×

প্রথম পাতা

আইসিটি

বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড সমুন্নত রাখতে কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। এই ব্যর্থতার ফলে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া, আইনের শাসন দুর্বল হওয়া, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মিথ্যা অভিযোগে কারাবন্দি করা এবং অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

শাপলা চত্বর মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের অভিযোগপত্র জমা পড়ার বিষয়টি সামনে এনে গতকাল বুধবার এই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ১৩ বছর আগে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ‘হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের’ মামলায় গত ২৭ জুলাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। ওই মামলার আসামিদের মধ্যে রাজনীতিবিদ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং দুই সাংবাদিকও রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত অসংখ্য নিপীড়নের জন্য দায়ীদের উপযুক্ত জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত, তবে অনেক বিচার প্রক্রিয়াই আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। বাংলাদেশের উচিত জরুরি ভিত্তিতে তাদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সংস্কার করা এবং ত্রæটিপূর্ণ তদন্ত ও মনগড়া অভিযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার কোনো সুযোগ যেন না থাকে, তা নতুন সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের কোটাবিরোধী থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ওই আন্দোলনে ৮০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং হাজার হাজার মানুষ গুরুতর আহত হয়। এছাড়া অনেক পুলিশ সদস্য হতাহত হন।

ওই ঘটনাগুলোর পাশাপাশি শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত কথিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের মতো অন্য নিপীড়নের ঘটনাগুলোর বিচার এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হচ্ছে।

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১০ সালের মার্চ মাসে এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল। সে প্রসঙ্গ ধরে এইচআরডব্লিউ লিখেছে, ওই বিচার প্রক্রিয়ায় ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর হলেও তা পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব, প্রসিকিউটর ও বিচারকদের মধ্যে যোগসাজশ এবং মৌলিক আইনি সুরক্ষার অভাবে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল।

হাসিনা সরকারের পতনের পর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনাল এ পর্যন্ত ছয়টি রায় আসার কথা তুলে ধরে এইচআরডব্লিউ বলছে, এসব মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ৬২ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনাসহ ৪২ জনের বিচার হয়েছে তাদের অনুপস্থিতিতে। এসব মামলার রায়ে ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২৪ সালে আন্দোলনের পর দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ট্রাইব্যুনাল পরিচালনা আইনে সংশোধনী এনে অপরাধের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনে, যাতে তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কাছাকাছি যায়।

তবে এইচআরডব্লিউর মতে, এই সংশোধনীগুলো একই ধরনের অপরাধের বিচার করা আন্তর্জাতিক আদালতগুলোর সমতুল্য যথাযথ প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিগত মানদণ্ড নিশ্চিত

করতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সরকার আইনে আর কোনো সংশোধনী আনেনি।

মানবাধিকার সংস্থাটি বলছে, ট্রাইব্যুনাল পরিচালনা আইনে এখনো প্রসিকিউটরদের কোনো ধরনের প্রমাণের ভিত্তি ছাড়াই গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয়া, মাসের পর মাস লিখিত কারণ দর্শানো ছাড়াই আটকে রাখা এবং আলাদা কোনো আদালতে অন্তর্বর্তীকালীন আপিলের (ইন্টারলোকিউটরি আপিল) অধিকার না দেয়ার বিধান রয়ে গেছে। প্রসিকিউশন তাদের প্রমাণাদি জমা দেয়ার মাত্র তিন সপ্তাহ পরই বিচার শুরু হতে পারে, যা আসামিপক্ষকে আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় দেয় না। তাছাড়া, আসামিদের অনুপস্থিতিতে বিচারে তাদের নিজের আইনজীবী নিয়োগের অধিকারসহ যথাযথ আইনি সুরক্ষা নেই এবং সাক্ষীদের জেরা করার ক্ষেত্রেও আইনজীবীদের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়।

শাপলা চত্বর মামলার প্রসঙ্গ ধরে এইচআরডব্লিউর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহের জেরে গত ১৪ মে দুজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সে সময় (২০১৩ সালে) অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে একাধিক বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর কথা জানালেও প্রসিকিউটররা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সমর্থক একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু এবং উপস্থাপক ফারজানা রুপার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে সরকারকে হত্যা ধামাচাপা দিতে সহায়তার অভিযোগ আনেন।

সাংবাদিকদের আইনজীবীরা এইচআরডব্লিউকে বলেছেন, প্রসিকিউটররা তাদের গ্রেপ্তারের কারণ সম্পর্কে কোনো লিখিত ব্যাখ্যা দেননি, যা সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটসসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির ১৪ অনুচ্ছেদ এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের লঙ্ঘন।

