ধুঁকছে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা, উদ্যোগ থাকলেও সুফল কম
আজিজুর রহমান জিদনী
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বসবাসের অযোগ্য শহর হিসেবে ঢাকার স্থান তৃতীয়। এ জন্য জনবহুল এ শহরের যানবাহন ব্যবস্থাকেই দায়ী করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। গত বছরের একটি তথ্য বলছে ঢাকায় যানজটের কারণে বছরে প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। শুধু কর্মঘণ্টা নষ্ট আর অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; যানজটের কারণে নগরবাসীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যেরও অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। ঢাকার সড়কগুলোতে ধীর, মধ্য ও দ্রুতগতির প্রায় ১৮ সংস্করণের যানবাহন চলাচল করে। মেট্রোরেলের মতো আধুনিক ও গতিশীল গণপরিবহন ব্যবস্থা থাকার পরও পরিস্থিতি ভালো হচ্ছে না। বর্তমান সরকার এ পরিস্থিতি উন্নয়নে নানা পরিকল্পনা নিচ্ছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিজেও তার প্রটোকল কমিয়েছেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গেই তার গাড়ি বহর প্রায়ই রাস্তায় চলাচল করতে দেখা যায়। ৭ জন ছাড়া ১৮ মন্ত্রীর পুলিশ এসকর্ট প্রত্যাহার করা হয়েছে। রাজধানীর ১৭ স্থানে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে রাজধানীতে আরো ৫০টি স্থানে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক বাতি চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ফিটনেসবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও পরিবেশদূষণকারী বাস, ট্রাক এবং অন্যান্য যানবাহন দ্রুত অপসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সরকারপ্রধান।
তবে যোগাযোগ ও পরিবহন অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঠেলা-গুঁতা বা শুধু সভা করে বা কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার প্রজেক্ট নিয়ে ঢাকার ট্রাফিক সমস্যা নিরসন ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়, বিনিয়োগ দিয়েও পরিস্থিতি উন্নয়ন সম্ভব নয়। এখানে দরকার দক্ষ লোকের। দরকার কঠোর রেগুল্যাটরিং বডি। সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাকে ভালো করতে যে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা আগে ঠিক করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক সিগন্যাল ও ক্যামেরা স্থাপন তখনই সুফল বয়ে আনবে, যখন ট্রাফিক ব্যবস্থা শৃঙ্খলে থাকবে। বিশৃঙ্খল অবস্থায় এর সুফল পাওয়া তেমন সম্ভব নয়। পুলিশ বলছে, নানা প্রতিবন্ধকতার পরও ট্রাফিক ব্যবস্থা উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে তারা। অনেক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সামনেই এর সুফল মিলবে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরের মোট ভূমির মাত্র প্রায় ৭-৭.৫ শতাংশ সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অথচ উন্নত বিশ্বের অনেক বড় শহরে সড়কের জন্য ২৫ শতাংশ বা তারও বেশি ভূমি বরাদ্দ থাকে। এই সীমিত সড়ক নেটওয়ার্কের ওপর প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মোটরযান ও অমোটরযান চলাচল করে, ফলে যানজট কার্যত অনিবার্য হয়ে ওঠে। নাগরিকরা গতিশীল জীবনকে ছন্দময় করার জন্যই পরিবহন ব্যবহার করেন। কিন্তু আমাদের প্রিয় মহানগরবাসীর যাপিত জীবনে ছন্দপতনই ঘটছে মান্ধাতার আমলের গণপরিবহন ও চরম অব্যবস্থাপনা জন্য।
যোগাযোগ ও পরিবহন অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এরআই) সাবেক পরিচালক ডা. মো. শামসুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, ঠেলা-গুঁতা বা শুধু সভা করে বা কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার প্রজেক্ট নিয়ে ঢাকার ট্রাফিক সমস্যা নিরসন ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়। এমন হলে যদি পরিস্থিতি ভালো হতো তাহলে বিগত সরকারগুলোর আমল থেকেই নাগরীকরা সুফল ভোগ করা শুরু করতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট হতো না। রংচটা ওঠা বাস ও অন্যান্য পরিবহন এবং ‘বাংলার টেসলা’ সড়কে দেখা যেত না। ফুটপাথগুলো হতো জনবান্ধব।
অনেক উদ্যোগ বা হাজার-হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট নিলেও এতদিনেও কেন কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়নি, তার কারণ উল্লেখ করে এই গবেষক বলেন, যেকোনো কিছুই একটি কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত হয় না। যেমন- রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন জনগণ দ্বারা নির্বাচিত সরকার। তেমনি সরকারের অর্গান হিসেবে বিভিন্ন জায়গা পরিচালনায় রেগুল্যাটরি বডি দায়িত্বে থাকে। তাদের ব্যবস্থাপনাতেই এগিয়ে যায় নানা পরিকল্পনা। কিন্তু আমাদের দেশে এ ব্যবস্থাই অব্যবস্থাপনার জন্য অন্যতম দায়ী। ডা. মো. শামসুল হক বলেন, একটি শহরে কত জনগণ থাকবে, কী পরিবহন ব্যবস্থা থাকবে, পার্কিং কেমন হবে ও সড়কগুলো কেমন হবে সবই একটি