প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সার আমদানির অনুমোদন
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ সার আমদানির একাধিক প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে রাশিয়া থেকে ৩৫ হাজার মেট্রিক টন মিউরেট অব পটাশ (এমওপি), মরক্কো থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি সার আমদানি।
এ ছাড়া বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে আরও ৫ লাখ মেট্রিক টন ডিএপি, ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন এমওপি এবং ২ লাখ মেট্রিক টন টিএসপি সার আমদানির প্রস্তাব রয়েছে। এসব সার সংগ্রহে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের সাবিক এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন, অতিরিক্ত ১০ শতাংশসহ, বাল্ক গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এই সার আমদানিতে ব্যয় হবে ১৯৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৩ হাজার ৭২০ টাকা।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এসব প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)।
আরো পড়ুন: সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি তেল কিনছে সরকার
সৌদি আরব থেকে আসছে ১৯৪ কোটি টাকার ইউরিয়া সার
শিল্প মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) মাধ্যমে সৌদি আরব থেকে ইউরিয়া সার আমদানি করা হবে। এ আমদানির অর্থ কৃষি ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ করা বাজেট থেকে পরিশোধ করা হবে।
বৈঠক সূত্র জানায়, ২০০৭ সাল থেকে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের সাবিক এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি থেকে ইউরিয়া সার কিনে আসছে বাংলাদেশ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে মোট ৮ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানির চুক্তি হয়েছে। এর মধ্যে নিয়মিত চুক্তির আওতায় ৩ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন এবং জরুরি প্রয়োজন বিবেচনায় অতিরিক্ত ৫ লাখ মেট্রিক টন সার আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে।
চুক্তির নির্ধারিত মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় পঞ্চম লটে ৪০ হাজার মেট্রিক টন (+১০ শতাংশ) বাল্ক গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার আমদানির প্রস্তাব করা হয়। এ লটের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৬৬ হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ১৯৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৩ হাজার ৭২০ টাকা।
প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়ার দাম পড়ছে ৩৯১ দশমিক ৬৬ মার্কিন ডলার। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের পর নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সৌদি আরবের সাবিক থেকে এই চালান আমদানি করা হবে।
আরো পড়ুন: ১০ হাজার টন মসুর ডাল কেনার অনুমোদন
রাশিয়া থেকে ৩৫ হাজার টন এমওপি সার
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের চুক্তির আওতায় রাশিয়ার জেএসসি ‘ফরেন ইকোনমিক করপোরেশন (প্রডিনটর্গ)’ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ষষ্ঠ লটে ৩৫ হাজার মেট্রিক টন মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
এতে ব্যয় হবে ১৬৬ কোটি ৯ লাখ ৯০ হাজার ৪৫০ টাকা। এ অর্থ কৃষি ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ বাজেট থেকে পরিশোধ করা হবে। প্রতি মেট্রিক টন এমওপি সারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৮৩ দশমিক ৮০ মার্কিন ডলার। পুরো আমদানিতে ব্যয় হবে ১ কোটি ৩৪ লাখ ৩৩ হাজার মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ।
রাশিয়া থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চুক্তির মাধ্যমে এমওপি সার আমদানির বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) আগে থেকেই অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির নীতিগত অনুমোদন পেয়েছিল। আগের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় গত ২৪ মে নতুন করে চুক্তি নবায়ন করা হয়। ওই চুক্তিতে থাকা মূল্য নির্ধারণের সূত্র অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনা করে এবারের সারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিএডিসির এমওপি সার আমদানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৭ লাখ ১৬ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে রাশিয়া থেকে ৫ লাখ ৯৫ হাজার মেট্রিক টন আমদানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত দেশটি থেকে ১ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন এমওপি সার দেশে এসেছে।
মরক্কো থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি
জিটুজি চুক্তির আওতায় মরক্কোর ওসিপি নিউট্রিক্রপস এসএ এবং বিএডিসির মধ্যে করা চুক্তি অনুযায়ী ঐচ্ছিক তৃতীয় লটে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে কমিটি।
