×

প্রথম পাতা

মাইক্রোপ্লাস্টিক

শরীরে জমছে অদৃশ্য বিষ

Icon

সেবিকা দেবনাথ

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শরীরে জমছে অদৃশ্য বিষ

বিশ্বজুড়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। নিত্যব্যবহার্য বিভিন্ন পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য নতুন নয়। সম্প্রতি দেশে টুথপেস্ট, ভোজ্য সয়াবিন তেল, কাঁচা দুধ, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত তরল ও গুঁড়া দুধ, দুগ্ধজাত পণ্য এবং চিনিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নতুন করে যেন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এর আগেও দেশে লবণ, নদী ও সমুদ্রের মাছ, বোতলজাত ও সরবরাহের পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মিলেছিল। যা প্রমাণ করে এই সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন নয়। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য আরো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী? : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো- ৫ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ছোট আকারের ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, যা খালি চোখে সাধারণত দেখা যায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব ক্ষুদ্র কণা মানুষের পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, প্রদাহ ও কোষের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে ১৩০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো কোষের দেয়াল ভেদ করে সরাসরি রক্তে মিশে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে মাইক্রোপ্লাস্টিক একটি উদীয়মান পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের বিষয়। মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিয়ে এখনো গবেষণা চলমান। মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দুধ-চিনিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক : সম্প্রতি কাঁচা দুধ, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত তরল ও গুঁড়া দুধ, দুগ্ধজাত পণ্য এবং চিনিতেও ক্ষতিকর ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’-এর উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। গবেষণায় উঠে এসেছে, খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন ধাপে প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার কারণেই এসব খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের দূষণ বাড়ছে।

দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের একদল গবেষক। সানাউল্লাহ মাজুমদারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের গবেষক দল দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা কাঁচা দুধ এবং সুপারশপে বিক্রি হওয়া প্রসেসড দুধের নমুনা পরীক্ষা করেন। গবেষকদের দাবি, বাংলাদেশে দুধের মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ও পলিমার ঝুঁকি নিয়ে এটিই প্রথম বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ মিলিলিটার প্রসেসড বা ব্র্যান্ডের দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক শূন্য ৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। কাঁচা দুধে প্রতি ১০০ মিলিলিটারে গড়ে ৯৩ দশমিক ৩৯টি এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যে গড়ে ৭০ দশমিক ৮০টি কণা শনাক্ত হয়েছে।

গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের ঝুঁকি অনেক বেশি। বিশেষ করে ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের খাদ্যতালিকায় দুধের পরিমাণ বেশি থাকায় তাদের শরীরে এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বেশি প্রবেশ করতে পারে।

গবেষকদের ধারণা, খামার থেকে দুধ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিক পাইপে পরিবহন, কারখানায় প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্লাস্টিকের গøাভস ব্যবহার এবং বোতলজাতকরণের মতো বিভিন্ন ধাপে প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার কারণেই প্যাকেটজাত দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। গবেষণাগারে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণে দেখা যায়, শনাক্ত হওয়া অধিকাংশ প্লাস্টিক কণাই ছিল স্বচ্ছ এবং তন্তু বা আঁশের মতো। এসব নমুনায় পিটিএফই (টেফলন), পিইটি, নাইলন-৬ এবং পিভিসিসহ বিভিন্ন ধরনের পলিমারের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

চিনিতেও মিলেছে ব্যাপক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা চিনির ৯৫ শতাংশ নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। প্রতি কেজি চিনিতে ২১০ থেকে ৫০৮টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজার থেকে সংগ্রহ করা ৭ ধরনের বাণিজ্যিক চিনি ব্র্যান্ডেড ও খোলা উভয় ধরনের বিশ্লেষণ করা হয়। সম্প্রতি জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস-এ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্র্যান্ডেড চিনিতে গড়ে প্রতি কেজিতে ৩২২টি এবং খোলা বা নন-ব্র্যান্ডেড চিনিতে গড়ে ৪০৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। যদিও দুই ধরনের চিনির মধ্যে পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য নয়, তবে খোলা চিনিতে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি ছিল। পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার আকার ছিল প্রায় ১২ মাইক্রোমিটার থেকে ৩ দশমিক ১৯ মিলিমিটার পর্যন্ত। এর মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশ ছিল তন্তু (ফাইবার), ২১ শতাংশ খণ্ড (ফ্র্যাগমেন্ট), ১১ শতাংশ পাতলা স্তর (ফিল্ম) এবং ৫ শতাংশ গোলাকার কণা। গবেষকদের ধারণা, এসব কণা প্লাস্টিকের প্যাকেজিং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং পরিবেশে ছড়িয়ে থাকা ক্ষয়প্রাপ্ত প্লাস্টিক থেকে খাদ্যে মিশে থাকতে পারে। রাসায়নিক বিশ্লেষণে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পলিমারের উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাক্রাইলোনাইট্রাইল বিউটাডিয়েন স্টাইরিন (এবিএস), পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি), পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট (পিইটি), পলিটেট্রাফ্লুরোইথিলিন (পিটিএফই), উচ্চ ঘনত্বের পলিইথিলিন (এইচডিপিই) এবং নাইলনসহ আরো কয়েক ধরনের পলিমার।