এইচআরডব্লিউ বলেছে, গত ২৭ জুলাই ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়া শাপলা চত্বর মামলার অভিযোগপত্রে ওই দুই সাংবাদিককেও আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাশাপাশি গণহত্যার অভিযোগও আনা হয়েছে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এইচআরডব্লিউ তাদের পর্যবেক্ষণে দেখতে পেয়েছে, ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এবং বিচারকরা তদন্তকারী কর্মকর্তাদের রেকর্ড করা এমন কিছু সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করছেন, যেগুলোর একই অনুচ্ছেদ একাধিক সাক্ষীর জবানবন্দিতে হুবহু প্রতিলিপি (কপি-পেস্ট) করা হয়েছে। এতে এসব সাক্ষ্যের সত্যতা নিয়ে গভীর সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

এর উদাহরণ হিসেবে হাছান মাহমুদ চৌধুরী ও অন্যদের বিরুদ্ধে মামলার কথা বলেছে এইচআরডব্লিউ। সেখানে বলা হয়, ওই মামলায় ২০২৪ সালের ১৬ ও ১৮ জুলাই এবং ৪ আগস্ট চট্টগ্রাম শহরে হত্যার ঘটনায় আওয়ামী লীগের ২২ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। সেখানে প্রসিকিউশনের প্রমাণের মূল ভিত্তি হলো ৫৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দি।

দেখা গেছে, ১৪টি আলাদা জবানবন্দিতে ছয় লাইনের একটি অনুচ্ছেদ প্রায় হুবহু লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, নাম উল্লেখিত সাতজন রাজনীতিবিদ তাদের পরিকল্পনা, অর্থায়ন, উসকানি এবং নির্দেশনায় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে ছয়জনকে হত্যা করেছেন। আরেকটি দীর্ঘতর অনুচ্ছেদে আরো নয়টি জবানবন্দিতে প্রায় একইভাবে এসেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে অভিযুক্তদের মধ্যে ছয়জন বারবার উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের জঙ্গি, সন্ত্রাসী এবং সা¤প্রদায়িক উসকানিদাতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং বাকি ১৬ জন অভিযুক্তকে আন্দোলন দমাতে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং নিরীহ, নিরস্ত্র, শান্তিপূর্ণ শিক্ষার্থী ও জনতাকে হত্যা ও নির্যাতনের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন।

এইচআরডব্লিউ বলছে, ওই মামলার আসামি আওয়ামী লীগ নেতা এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবীরা সাংবাদিকদের একটি অডিও রেকর্ডিং সরবরাহ করেছেন। সেখানে অভিযোগ করা হয়, ট্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউটর চলতি বছরের শুরুতে ১ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে ফজলে করিমের জামিনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ওই তথ্য ফাঁসের পর ওই প্রসিকিউটর পদত্যাগ করলেও চিফ প্রসিকিউটর অফিস এখনো এর তদন্ত শেষ করতে পারেনি। অথচ বিচারকরা মামলার অভিযোগ গঠনের কাজ চালিয়ে গেছেন এবং আগামী ৬ আগস্ট থেকে বিচার শুরু হতে যাচ্ছে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে অনুধাবন করতে হবে যে, আওয়ামী লীগ যেরকম রাজনৈতিক উইচ-হান্ট চালিয়েছে, সেই একই নিপীড়নের পুনরাবৃত্তি তারা করতে পারে না। কিন্তু হুবহু নকল করা সাক্ষীর জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে অভিযোগ আনা হলে তা একটি বিশ্বাসযোগ্য বিচারপ্রক্রিয়ার ঘাটতিই ইঙ্গিত দেয়, যা আবারো ভুক্তভোগী, তাদের পরিবার এবং বাংলাদেশের মানুষের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

নতুন হেয়ারস্টাইলে ফের আলোচনায় কুকুরেয়া

নতুন হেয়ারস্টাইলে ফের আলোচনায় কুকুরেয়া

বিশ্বকাপের হতাশা কাটিয়ে অনুশীলনে ফিরলেন মেসি

বিশ্বকাপের হতাশা কাটিয়ে অনুশীলনে ফিরলেন মেসি

শনিবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক

শনিবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক

আসামের বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় এগিয়ে এলেন সালমান-আলিয়া

আসামের বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় এগিয়ে এলেন সালমান-আলিয়া

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App