প্রতি মেট্রিক টন ডিএপি সারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৮৫ মার্কিন ডলার। সব মিলিয়ে এ লটের ক্রয়মূল্য দাঁড়াবে ৪৩৭ কোটি ৩৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এ ক্ষেত্রে সুপারিশকৃত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মরক্কোর ওসিপি নিউট্রিক্রপস এসএ।
একই চুক্তির আওতায় ঐচ্ছিক চতুর্থ লটে আরও ৪০ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি সার আমদানির প্রস্তাবও অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও প্রতি টনের দাম ৮৮৫ মার্কিন ডলার এবং মোট ক্রয়মূল্য ৪৩৭ কোটি ৩৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে একই কোম্পানির নাম রয়েছে।
আরো পড়ুন: একনেকে যে ১২ প্রকল্পের অনুমোদন দিল সরকার
বিভিন্ন দেশ থেকে ৫ লাখ টন ডিএপি
বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে ৫ লাখ মেট্রিক টন ডিএপি সার আনার প্রস্তাবও অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
প্রতি মেট্রিক টন ডিএপির মূল্য ধরা হয়েছে ৯৩৮ মার্কিন ডলার। পুরো ৫ লাখ টন সার আমদানিতে ব্যয় হবে ৪৬ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার।
এ আমদানির জন্য ২০টি প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মরক্কো, রাশিয়া, জর্ডান, সৌদি আরব, মিশর ও তিউনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ডিএপি সার আমদানির কথা রয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এনআরকে হোল্ডিং, দেশ ট্রেডিং করপোরেশন, বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মুগ্ধ ট্রেডার্স, বাস্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, মেসার্স আকন এন্টারপ্রাইজ, সান সাইনিং লিমিটেড, মেসার্স দীপা এন্টারপ্রাইজ, মৌনতা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স নোয়াপাড়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স ফারিহা ট্রেডিং, মেসার্স ফাইয়াজ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স নোয়াপাড়া ট্রেডিং, সাইফুল্লাহ তাকওয়া, তাইবা সাইফুল্লাহ (জিএল), মেসার্স সুফলা ট্রেডিং করপোরেশন, সাইফুল্লাহ গালফ, নোয়াপাড়া ট্রেডার্স ও মেসার্স ফাইয়াজ ট্রেডিং করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানভেদে ১০ হাজার থেকে ৮০ হাজার মেট্রিক টন পর্যন্ত ডিএপি আমদানির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে।
২ লাখ ২০ হাজার টন এমওপি আমদানির প্রস্তাব
বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন দেশ থেকে আরও ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন এমওপি সার আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত প্রস্তাবও অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে কমিটি।
প্রস্তাবে মোট ক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে ৮ কোটি ৭৭ লাখ ৭৩ হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার। প্রতি মেট্রিক টন এমওপি সারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৯৮ দশমিক ৯৭ মার্কিন ডলার।
এই আমদানির জন্য ১৪টি প্রতিষ্ঠানকে সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, মেসার্স আকন এন্টারপ্রাইজ, এনআরকে হোল্ডিং, বাঙ্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, দেশ ট্রেডিং করপোরেশন, মেসার্স নীপা এন্টারপ্রাইজ, মুগ্ধ ট্রেডার্স, মেসার্স মৌনতা ট্রেড ইনডেক্স, নোয়াপাড়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স আলিফ ট্রেডিং, তাইবা সাইফুল্লাহ (এসএ), সাইফুল্লাহ গালফ, মেসার্স নোয়াপাড়া ট্রেডিং ও সাইফুল্লাহ তাকওয়া।
এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়া, কানাডা ও বেলারুশ থেকে এমওপি সার আমদানির কথা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানভেদে ৬ হাজার থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন পর্যন্ত সার আমদানির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে।
২ লাখ টন টিএসপি সার আমদানির উদ্যোগ
বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে ২ লাখ মেট্রিক টন টিএসপি সার আমদানির প্রস্তাবেও অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে কমিটি।
এ জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ কোটি ১২ লাখ মার্কিন ডলার। প্রতি মেট্রিক টন টিএসপি সারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৫৬ মার্কিন ডলার।
এ আমদানির জন্য ১০টি প্রতিষ্ঠানকে সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলো হলো—মেসার্স রত্না এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স ফাইয়াজ ট্রেডিং করপোরেশন, দেশ ট্রেডিং করপোরেশন, এনআরকে হোল্ডিং, বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, নোয়াপাড়া ট্রেডার্স, সাইফুল্লাহ তাকওয়া, মেসার্স সুফলা ট্রেডিং করপোরেশন এবং নোয়াপাড়া ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল।
প্রস্তাব অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেবানন, বুলগেরিয়া, মরক্কো, মিশর ও তিউনেশিয়া থেকে টিএসপি সার আমদানি করা হবে। প্রতিষ্ঠানভেদে আমদানির পরিমাণ ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