ভোজ্য সয়াবিন তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক : এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) এক যৌথ গবেষণায়, রাজধানীর বাজার থেকে সংগ্রহ করা বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলে উদ্বেগজনক হারে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মিলেছে। প্রতি লিটার তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি প্লাস্টিক কণার সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। বোতলজাত তেলের চেয়ে খোলা তেলে দূষণের এই মাত্রা আরো বেশি। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’-এ সম্প্রতি এই গবেষণা পত্রটি প্রকাশিত হয়। গবেষণার জন্য ঢাকার তেজগাঁও, উত্তরা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বিভিন্ন সুপারশপ এবং খোলা বাজার থেকে সয়াবিন তেলের মোট ৬০টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরে আধুনিক স্পেকট্রোস্কোপিক ও রাসায়নিক পদ্ধতিতে এগুলো বিশ্লেষণ করা হয়।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, বোতলজাত তেলের তুলনায় খোলা সয়াবিন তেলে দূষণের পরিমাণ অন্তত ১ দশমিক ২৪ গুণ বেশি। খোলা তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তেজগাঁও এলাকা থেকে সংগৃহীত খোলা তেলের নমুনায় প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি ছিল সর্বোচ্চ। শিল্পকারখানার আধিক্য, টেক্সটাইল ও প্লাস্টিক কারখানার কাছাকাছি অবস্থান এবং খোলা তেল সংরক্ষণে পাত্রের বারবার ব্যবহারের কারণে এমন দূষণ ঘটছে বলে গবেষকরা মনে করছেন। ল্যাবরেটরি বিশ্লেষণে তেলের এসব নমুনায় ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত হয়। এগুলো হলো-ডেনসিটি পলিইথিলিন (এলডিপিই), হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন (এইচডিপিই), পলিপ্রোপিলিন (পিপি), পলিইথিলিন টেরেফথালেট (পিইটিই), পলিইউরেথেন (পিইউ) ও নাইলন। গবেষকরা জানিয়েছেন, ভোজ্যতেলে পলিইউরেথেন ও নাইলনের উপস্থিতির বিষয়টি বিশ্বে এবারই প্রথম কোনো গবেষণায় উঠে এসেছে। শনাক্ত হওয়া কণাগুলোর ৮২ দশমিক ৫ শতাংশই আঁশ বা ফাইবারজাতীয়। পাশাপাশি ৫৬ দশমিক ২৯ শতাংশ কণা স্বচ্ছ প্রকৃতির এবং ৩৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ কণার আকার ১০১ থেকে ৫০০ মাইক্রোমিটারের মধ্যে।

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক : এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ টুথপেস্টেই রয়েছে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। এসডোর গবেষণার অন্তর্ভুক্ত, বাজারের ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতেই ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুদের জন্য তৈরি ৬টি টুথপেস্টের ৪টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, পরীক্ষা করা ২৫টি দেশীয় টুথপেস্টের মধ্যে ২২টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এছাড়া ভারতের ৫টির মধ্যে ১টিতে, থাইল্যান্ডের ২টির মধ্যে ১টিতে এবং ভিয়েতনামের ২টি টুথপেস্টের ২টিতেই এ ক্ষতিকর কণা শনাক্ত হয়েছে। নমুনার ২৬টি টুথপেস্টে ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্লাস্টিক কণা মিলেছে। ওই গবেষণায় প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩২০টি কণা ছিল মেডিপ্লাস ফ্লুরাইড জেলে। এছাড়া ক্লোজআপ রেড হট ও ক্লোজআপ মেনথল ফ্রেশ-এ ১৬০টি করে, কোদোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলায় ১৪০টি, সিগন্যাল গ্রিন টি-তে ১২০টি এবং পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্ট ও হিমালয়া কমপ্লিট কেয়ার-এ ১০০টি করে কণা শনাক্ত হয়। এমনকি শিশুদের জন্য তৈরি ৬টি টুথপেস্টের মধ্যে ৪টিতেই এই দূষক পাওয়া যায়। তবে প্যারাসুট জাস্ট ফর বেবি ও কোদোমো অরেঞ্জ টুথপেস্টে কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক মেলেনি।