দক্ষ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু আমার ধারণা আমাদের সংশ্লিষ্ট খাতে দক্ষ লোকের আভাব রয়েছে। একটা আনরেস্ট সিস্টেমে আছি আমরা। ডা. মো. শামসুল হক বলেন, একটি উন্নত দেশের শহরে যে পরিমাণ রাস্তা থাকার দরকার সেই তুলনায় ঢাকায় রাস্তা অনেক কম। এর মধ্যে প্রতিবছর খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলতে থাকেই। এমনো হয়েছে, কিছুদিন আগে যে ভাঙা সড়ক ঠিক করা হয়েছে তা ফের আবার উন্নয়নের নামে কাটা হয়েছে। ফুটপাথে পথচারী হাঁটার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয় না কারণ সেখানে দোকানের পসরা। ঢাকায় সড়কে কত যানবাহন চলাচল করবে বা করানো সম্ভব জানে না কর্তৃপক্ষ। পার্কিং কোথায় থাকবে- এর কোনো বালাই নেই। যেকোনো বাণিজ্যিক ভবন চাইলেই কনভেনশন সেন্টারের রূপান্তরের অনুমতি মিলছে, পার্কিং লট থাকুক বা না থাকুক। এখন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা ‘বাংলার টেসলা’। বাস ফ্রাঞ্চাইজে এখনো যেতে পারেনি আমরা। যা নগর পরিবহন ব্যবস্থাপনার জন্য অন্যতম নিয়ামকের একটি। এমন নানা অনিয়মে ভরপুর ঢাকা। সম্প্রতি রাজধানীর দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যার সমাধানে ১২০টি ট্রাফিক মোড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক সিগন্যাল ও ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। কয়েকটি সড়কে চালু হয়েছে তা। যেসব সড়কে সব ধরনের গতির যানবাহন চলে না, ঝামেলা কম বা ভিআইপি মুভমেন্ট বেশি, সেখানেই এআই ও স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালগুলো দেখা যাচ্ছে। এরপরেও এটি ভালো একটি উদ্যোগ। কিন্তু বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা বলে এআই সবচেয়ে ভালো কাজ করে সু-শৃঙ্খল জায়গায়। বিশৃঙ্খল জায়গায় এর সুফল তেমন মেলে না। রাস্তায় যদি নানা গতির গাড়ি চলে, নম্বর-প্লেটবিহীন যানবাহন থাকে, পথচারী পারাপরের সুব্যবস্থা না থাকে তাহলে এআই দিয়ে সুফল মেলা দূরহ। পরিশেষে বলব বিনিয়োগ বা নানা প্রজেক্ট দিয়েই এ ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রয়োজন কার্যকরী রেগুল্যাটরি বডি। এসব ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সংস্কার। দক্ষ লোকের নিয়োগ ও কঠোর মনিটরিং।
রাজধানীতে রাস্তার তুলনায় প্রায় ৩ লাখ যানবাহন বেশি চলছে। এছাড়া প্রতিদিন গড়ে ২৩০টি নতুন গাড়ি রাস্তায় নামছে। ঢাকা শহরের মোট আয়তন ৮১৫ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার। এ হিসাবে ২০৪ কিলোমিটার রাস্তার প্রয়োজন হলেও ঢাকা শহরে প্রধান রাস্তার পরিমাণ মাত্র ৮৮ কিলোমিটার। এই পরিমাণ রাস্তায় ৫ লাখ যানবাহন চলাচল করছে। অথচ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী রাস্তায় ২ লাখ ১৬ হাজার যানবাহন চলাচল করার কথা।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, অন্যতম জনবহুল শহর ঢাকায় প্রতিদিন ৩০-৪০ লাখ যানবাহন চলাফেরা করে থাকে। শহরে পরিবেশ দূষণের সঙ্গে রয়েছে উন্নয়ন সংস্থার কাটাকাটি। বর্ষায় বৃষ্টি হলে জলজট। এর মধ্যে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা অটোরিকশা। জনবলেরও একটা স্বল্পতা রয়েছে। এতকিছুর মধ্যেও ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে দিন-রাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকার ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা ভালোর জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাজধানীর ১৭টি জায়গায় স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা কাজ করছে। রয়েছে এআই ক্যামেরা। দ্রুত সময়ের মধ্যে রাজধানীতে আরো ৫০টি স্থানে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক বাতি চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জনগণ আইন মানতে চান তবে তাদের জন্য ভালো প্ল্যাটফর্ম দরকার উল্লেখ করে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের এ মুখ্য কর্মকতা বলেন, এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে মহাখালী বাস টার্মিনাল পূর্বাচলে নেয়ার কাজ শুরু হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে ১ মাসের মধ্যে তা শেষ হবে। এমনটা হলে টার্মিনাল ঘিরে তৈরি যানজট অনেকটা কমে আসবে। ফুলবাড়ি বাসস্ট্যান্ড বলতে কিছু নেই, যা ইতোমধ্যে সায়দাবাদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। চুনকুটিয়াতে বাস টার্মিনাল স্থানান্তর হলে পরিস্থিতি আরো ভালো হবে। ডিএমপির পক্ষ থেকে ৭৬টি ডাইভারশন করা হয়েছে রাজধানীজুড়ে। এতে গাড়ি চলাচলের গতি এসেছে। আর নিয়মিত অভিযানতো চলছেই। আমরা প্রতিমাসে আইনভঙ্গ করা যানবাহনকে জরিমানার আওতায় আনছি। প্রায় ১২ কোটি টাকার মতো জরিমানা আদায় হয় প্রতিমাসে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে (ডিটিসিএ) আমরা চিঠি দিয়েছি ঢাকার ট্রাফিক পরিস্থিতির এখন কী অবস্থায় দেখছেন। তাদের প্রতিবেদন আমাদের কর্মকাণ্ড মূল্যায়িত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
