ফের ‘রাজপথে’ নামার হুমকি দিলো ককরোচ, টিকবে কি মোদির চাল
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ভারতজুড়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভের মুখে গ্রেপ্তার সবাইকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়া না হলে আবারও রাজপথে নামার হুমকি দিয়েছে জেন-জি প্রজন্মের নেতৃত্বে পরিচালিত ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটির অভিযোগ, গত ২৫ জুলাই আন্দোলন স্থগিত করার পর দেশজুড়ে ১০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দেয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, চুক্তি না মেনে অবিলম্বে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তি না দিলে আবারও আন্দোলন শুরু হবে।
গত সোমবার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে না আসতে মোদি সরকারকে সতর্ক করে সিজেপি বলেছে, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল মোদি সরকার। এখন সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হচ্ছে। পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম, পশ্চিমবঙ্গ এবং বিহারে শিক্ষার্থীদের আটকে রাখা হয়েছে। পুলিশের ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত বিক্ষোভকারীদের আইনি খরচ মেটাতে একটি আইনি তহবিল গঠন করেছে তারা। দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
শুধু সিজেপিই অভিযোগ করেনি, গ্রেপ্তারের ঘটনায় আলাদা করে বিহারের পুলিশ প্রধানের সঙ্গে দেখা করেছেন যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে অংশ নেয়া অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইএসএ) সদস্যরা। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তি না দিলে আন্দোলন নতুন করে শুরু করার হুমকি দিয়েছেন তারা।
এরপর গত সোমবার বিহার পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে না। এর আগের দিন রবিবার স্থানীয় সময় ৬টার আগে পর্যন্ত করা সব মামলা প্রত্যাহার করা হবে বলেও ঘোষণা দিয়েছিল তারা। আইএসএ বলেছে, আসাম সরকারও মামলা প্রত্যাহার করেছে এবং আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তি দিয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি ভিন্ন।
গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে ‘আপত্তিকর পোস্টার’ প্রদর্শনের অভিযোগে সোমবার নতুন করে মামলা করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ওই সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিল। এ পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে রাজ্য পুলিশ। তাদের অধিকাংশই মুসলিম।
শুক্রবার অনুষ্ঠিত সমাবেশে মোদির একটি কার্টুনচিত্র হাতে ধরে রাখার অভিযোগে অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে পুলিশ। ভারতীয় এই নেতাকে (মোদি) নিয়ে একটি ‘আপত্তিকর ছবি’ পোস্ট করার জন্য আরো একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এর আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলে দায়ের হওয়া বেশ কিছু আবেদনের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছিল, শান্তিকামী কোনো আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া যাবে না। দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ নির্দেশ দেন, যেসব শিক্ষার্থীর কোনো পূর্ব অপরাধমূলক রেকর্ড নেই, তাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। তবে একই নির্দেশনায় আদালত এ-ও উল্লেখ করে যে, নিবন্ধিত এফআইআরগুলোর তদন্ত প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারবে পুলিশ, যদিও কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়া যাবে না।
আদালতের এই পর্যবেক্ষণের পরই সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার দাবি, কেন্দ্র সরকারের এই অবস্থান শিক্ষার্থীদের দেয়া প্রতিশ্রুতির সম্পূর্ণ বরখেলাপ। তিনি জানান, গত ২৫ জুলাই সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল যে আন্দোলনের সময় দায়ের হওয়া সমস্ত এফআইআর তুলে নেয়া হবে এবং কোনো আন্দোলনকারীকে নিশানা করা হবে না। সেই সুনির্দিষ্ট আশ্বাসের ওপর আস্থা রেখেই সিজেপি তাদের দেশব্যাপী বিক্ষোভ প্রত্যাহার করেছিল।
এ বিষয়ে সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, ‘এখন সরকার যদি চুক্তিকে সম্মান না করে এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তি না দেয়, তবে আবারও আন্দোলন শুরু করতে বাধ্য হব আমরা।’
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোদিকে গালমন্দ করে দেয়া পোস্টের ওপরও দিল্লি পুলিশ নজরদারি শুরু করেছে। তিনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মকে ‘আপত্তিকর ভাষা এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য’ সংবলিত পোস্টগুলো সরিয়ে ফেলতে অনুরোধ করেছে পুলিশ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা পিটিআইকে বলেন, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের কনটেন্ট চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়ে গেছে।
এর আগে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার (নিট) প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা বাতিল ও চরম অনিয়মের দায়ে সিজেপির তীব্র আন্দোলনের মুখে গত ২৫ জুলাই দেশটির শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ধর্মেন্দ্র প্রধান। নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরের শাসনকালে এটি কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগের বিরল এক ঘটনা।
মূলত ককরোচদের এই আন্দোলন এতোটা তীব্র হওয়ার পেছনে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জোড়ালো সমর্থন ছিল। বিশেষ করে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর ভূমিকা। ককরোচদের এই আন্দোলনের সূত্রপাত গত মে মাসে। ওই সময় এক শুনানিতে ভারতীয় বেকার তরুণদের ‘ককরোচ (তেলাপোকা)’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেন দেশটির প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত। তিনি বলেছিলেন, ‘কিছু তরুণ তেলাপোকার মতো, যারা কোনো চাকরি পান না কিংবা পেশাগতভাবে কোথাও দাঁড়াতে পারেন না। তাদের কেউ কেউ গণমাধ্যমকর্মী বনে যান, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী হন, আবার কেউ তথ্য অধিকারকর্মী বা অন্য কোনো ধরনের অ্যাকটিভিস্ট হয়ে সবাইকে আক্রমণ করা শুরু করেন।’ যদিও পরে প্রধান বিচারপতি দাবি করেন, তিনি ভুয়া ডিগ্রিধারীদের উদ্দেশে এমন মন্তব্য দিয়েছিলেন। তবে ততক্ষণে জল গড়িয়েছে বহুদূর।
প্রধান বিচারপতির এমন বক্তব্যে বেশ অপমান বোধসহ আঘাত পান তরুণরা। তারা ক্ষোভ উগড়ে দেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের ডাক দেয় সিজেপি। তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চান। ওই সময় আন্দোলন কিছুদিন চলমান ছিল। এরপরই নতুন করে গত ২০ জুলাই থেকে শুরু হয়ে ২৫ জুলাই পর্যন্ত যন্তর মন্তরে তীব্র আন্দোলন চলে। এ সময় ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগসহ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকের পরিবারকে ১ কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয় সরকার। পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সব মামলা প্রত্যাহার, আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতনের জন্য দিল্লি পুলিশের প্রকাশ্যে ক্ষমাপ্রার্থনা এবং ৫ দফা সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে প্রতিশ্রæতি দেয় মোদি সরকার। তবে এখন নতুন করে বিক্ষোভকারীদের ধরপাকড়ে আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে সিজেপি।
উল্লেখ্য, নিট (এনইইটি), সিবিএসই, সিইউইটি ও এসএসসিসহ বিভিন্ন প্রবেশিকা ও নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ আর ব্যঙ্গের মধ্য দিয়ে জন্ম হয় অপ্রথাগত রাজনৈতিক দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামকে ব্যঙ্গ করে এই নামকরণ করা হয়। এখন দেখার বিষয় কূট চালে কে এগিয়ে থাকে- সিজেপি নাকি মোদি সরকার।