এদিকে গবেষণায় টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়ার পর গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) জানায়, বিষয়টি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। বিএসটিআই ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে গবেষণার পূর্ণাঙ্গ তথ্য, পরীক্ষাপদ্ধতি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়েছে। বিএসটিআই ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, দন্ত চিকিৎসক, শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং ভোক্তা প্রতিনিধিদের নিয়ে টুথপেস্টের বাংলাদেশ মান পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে।

আরো কীভাবে শরীরে ঢুকছে এই বিষাক্ত পদার্থ : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাবার, পানি, নিত্যব্যবহার্য অন্যান্য পণ্য, প্লাস্টিকের বোতল, সেচের পানি এবং জমিতে সার ছিটানোর সরঞ্জামেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বিদ্যমান। এতে করে সংশ্লিষ্ট জমি থেকে উৎপন্ন ফসল এবং তার খাবার পশুপাখি ও মানুষ উভয়েরই জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। খাদ্য, পানি, ও বাতাসে মাধ্যমে গবাদি পশুর দেহেও প্লাস্টিকের কণা প্রবেশ করে। মাছের ভেতরেও মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে যথেষ্ট পরিমাণে। তাই স্বভাবতই মাংস বা মাছ খাওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের দেহে অনায়াসেই ঢুকে পড়ে এই ক্ষতিকর কণাগুলো। এখানেই শেষ নয়, মাইক্রোপ্লাস্টিক প্লাসেন্টার মাধ্যমে ভ্রূণেও প্রবেশ করতে পারে। মাতৃত্বকালে মায়ের শরীরে এই কণা স্বল্প পরিমাণে থাকলেও বুকের দুধ পান করার সময় শিশুর দেহেও তা প্রবেশ করার আশঙ্কা থাকে। তবে প্লাস্টিক-জাত ফিডিং বোতল এবং চুষনিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার আশঙ্কা বেশি।

পরিবেশে প্লাস্টিক কণার ছড়ানোর ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখে বিভিন্ন কল-কারখানার বর্জ্য পানি এবং নির্মাণাধীন আবাসনের ভারী বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি। এভাবে দূষিত পরিবেশের ভেতর দিয়ে চলাচলকারী সাধারণ মানুষ মাইক্রোপ্লাস্টিকের আগ্রাসনের শিকার হয়। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে কল-কারখানা ও সেই নির্মাণাধীন স্থানের কর্মীরা। অনেকেই রান্না করা গরম খাবার সরাসরি প্লাস্টিকের বক্সে ভরে ফ্রিজে রাখেন। আবার অফিসে নিয়ে যাওয়ার জন্যও প্লাস্টিকের লাঞ্চবক্স ব্যবহার করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত তাপ প্লাস্টিকের ক্ষয় বাড়াতে পারে। বিশেষ করে মাইক্রোওয়েভে এমন প্লাস্টিক ব্যবহার করা হলে ঝুঁকি বাড়ে।

