজ দুটি ইরান থেকে রাশিয়ার একটি বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেনস্কি বলেছিলেন, হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল ‘ইরান থেকে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে জড়িত জাহাজ’ এবং একটি যুদ্ধজাহাজ। পরে ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থা দাবি করে, যুদ্ধজাহাজটি ছিল রাশিয়ার একটি ক্ষেপণাস্ত্রবাহী নৌযান।
এই হামলার বিষয়ে মঙ্গলবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ‘কিয়েভ শাসকগোষ্ঠী কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের একটি পণ্যবাহী জাহাজ উড়িয়ে দিয়েছে। এটি ইরানের ওপরই চালানো একটি হামলা।’ মূলত এসব হামলার ঘটনায় ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি।
থিঙ্কট্যাঙ্ক এশিয়া গ্রুপের উপসাগরীয় অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ হেলাল বলছেন, এশিয়ায় এখন জ্বালানি খাতে খুব বেশি মজুত নেই। বিশ্বব্যাপী সংরক্ষিত মজুতের সক্ষমতাও প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে কমতে শুরু করেছে জ্বালানি তেলের দাম। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ২ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৮৪ দশমিক ০৩ ডলারে বিক্রি হয়। অপরিশোধিত মার্কিন তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল বিক্রি হয় ৮১ দশমিক ২০ ডলারে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এর দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭২ ডলার। মাঝে বহুদিন এই দাম ১০০ ডলারের ওপরে ছাড়িয়ে যায়।
সোমবার মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টায় বড় অগ্রগতি হয়েছে। বেশ কিছুদিন হামলা স্থগিত রাখার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। ফলে তেলের বাজারে অস্থিরতা কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে আবার কঠোর হামলার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রয়টার্স ও এএফপি জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে ‘ভালো’ ও ‘গভীর’ আলোচনা চলছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে ওই হুমকিও দিয়েছেন তিনি। কিন্তু ইরান পাল্টা দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান চললেও বর্তমানে কোনো আলোচনা হচ্ছে না।
উল্লেখ্য, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালি ও বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে বাধা ও তেলের জোগান কমায় জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে। এতে বিশ্ব অর্থনীতি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো বেশি ভুক্তভোগী। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকল্প উৎস খুঁজছে তারা। তাই বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে আলোচনার পথ খোলা রেখে যুদ্ধ নয়, বরং শান্তিতেই বিশ্বাসী বিশ্বনেতারা।