পোশাকও হতে পারে মাইক্রোপ্লাস্টিকের আরেকটি উৎস। পলিয়েস্টার, নাইলন, অ্যাক্রিলিকের মতো সিনথেটিক কাপড় এখন বাংলাদেশের বাজারেও খুব পরিচিত। এসব কাপড় ধোয়ার সময় লাখ লাখ ক্ষুদ্র তন্তু পানির সঙ্গে বের হয়ে যায়। এর একটি অংশ নদী-নালা হয়ে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, আবার কিছু তন্তু বাতাসেও মিশে যায়। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)-এর এক মূল্যায়ন অনুযায়ী, সমুদ্রে পৌঁছানো প্রাথমিক মাইক্রোপ্লাস্টিকের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে সিনথেটিক বস্ত্র থেকে নির্গত তন্তু ও গাড়ির টায়ারের ক্ষয় থেকে। এছাড়া প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ড, প্লাস্টিকের খুন্তি, চামচ, স্প্যাচুলা কিংবা খাবার সংরক্ষণের পুরনো বক্স- এসবও দীর্ঘদিন ব্যবহারে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। বিশেষ করে ছুরি দিয়ে বারবার কাটাকাটি করার সময় প্লাস্টিক কাটিং বোর্ড থেকে ক্ষুদ্র কণা বের হতে পারে বলে সাম্প্রতিক গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যদিও এসব কণা মানুষের শরীরে কতটা প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে এখনো গবেষণা চলছে। কিছু টি-ব্যাগে প্লাস্টিকভিত্তিক উপাদান ব্যবহার করা হয়, যা ব্যাগটির আকৃতি ধরে রাখতে সাহায্য করে। ২০১৯ সালে কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, নির্দিষ্ট ধরনের প্লাস্টিকের টি-ব্যাগ গরম পানিতে বিপুল পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক ছাড়তে পারে। তবে এই গবেষণা সব ধরনের টি-ব্যাগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান প্লাস্টিকমুক্ত টি-ব্যাগ তৈরির দিকে ঝুঁকছে। তাই টি-ব্যাগ কিনলে এর প্যাকেটে ব্যবহৃত উপাদান সম্পর্কে নজর দেয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

মানবদেহে প্রভাব : দৈনন্দিন খাদ্য গ্রহণের হিসাব অনুযায়ী মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের একটি প্রাক্কলন অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি প্লাস্টিক কণা প্রবেশ করছে। তবে কম ওজনের কারণে শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরো ভয়াবহ। তারা প্রতিদিন গড়ে ৭৭ দশমিক ২১টি এবং বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করছে। একটি শিশু তার জীবদ্দশায় প্রায় ২০ লাখ ৯০ হাজার প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারে বলে এক গবেষণায় পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু প্লাস্টিক কণাই নয়; এর সঙ্গে বিসফেনল-এ (বিপিএ), ফথালেটসহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানও মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। এসব উপাদান হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রদাহ, হৃদ?রোগ, প্রজনন সমস্যাসহ বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

করণীয় কী : ভোজ্য সয়াবিন তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে করা গবেষণা দলের প্রধান এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মুহাম্মদ তারেক জানান, মাইক্রোপ্লাস্টিক বর্তমানে একটি উদীয়মান দূষক, যা মানবদেহে প্রজননতন্ত্র ও বিপাকীয় ব্যবস্থায় মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, প্লাস্টিক পুরোপুরি বর্জন করা এই মুহূর্তে বাস্তবসম্মত নয়। তাই প্লাস্টিক বর্জ্যরে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিংয়ের উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারি, মানসম্মত ফিল্টারের ব্যবহার এবং খোলা তেল বিক্রির ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিয়েছেন গবেষকরা। দেশে খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পর্যবেক্ষণের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় দ্রুত এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে।

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার। তিনি বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি ধীরে ধীরে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠছে। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে নিয়মিত পরীক্ষার পাশাপাশি এ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে মানদণ্ড ও নজরদারি জোরদার করা জরুরি। এই পরিবেশবিদ আরো বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক একবার পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে সহজে ধ্বংস হয় না। ফলে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, নিরাপদ উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেয়াই এ ঝুঁকি কমানোর অন্যতম উপায়।

খালি চোখে দেখতে না পাওয়াটাই আরো বিপজ্জনক করে তুলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলোকে। পরিবেশের সর্বত্র বিরাজ করায় আহার বা পান, নিঃশ্বাস এবং ত্বক বা স্পর্শের মাধ্যমে অগোচরেই মানবদেহে এগুলোর অনুপ্রবেশ ঘটছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্নায়ু, শ্বসন, হৃদপিণ্ড এবং প্রজননসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গাণু। এ অবস্থায় মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রতিরোধে এখন থেকেই প্রতিটি পদক্ষেপে সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা নেই।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

নতুন হেয়ারস্টাইলে ফের আলোচনায় কুকুরেয়া

নতুন হেয়ারস্টাইলে ফের আলোচনায় কুকুরেয়া

বিশ্বকাপের হতাশা কাটিয়ে অনুশীলনে ফিরলেন মেসি

বিশ্বকাপের হতাশা কাটিয়ে অনুশীলনে ফিরলেন মেসি

শনিবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক

শনিবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক

আসামের বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় এগিয়ে এলেন সালমান-আলিয়া

আসামের বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় এগিয়ে এলেন সালমান-আলিয়া

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App